তিনি চলে গিয়েছিলেন কাউকে কিছু না জানিয়ে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

হঠাৎ একদিন কী এক খেয়ালে একজন পরিচিত বাসের কন্ডাক্টারকে ‘রক্তকরবী’ পড়ে শুনিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, ‘ট্রামের কন্ডাক্টার, ছেলেটি বেশ ত্যাঁদড়, তারও বেশ ভাল্লাগল। বলল, রাজা আর নন্দিনীর কথায় রাজার রেগে যাওয়াটা ভাল।’

জানতেন ‘রক্তকরবী’ নামানোটা খুব শক্ত। আজও অনেকে রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা’ বা ‘রক্তকরবী’ করতে চায় না, বলে লোকে নেবে না। অথচ শম্ভু মিত্র ‘রক্তকরবী’-তে চন্দ্রা আর ফাগুলালকে এমন সুরে কথা বলালেন, যে একবার এক রাজমিস্ত্রি মহলা শুনতে শুনতে ওঁকে বলেছিল, ‘বাবু এরম কথা তো আমরা নিজেরা বলি!’ ১০ মে ১৯৫৪ প্রথম ‘রক্তকরবী’ মঞ্চস্থ হয়।

মনে আসছে ‘ রাজা অয়দিপাউস’-এর সেই দৃশ্য…রাজা অয়দিপাউস নিজের সৃষ্টির কাহিনিকে আলোতে খুঁজতে চাইছেন। রানি ইয়োকাস্তে তাঁকে বার বার বাঁধা দিচ্ছেন… অয়দিপাউস বলছেন, ‘আমি আলো চাই, আলো-ও-ও-ও।’ ওইটা বলার সময় ওই যে মাথাটা সামান্য ঝাঁকাতেন, কণ্ঠস্বর উচ্চ হতো…উফফ! দর্শক আসনে আমাদের শরীরে বিদ্যুত্ৎ খেলে যেতো যেন! এই নাটকের মঞ্চ পরিকল্পনায় বলেছিলেন, ‘ভ্যাজাইনার আকারে মঞ্চের ব্যাকড্রপ তৈরি হবে!’

১৯৪৯ সালের ‘পথিক’ থেকে ১৯৭১ সালের ‘চোপ, আদালত চলছে’— বাংলা থিয়েটারকে আকাশছোঁয়া উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন ‘বহুরূপী’ শম্ভু মিত্র। ১৯৩৯ সালে রংমহলে বাণিজ্যিক নাট্যমঞ্চে যোগ দেন তিনি। পরে যোগ দিয়েছিলেন মিনার্ভায়। এই সময় কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্ব শিশিরকুমার ভাদুড়ীর সঙ্গে আলাপ হয় শম্ভু মিত্রর। তাঁরই প্রযোজনায় আলমগীর নাটকে অভিনয়ও করেছিলেন তিনি। যদিও তখন থেকেই নাট্যজগতে শিশিরকুমারের থেকে আলাদা ঘরানা তৈরিতে উদ্যোগী হন শম্ভু মিত্র। ১৯৪৩ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক পি সি যোশির অনুপ্রেরণায় ভারতীয় গণনাট্য সংঘে যোগ দেন। ওই সময়ই তাঁর সঙ্গে তৃপ্তি মিত্রের কাছাকাছি আসা। ১৯৪৫ সালের ১০ ডিসেম্বর তৃপ্তি মিত্রের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।

১৯৪৯ সালে তুলসী লাহিড়ীর ‘পথিক’ প্রযোজনা করেই বাংলা থিয়েটারের দুনিয়ায় পথচলা শুরু ‘বহুরূপী’র। এর পর নিজে কলম ধরেন শম্ভু মিত্র। লিখেছেন ‘উলুখাগড়া’ (১৯৪৯), ‘বিভাব’ (১৯৫১)-এর মতো নাটক। ১৯৫১ সালেই শম্ভু মিত্র হাত দেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চার অধ্যায়’-এ। সাধারণ দেশবাসীকে লুঠ করে স্বরাজ আনার ধারনাকে কঠিন প্রশ্নচিহ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন এই ‘চার অধ্যায়’-এর মাধ্যমেই। তাঁর নির্দেশনায় ১৯৫৪ সালে ‘বহুরূপী’র ‘রক্তকরবী’ তো বাংলা থিয়েটারে নতুন ইতিহাস রচনা করেছিলো। হয়ে উঠেছিলো কিংবদন্তি বাংলা নাটক।

