তাহাদের চাকরি…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুশ কথা সাহিত্যিক আন্তন চেখভ দু‘হাতে লিখলেও ডাক্তারি পেশা ছেড়ে দিতে পারেননি একেবারে। বলতেন, ডাক্তারি হচ্ছে তাঁর বিবাহিত স্ত্রী আর লেখালেখি হচ্ছে রক্ষিতা।কথাটা হয়তো চেখভ খানিকটা রসিকতা করেই বলেছিলেন। কিন্তু জীবন চালানোর জন্য তাকেও নিয়মিত রোগী দেখতে হতো। এরকম এক বেলা চাকরি করতেন ড্রাকুলা উপন্যাসের লেখক ব্রাম স্টোকার, প্রখ্যাত কথাশিল্পী ফ্রাঞ্জ কাফকা, মবিডিক উপন্যাসের রচয়িতা হারমেন মেলভিল, বিশিষ্ট ইংরেজ কবি ও প্রাবন্ধিক টিিএস এলিয়টসহ আরও অনেকেই।

আন্তন চেখভ চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৮৮৪ সালে তিনি পড়াশোনা শেষ করে ডাক্তারী পেশায় প্রবেশ করেন। কিন্তু তখন তার লেখার কলম সচল হয়ে উঠেছে। রোগী দেখার পাশাপাশি বিশ্ব সাহিত্যের এই অনন্য গল্পকার লিখছেন, ‘ সী গাল’, ‘আংকেল ভানিয়া’ অথবা ‘থ্রি সিস্টার্স’-এর মতো বিশ্বখ্যাত নাটকও। চেখভ অবশ্য তার পেশাকে লেখার অন্তরায় বলতেন না। ডাক্তারী পেশার কারণে সমাজের চাষী থেকে শুরু করে উঁচু তলার বাসিন্দা-সকলের সঙ্গেই তার পরিচয় ঘটতো। ঝুলিতে জমা হতো নানা ধরণের অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাগুলো তার নাটক অথবা গল্পের কাহিনিতে জায়গা করে নিতো।

ফ্রাঞ্জ কাফকা আইন বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করেছিলেন প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। সদ্য পাশ করা তরুণ আইনজীবী হিসেবে তিনি কাজ নেন একটি বীমা কোম্পানীতে। অফিসের কাজ ভালোবাসতেন কাফকা। তাই লেখার জন্য সময় তোলা ছিলো সন্ধ্যাবেলা। অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে প্রতিদিন লিখতেন কাফকা। প্রায় এক দশক ওই বীমা অফিসে কাজ করেন তিনি। আর সেখানে কাজ করতে করতেই লেখা হয় তাঁর ‘মেটামরফোসিস’ পর্বের গল্পগুলো। সময়টা ছিলো ১৯১৫ সাল। কাফকা ভীষণ মন দিয়ে অফিসে কাজ করতেন। তাই অফিসের বসেরও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন অল্প সময়ে। কিন্তু ১৯১৭ সালে টিবি রোগ ধরা পড়ায় সেই অফিস থেকে তাকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেয়া হয়। কাফকা ভর্তি হন  স্যানিটরিয়ামে। কাফকা অফিসের কাজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেন ১৯২২ সালে।

ড্রাকুলা উপন্যাস লিখে বিখ্যাত ব্রাম স্টোকার এক সময়ের বিখ্যাত ব্রিটিশ অভিনেতা স্যার হেনরি আর্ভিংয়ের অভিনয়ের ওপর একটি লেখা ছাপিয়ে স্যার আর্ভিংয়ের নজরে পড়ে যান। পত্রপত্রিকায় ব্রাম স্টোকার মঞ্চ নাটকের ওপর সমালোচনা লিখতেন বিনে পয়সায়। স্যার আর্ভিং লেখা পড়ে স্টোকারকে ডেকে পাঠান এবং তার লন্ডন লাইসিয়াম থিয়েটারের ম্যানেজার পদে নিয়োগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ব্রাম স্টোকার তখন সদ্য বিয়ে করেছেন। থাকেন আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে। নতুন চাকরির প্রস্তাব প্রেয়ে ড্রাকুলা উপন্যাসের সেই রচয়িতা রাজি হয়ে যান। স্ত্রীকে নিয়ে সোজা চলে আসেন লন্ডন শহরে। সেখানেই কেটে যায় চাকরি জীবনের ২৮ বছর। নাটক কোম্পানীর হিসাবের খাতা দেখতেন স্টোকার। কোম্পানীর লাভ লোকসান দেখার দায়িত্বও ছিলো তাঁর। এতসব দায়িত্বের ভিড়ের মধ্যে বসেও তিনি লেখার জন্য সময় বের করে নিতেন। ওই নট্ট কোম্পানীর ম্যানেজারি করতে করতেই ব্রাম স্টোকার নয়টি উপন্যাস প্রকাশ করেন। ড্রাকুলা ছিলো সেগুলোর মধ্যে অন্যতম।

স্যার আর্ভিং ১৯০৫ সালে মারা যান। তার মৃত্যুর পর চাকরি হারান ব্রাম স্টোকার। কিন্তু লেখা ছাড়েননি স্টোকার। সেই সময়ে স্যার আর্ভিংয়ের জীবনী লেখার কাজও শুরু করেন তিনি। ১৯১২ সালে মৃত্যু ঘটে ব্রাম স্টোকারের।

টি.এস এলিয়ট কাজ করতেন লন্ডন শহরের লয়েড ব্যাংকের শাখায়। পৃথিবীখ্যাত একজন কবি কাজ করছেন একটা ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেন শাখায় বিষয়টা অবাক হওয়ার মতোই। ব্যাংকে কাজ করতে করতেই তাঁর বিখ্যাত ‘ওয়েস্টল্যান্ড’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এলিয়ট তখন রীতিমত বিখ্যাত। কিন্তু তবুও ব্যাংকের চাকরিটা তিনি ছাড়েননি। বেশ অনেক পরে ব্যাংকের কাজ ছেড়ে এই ইংরেজ কবি ফেবার অ্যান্ড ফেবার নামে প্রখ্যাত প্রকাশনা সংস্থায় যোগ দেন। পরে এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে তাঁর উদ্যোগে এজরা পাউন্ড, ডব্লিউ.এইচ অডেন, টেড হিউজেসের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

‘মবিডিক’ খ্যাত হারম্যান মেলভিলের পেশাগত জীবনের গল্পটা আবার একটু অন্য ধরণের। লেখক জীবনের শুরুতে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি লিখে বিস্তর নাম করেন এই লেখক। কিন্তু জীবনঘনিষ্ট উপন্যাস লিখতে গিয়েই বিপত্তি বাধে। দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাতে থাকেন মেলভিল। পাঠক হারিয়ে তাঁর এমন অবস্থা হয় যে বাড়িতে চুলায় আগুন জ্বলে না। ১৮৫৬ সালে তিনি নার্ভাস ব্রেকডাউনের শিকার হন। ওই অবস্থাতেও কাজ খুঁজছিলেন মেলভিল। শেষে ১৮৬৬ সালে নিউ ইয়র্কের বন্দরে সহকারী কাস্টমস পরিদর্শকের কাজ পেয়ে যান তিনি। বেতন ছিলো দৈনিক ৪ ডলার। পরের ২২ বছর ওই চাকরিতেই লেগে থাকেন লেখক। ছুটির দিনে বাড়িতে, প্রতি সন্ধ্যায় লেখার সময় বের করে টেবিলে বসে যেতেন মেলভিল।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ হিস্ট্রি
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]