তিনি ঘর করেছেন চলচ্চিত্রের সঙ্গে

লুৎফুল কবির রনি

গোলাপী এখন ট্রেনের গোলাপী ববিতা বলেন, ‘আমজাদ ভাই অন্য অনেক পরিচালকের মতো ছিলেন না। তাঁর ছবির শুটিং হলেই আমরা কেমন সিরিয়াস থাকতাম। এখন তো শুটিংয়ে সমস্যা কম, শিল্পীরা শুটিংয়ে গিয়ে আরামেই থাকে। সে সময় আউটডোর শুটিংয়ে আমরা কোনোরকমে থাকতাম। মানিকগঞ্জে একবার শুটিংয়ে গিয়ে দেখি, আমাদের রুম ঠিক নেই, রুমের ভেতরে লাইট নেই। আমাদের রাতের খাবারেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এটা কোনো ব্যাপার ছিল না। আমরা বলতাম, এই দোকান থেকে বাল্ব নিয়ে এস। পাশের ছাপরা হোটেল থেকে ভর্তা–টর্তা, মাছ কিনে নিয়ে এসো। আমরা নিজেরা কিনে এনে খেতাম। যেহেতু কাজটা আমজাদ হোসেনের।

জহির রায়হান এসে শুনলেন শহীদুল্লা কায়সার নেই। তিনি আমাকে(আমজাদ হোসেন) সব ক্যামেরাট্যামেরা দিয়ে দিলেন। ওই যে সুকদেব (ভারতীয় চলচ্চিত্রকার) যে ছবিতে পুরস্কার পেয়েছে, পাকিস্তানি সৈনিকেরা যখন আত্মসমর্পণ করে, সেই ছবিটার কাজ। পাকিস্তানিদের হাতে তখন খোলা বেয়নেট, তার মধ্যে শুয়ে শুয়ে শট নিচ্ছি। ওখানে একটা ঘরে ঢুকে দেখলাম, কুঁচকানো টাকা, আরেকটা ঘরে ট্রানজিস্টার। আত্মসমর্পণের সময় সেটা, তবুও ভয় করে, খোলা বেয়নেট তো, তাই। ঘটনাগুলো ধারণ করতে করতেই শুনলাম, একজন নারী মরে পড়ে আছেন মিরপুরে। দৌড়ে সেখানে গেলাম, ক্যামেরায় ওই নারীকে ধারণ করলাম।

স্ত্রীর সঙ্গে আমজাদ হোসেনের এই ছবিটি বাড়ির দেয়ালে ঝুলছে।

তারপরএকসময় আমার মনে হলো, বধ্যভূমিতে যাওয়া দরকার। সেখানে যদি শহীদুল্লা কায়সার, মুনীর চৌধুরী, সিরাজুদ্দীন হোসেনকে পাই। রায়েরবাজার বধ্যভূমির শহীদদের উঠিয়ে আনতে সেখানে আমি নিজে নেমেছি, গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে। তাঁদের খুঁজেছি, কিন্তু কাউকেই পেলাম না।সেখানে পেলাম কাকে জানেন? আমাদের চলচ্চিত্রের এক খলনায়ক, পাবনার, নয়াবাজারে থাকত, ওর নামটা যেন কী ছিল (তিনি নামটা মনে করতে পারেননি)? এত সব খোঁজার পরে পেলাম তাকে। তার মৃতদেহটা ওপরে উঠিয়ে দিলাম। ওপরে লোক ছিল। ওঠানোর সময় তার হাঁটু দুটি ঠুস ঠুস করে খুলে নিচে পড়ে গেল। সেগুলো কুড়িয়ে আবার দিয়ে দিলাম ওপরে। তারপর আমি উঠে বমি করছি। সে সময় খসরু (মুক্তিযোদ্ধা, চলচ্চিত্র অভিনেতা) দুই রাজাকারকে ধরে নিয়ে এসেছে। বলছে, আমজাদ ভাই, শুট করতে হবে। আমি এই রাজাকারদের শুট করব। আপনি শুট করেন। আমি ক্যামেরাম্যানকে বললাম, শুট করো। তো এসব কথা আমি বলিনি কখনো। এই রকম বহু ঘটনা আছে।