বাংলা থিয়েটারে নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছেন শম্ভু মিত্র। ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিক ট্র্যাজেডির আঙ্গিককে বাংলার মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। শুধু বাংলায় নয়, ভারতীয় থিয়েটারের ইতিহাসেও সেই প্রথম। বাঙালি পরিচিত হয়েছিলো ক্ল্যাসিক্যাল গ্রিক ট্র্যাজেডির মোহময় বেদনার সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে ‘বাকি ইতিহাস’-সময় থেকেই বিষয়গত বাস্তবতা থেকে খানিকটা সরে এসে কিছুটা ‘অ্যাবসার্ড থিয়েটার’-এর দিকে বাঁক নেয় ‘বহুরূপী’। এর পর শম্ভু মিত্র বাংলা থিয়েটারকে শুধুমাত্র বাংলার নাট্যব্যক্তিত্বদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চাননি। সত্যদেব দুবে, শ্রীরাম লাগু, গিরীশ কারনাড, বিজয় তেন্ডুলকরের মতো অভিনেতা, নাট্যব্যক্তিত্বদের নিয়ে এসেছিলেন ‘বহুরূপী’র প্রযোজনায়।

শম্ভু মিত্রর জন্ম ১৯১৫ সালের ২২ অগস্ট কলকাতার ডোভার রোডে। বাবা শরৎকুমার, মা শতদলবাসিনী। শম্ভুরা তিন ভাই, পাঁচ বোন। বড় ভাই কাশীনাথ। পাঁচ বোনের মধ্যে একজন শৈশবেই মারা যান। বাকিরা হলেন বনলতা, তরুলতা, পুষ্পলতা ও মাধবীলতা। এদের জন্মের কয়েক বছরের ব্যবধানে মধ্যম পুত্র শম্ভু ও সব থেকে ছোট শঙ্করনাথের জন্ম হয়।

শরৎকুমারের পূর্বপুরুষ ছিলেন হুগলি জেলার কলাছড়া গ্রামের জমিদার। যদিও শরৎকুমার কোনও দিনই জমিদারি বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন না। তিনি জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার গ্রন্থাগারে চাকরি করতেন। অবসর নেওয়ার পর সামান্য সঞ্চয় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশে। সেখানেই জীবনের শেষ দিন অবধি কাটিয়েছেন। অন্য দিকে মা শতদলবাসিনী ছিলেন ভবানীপুরের স্বনামধন্য ডাক্তার আদ্যনাথ বসুর কন্যা। বিয়ের দিন তাঁর হবু স্বামীর অকালপ্রয়াণে বাবার অনুরোধে তিনি বিয়ে করেছিলেন শরৎকুমারকে। স্ত্রীর ভরণপোষণের ক্ষমতা শরৎকুমারের ছিল না। আদ্যনাথই সে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কলকাতার ডোভার রোডে একটি বাড়ি তিনি যৌতুক দিয়েছিলেন জামাইকে। শতদলবাসিনী খুব বেশি দিন বাঁচেননি। কিন্তু শম্ভুর জীবনে মায়ের প্রভাব এতটাই ছিল যে, খারাপ কাজ করার কথা ভাবতে পারেননি। তাঁর শুধু মনে হতো, ‘মা আকাশ থেকে সব দেখছেন।’

