তিনটা তেত্রিশ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সা’দ জগলুল আববাস

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

ঘরর…ঘরর…শব্দে মাঝরাতে মাহমুদের ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো!
সেদিন ভীষন ক্লান্ত ছিলো মাহমুদ; কাজে প্রচুর দাপাদাপি গেছে! ও সাধারণত একটু রাত করেই বিছানার যায়, রাফিয়ার সঙ্গে সে রাতে ফেবুতে শুধু নিয়ম মাফিক হাই, হ্যালো করে ১১ টার মধ্যেই বিদায় নিয়েছিলো…চোখ খুলে রাখতে পারছিলো না !
মাহমুদ একটা মাল্টি ন্যাশনালে মাত্র চাকুরি পেয়েছে; ছ’মাস পরে চাকুরির কনফার্মেশন ! রাফিয়া একটা পত্রিকায় শিক্ষানবীস কলাম লেখক ! রাফিয়া দু’দিন আগে স্পষ্ট করে নোটিস দিয়ে দিয়েছে,” ফেবুর টিপসই তিন মাসের মধ্যে আমাদের কাবিন নামায় দিতে না পারলে তোমার আমার দু’জনেরই খবর আছে ” ! এতো ক্লান্তি মেহমুদের আর কোন দিন লাগেনি ! স্বচ্ছল পরিবারের ছেলে; ইস্কাটনে একটা ছোট্ট ষ্টুডিও এ্যাপার্টমেনটে একা থাকে, একজন মাসকাবারী কাজের বুয়া দু’দিন পর পর এসে ঘর পরিস্কার ও রান্না করে গিয়ে যায়; রাফিয়া মাঝে মধ্যে এসে ঘরটা গুছিয়ে দেয় ! ভেবে রেখেছিলো বিয়ের কথাটা মা’কে চাকরি কনফার্ম হ’লে বলবে । এর মধ্যে রাফিয়ার ধমক, সব নিয়ে চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো !

চোখ না খুলেই হাত বাড়ালো বেড সাইড টেবিলে রাখা মোবাইলটার দিকে, ওটাকে রাতে ভাইব্রেশন মোডে দিয়ে রাখে…হঠাৎ কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গে যাওয়াতে খুব বিরক্ত লাগছিলো, বুঝতে চেষ্টা করছিলো এতো রাতে কে ফোন দিলো ! হাতড়ে ফোনটা পেলো না ! মেহমুদ ঘর অন্ধকার করেই ঘুমাতে যায় ! হঠাৎ হাতে লেগে কি একটা মেঝের কার্পেটে পড়ে গেলো ; সম্ভবত , ছোট টেবিল ঘড়িটা , না হয় ফোনটা ! সঙ্গে সঙ্গে ঘড়িটার ডিজিটাল অ্যালার্ম বেজে উঠলো…! ঘড়িটাতে সকাল সাতটার অ্যালার্ম সেট করা থাকে, ভোর হয়ে গেছে ভেবে এবার চোখ খুললো, কিন্তু ভোরের আলোর নাম নিশানা নেই, কামারাটা ঘুঁট ঘুঁটে অন্ধকার ! পাশ ফিরে দেখলো টেবিলের উপর রাখা মোবাইলটার স্ক্রিনে আলো জ্বলে আছে , এক সেকেন্ড পর নিভে গেলো ! এতো অন্ধকার কেন, বাইরের কোন আলোও আসছে না ! ঘড়িটা তখনো মেঝেতে বেজেই চলেছে ! মোবাইলটার চৌদ্দগোষ্ঠি উদ্ধার করতে করতে আবার হাত বাড়িয়ে ওটার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা চালালো, পেলো না ! কি আশ্চর্য , মোবাইলটা কোথায় গেলো, এই মাত্র দেখলাম , কে ফোন করতে পারে , এসব চিন্তা করতে করতে উঠে বসলো! ঘড়ির অ্যালার্মটাও সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেলো , সারা কামরা জুড়ে একটা দম বন্ধ করা নি:স্তব্ধতা নেমে এলো !
বিছানা থেকে নামতেই মাহমুদের বাঁ পা’ টা শক্ত কিছু একটার উপর পড়লো, সরিয়ে নেবার আগেই আবার অ্যালার্ম বেজে উঠলো! ঘড়িটার উপরেই পা’টা পড়েছিলো !!! দুরর করে পা’টা সরিয়ে মেঝেতে দাড়ালো, আওয়াজ অনুসরন ঘড়িটা হাতে নেবার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যালার্মটা আপনা আপনিই থেমে গেলো ! এবার মাহমুদ একটু সজাগ হ’লো, শুরু হ’লে অ্যালার্ম এক মিনিট বাজে, তারপর snooz করা শুরু করে, কিন্তু দু’বারেই ঘড়িটা একমিনিটের কম বাজলো, snoozing ও হ’লো না ! চোখের কাছে ঘড়িটা নিয়ে সময়টা দেখার চেষ্টা করলো, অন্ধকারে কিছুই দেখা গেলো না ! আবার বেড সাইড টেবিলের দিকে হাত বাড়ালো মোবাইলটার খোঁজে, পেলো না! মহা বিরক্তি নিয়ে কামরার লাইটের সুইচটার অবস্থান আন্দাজ করার চেষ্টা করলো, পেলো কিন্তু সুইচ টিপে দিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলো , আলো জ্বললো না! ইলেকট্রিসিটি নেই নাকি? নাহ্, ফ্যানতো ঘুরছে ! টিউবটা মনে হয় গেছে ! খুব পানির পিপাসা পেলো, পানি খেতে যেতে হবে লাগোয়া ডাইনিং কাম লিভিং রুমে ! অন্ধকারে কোন রকমে হাতড়ে হাতড়ে পাশের ঘরে গিয়ে আলোটা জ্বাললো! দেয়াল ঘড়িটা সময় বলছে রাত তিনটা তেত্রিশ মিনিট ! ফ্রীজ থেকে একটা ঠান্ডা পানির বোতল বের করে পানি খেয়ে বাতিটা জ্বালিয়ে রেখেই বেড রুমে এলো ! হাল্কা আলো এসে পড়েছে বেড রুমে , মোটামুটি সব দেখা যাচ্ছে! হঠাৎ মাহমুদের বাথরুম পেলো, বাথরুমের সুইচটা জ্বালিয়ে দরজা বন্ধ করলে! ঘরে একা থাকলেও মাহমুদ সব সময় ছোট বা বড় কাজ দরজা বন্ধ করেই করে, প্রাইভেসীটা থাকে ! আগে করতো না, একদিন ছুটির দিন রাফিয়া আচমকা এসে পড়াতে ভীষন অপ্রস্তুত অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো ( বাড়ীর একটা চাবি রাফিয়ার কাছে থাকে) ! সেদিন রাফিয়া ওকে কান ধরিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলো যে আর কোনদিন যেন এসব অসভ্যতা না করে ! ফ্লাশটা টেনে উঠে দাঁড়াতেই বেসিন টপে চোখ গেলো , ওর মোবাইলটা এক পাশে পড়ে আছে ! একটু বোকা বনে গেলো, বাথরুমে মোবাইলটা কেন? যতদুর মনে পড়ে , সময়টা দেখে বেড সাইড টেবিলেতোই রেখেছিলো ! তারপর মোবাইলটাতো একটু আগেও টেবিলে জ্বলতে দেখলো ! একটু কনফিউজড হয়ে হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা নিতে গেলো, ঘররর…… ঘরররর করে মোবাইলটা আবার জ্বলে উঠলো ; হুট করে সঙ্গে সঙ্গে বাথরুমের আলোটা নিভে গেলো ! এবার মাহমুদ সত্যিই ভয় পেলো, অন্ধকারে বাথরুমের দরজার নীচের ফাঁকা যায়গাটা দিয়ে বেড রুমের আলো আসছে ! একবার মনে হলে দরজার ওপাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলো! সমস্ত শবরীরে কাঁটা দিয়ে উঠলো ! কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইলটা নিয়ে অন করলো…মোবাইল সময় দেখাচ্ছ তিনটা বেজে তেত্রিশ মিনিট ! এমনিতে মাহমুদ সাহসী ছেলে, অতিপ্রাকৃত কিছু বিশ্বাস করে না কিন্তু দশ মিনিট ধরে যা ঘটছে…কিছু ভাবতে পারছে না, ঘুম ক্লান্তি সব উধাও! মিসড কল খুঁজতে গিয়ে দেখলো, আজ রাতে কোন মিসড কল লগ নেই ! বহু সাহস সঞ্চয় করে বাথরুমের দরজাটা খুলে বার হলো ! দেখলো ঘড়িটা মেঝেতে পড়ে আছে,হাতে নিলো; সময় দেখাচ্ছে রাত তিনটা বেজে তেত্রিশ মিনিট ! কি ভেবে বেড সাইড টেবিলের ড্রয়ারে রাখা ওর হাত ঘড়িগুলো বের করলো… সব গুলো সময় দেখাচ্ছে , রাত তিনটা তেত্রিশ ! ভালো করে চোখ কচলে আবার ঘড়ি গুলোর দিকে তাকালো , রাত তিনটা বেজে তেত্রিশ ! বাথরুমে চোখ গেলো, আলো জ্বলছে ! হতভম্ব হয়ে মাহমুদ বসে রইলো !

সকাল হতে না হতেই রাফিয়ার ফোন, মেহমুদ তখনো একই ভাবে বসে! রিং শুনে একবার চমকে উঠলো!
-সকালে উঠে দেখলাম তোমার দু’টো মিসড কল, এতো রাতে ফোন করেছিলে কেন , কোন সমস্যা হয়েছিলো ? সরি, মাহমুদ ফোনটার রিংগার অফ থাকেতে টের পাইনি ! কোন প্রবলেম ?
– নাহ ! আচ্ছা সময়টা একটু দেখবে কল গুলোর ? একটু পর রাফিয়ার অবাক কন্ঠ ভেসে এলো,
– কি কান্ড, আগে খেয়াল করিনি , দুটো কল , কিন্তু একই সময় দেখাচ্ছে … রাত তিনটা তেত্রিশ! কি হয়েছে!
– না, এমন কিছু না,শোন , আজ ভাবছি মা’কে ফোন করে দেবো ঢাকা এসে তোমার মা বাবার সঙ্গে বিয়ের কথাটা পাকা করার জন্য !

মাহমুদ সব গুলো ঘড়ির সময় চেক করলো, সময় ঠিক দেখাচ্ছ , বাথরুমের আলো তখনো জ্বলছে!
দুপুরে প্রচন্ড জ্বর নিয়ে মাহমুদ অফিস থেকে বাসায় ফিরলো ! বিকেলের দিকে জ্বর মনে হয় বেড়ে গেলো, রাফিয়াকে জানালো ! রাফিয়া এবং ওদের দু’জনের কমন বন্ধু সাগর ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেলো! রাতে মাহমুদ অজ্ঞান হয়ে কোমায় চলে গেলো ! প্রায় সাতদিন পর মাহমুদ কোমা থেকে ফিরলো ঠিকই, কিন্তু ততোদিনে সমস্ত অতীত হারিয়ে গেছে ওর স্মৃতি থেকে!!!

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box