জহির ভাইয়ের চিত্রনাট্যের কাজ করতাম আমি। তখন আমার ঘাড়ে পাঁচটা পরিবার চেপেছে। সে সময় আমি নামকরা কেউ না, অত পয়সাও নেই। আমি যদি কোথাও চলে যাই, এরা সবাই না খেয়ে মরবে। আবার জামালপুর থেকে আমার বাবা চিঠি লিখেছেন, ‘তুমি তো কমিউনিস্ট পার্টি করো, তুমি এই পাড়ায় এসো না, ওরা তোমাকে রাতে খুন করবে। (কাদের কথা বলছেন, তা ষ্পষ্ট করেননি। হতে পারে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বা রাজাকারদের কথা বলেছিলেন।’

আমজাদ হোসেন একজন খ্যাতিমান বাংলাদেশি সাহিত্যিক, অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। চলচ্চিত্র রচনা, অভিনয় এবং পরিচালনা– প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের পরিচয় রেখেছেন এবং বাংলাদেশের অন্যতম কিংবদন্তী রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। সর্বগুণে গুণান্বিত হয়ে একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, বাংলা চলচ্চিত্রকে করেছেন সমৃদ্ধ, তিনি কিংবদন্তী ‘আমজাদ হোসেন’।

আমজাদ হোসেনের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট, জামালপুরে। শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত হন।

রুপালী জগতে যাত্রার শুরুটা ছিল মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি অভিনয় করেন মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে।

বাংলা সাহিত্যে একজন সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বেশ সুপরিচিত। উপন্যাস, ছোট গল্প ছাড়াও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থও লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালীন যে সিনেমা স্বাধীনতা আন্দোলনে গণজোয়ার এনেছিল সেই ‘জীবন থেকে নেয়া’র কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা ছিলেন আমজাদ হোসেন। গ্রাম-বাংলার ভালোবাসার ছবি হিসেবে যেই ছবিটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, সেই ‘সুজন সখী’রও কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা তিনি। পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে নির্মিত জনপ্রিয় ছবি ‘বেহুলা’র সংলাপ রচয়িত হয়েছে তার হাত ধরেই। এছাড়া ধারাপাত, আনোয়ারা, আবার তোরা মানুষ হ, জয়যাত্রা, আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসার মত জনপ্রিয় ছবিগুলোর কাহিনীকার তিনি।

অভিনেতা আমজাদ হোসেনও বেশ জনপ্রিয়। জীবন থেকে নেয়ার আলোচিত চরিত্র ‘মধু ভাই’ রূপে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে তিনি গেঁথে আছেন। এছাড়া ‘হারানো দিন’, ‘আগুন নিয়ে খেলা, বেহুলা, প্রাণের মানুষ, প্রেমী ও প্রেমীসহ অনেক সিনেমাতে তিনি অভিনয় করেছেন। এক সময়কার বাংলাদেশীদের ঈদ বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘জব্বর আলী’র নাম ভূমিকায় তিনিই অভিনয় করেছেন। গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী সিনেমার সেই কালজয়ী গানগুলির রচয়িতাও তিনি।

আমজাদ হোসেনের লেখা নাটক ‘ধারাপাত’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সালাহউদ্দিন। এতে আমজাদ হোসেন নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর তিনি জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ শুরু করেন।

এভাবেই দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে ১৯৬৭ সালে নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, নাম ‘জুলেখা’। তার পরিচালিত ব্যাপক দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘বাংলার মুখ’, ‘নয়নমনি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হীরামতি’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘কাল সকালে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’ ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ ইত্যাদি।

১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় বিখ্যাত সিনেমা ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ নির্মিত হয়। নিজের লেখা ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’ উপন্যাস অবলম্বনে তিনি সিনেমাটি নির্মাণ করেন। ববিতা, ফারুক, আনোয়ারা, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, তারানা হালিম, রোজি আফসারী, এটিএম শামসুজ্জামান অভিনীত ছবিটি সেই সময় দারুণ ব্যবসাসফল হয়। সাথে কালজয়ী ছবি হিসেবে এটি স্থান করে নেয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। গোলাপী এখন ট্রেনে সেই সময় ১১টি শাখায় পুরস্কার পেয়ে ভীষণ আলোচিত হয়, তিনি নিজেই পাঁচটি পুরস্কার পেয়ে সবাইকে চমকে দেন।

‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক (১৯৯৩) ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এছাড়া সাহিত্য রচনার জন্য তিনি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দুইবার অগ্রণী শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

আমজাদ হোসেন সিনেমাওয়ালা। মুক্তিযুদ্ধকে বুকে করে,বুকে নিয়ে মানুষের জীবনকে দেখেছেন সেলয়েডের ফিতায়।

আমাজাদ ঘর করেছেন চলচ্চিত্রের সাথে, ভাল থেকো কারিগর।

ছবি: গুগল