সত্তরের দশকে একটি আর্ট কমপ্লেক্স নির্মাণে উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছিলো বঙ্গীয় নাট্যমঞ্চ সমিতি। কিন্তু রাজ্য সরকারের অসহযোগিতায় প্রয়োজনীয় জমি না পাওয়ায় সেই পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। যদিও এই দাবি নিয়ে সেই সময় শম্ভু মিত্র তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন৷ শোনা যায়, তখন তাঁকে সিদ্ধার্থশঙ্কর জানিয়েছিলেন, উৎপল দত্ত একই উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকারে কাছ থেকে জমি চেয়েছেন৷ এই কথা শুনে ক্ষুব্ধ শম্ভুবাবুর জবাব ছিলো, ‘ মানু (সিদ্ধার্থশঙ্করের ডাক নাম) জমি দিতে না চাও দিও না কিন্তু এভাবে আমাদের মধ্য ঝগড়া লাগিয়ে দিও না৷’

তিনি চলে গিয়েছিলেন কাউকে কিছু না জানিয়ে। নিঃশব্দে, রাতের অন্ধকারে। তেমনই ইচ্ছে ছিলো তাঁর। কন্যা শাঁওলীকে লিখেছিলেন তাঁর ‘ইচ্ছাপত্র’। এক বার নয়, বেশ কয়েক বার। ১৯৯৭ সালের ১৮ মে রাত দুটো বেজে ১৫ মিনিটে শম্ভু মিত্র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার পর তাঁরই ইচ্ছে অনুযায়ী শাঁওলী গভীর রাতে সিরিটির শ্মশানে বৈদ্যুতিক চুল্লিতে তাঁর নশ্বর দেহটি দাহ করে ফিরে এসে বাবার মৃত্যুসংবাদ জানিয়েছিলেন। শ্মশানের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি মধ্যরাতের শ্মশানযাত্রীদের দেখে ও মৃত মানুষটির নাম জেনে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ইনি কি সেই শম্ভু মিত্র? যিনি নাটক করেন?’ উত্তর পাননি। পাওয়ার কথা নয়। কারণ, তিনি ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, ‘আমি সামান্য মানুষ, জীবনে অনেক জিনিষ এড়িয়ে চলেছি। তাই মরবার পরেও আমার দেহটা যেন তেমনি নীরবে, একটু ভদ্রতার সঙ্গে, সামান্য বেশে, বেশ একটু নির্লিপ্তির সঙ্গে পুড়ে যেতে পারে।’

তবু এই যাওয়ার ধরনটিকে মেনে নিতে কষ্ট হয়েছিলো তাঁর অগণিত শুভানুধ্যায়ীর। শম্ভু মিত্র ছিলেন বাংলার নবনাট্যের জনক। প্রবাদপুরুষ। সেই মানুষটিই যখন জীবনের মঞ্চ থেকে নিজের অন্তিম প্রস্থানকে নিখুঁত ভাবে লিখে দিয়ে যান, তাকে অস্বীকার করার অধিকার কারও থাকে না। শুধু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন?

শাঁওলী তাঁর পিতার জীবনী লিখতে গিয়ে জানিয়েছেন, ‘জীবনভর অনেক মন্দ কথা শুনেও, নাট্যমঞ্চ নির্মাণের ক্ষেত্রে বারংবার অসফল হয়ে এবং বারংবার বিশ্বাসঘাতকতার আঘাত সহ্য করেও, নিজের শিষ্যদের কাছে চরম অপমানিত হয়েও যিনি হতাশা বা নৈরাশ্যে ভোগেননি, জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও যিনি বলেছেন, ‘স্বপ্ন তো দেখতেই হবে। স্বপ্নগুলো সব কাচের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে। আবার সেগুলো তো জড়ো করতে হবে’,’ প্রশ্নটা থেকেই গিয়েছে…

আজ শম্ভু মিত্রের ১০৪তম জন্মদিনে যদি তাঁকে আধুনিক ভারতীয় নাটকের পথিকৃৎ বলা হয়, তবে তা মোটেই অত্যুক্তি করা হবে না।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]