তিব্বত কৌটোর তুষার পাহাড়ের ছবি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

শামীম আজাদ

( লণ্ডন থেকে): বাংলাদেশ বিমানে করে ফিরে আসছি লন্ডন। কিছুক্ষনের মধ্যেই জানালায় দেখি কোমল মেয়েদের মত মেঘের পরত। এক সময় সব সাদা হয়ে গেল আর উঁচু নিচু পাহাড় জেগে উঠলো। ছোট বেলায় দেখা কোহিনূর ক্যামিকেলের স্নো’র ডিবেতে দেখা পাহাড়ের মত।

আম্মা মুখে তিব্বত স্নো মাখতেন। পন্ডস এসেছে আরো পরে। স্নো, কাজল অথবা সুরমা আর গরমের কালে পাউডার দিতেন। এই ছিলো মায়ের মূখ্য মেকাপ। স্নো’র বাক্স থেকে ডিবেটা বের করে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচ মুক্ত করে রূপালী ঢাকনাটা টেবিলে রাখতেন। আর তক্ষুনি বাইরে লাফিয়ে পড়তো এক পরাবাস্তব সুগন্ধ। বারো তেরো বছরের আমি, কিশোরী কৌতুহলে গালে হাত দিইয়ে তার সাজ দেখতাম। স্নোবাক্সের একদিকে এক ধবধবে বরফ পাহাড়ের ছবি। বরফতো ইংরাজিতে স্নো। ভাবতাম ওই পাহাড় থেকে স্নো এনে বানানো হয়েছে ওই ক্রিম। না হলে কি করে তা হুবহু ওই ছবির মত সাদা!

আমি তিব্বত কৌটোর তুষার পাহাড়ের ছবি মুগ্ধ হয়ে দেখতাম আর আম্মা ঘি তোলার মত আংগুল বাঁকিয়ে সেই স্নো তুলে নিয়ে আসতেন নির্দেশিকার মাথায়। তারপর সেই সাদা নরম থিকথিকে পরম ময়েশ্চারাইজার সারা মুখায়বের বিশেষ বিশেষ স্থানে ফোঁটা ফোঁটা করে লাগাতেন। প্রথমে নাকের মাথায় এবং তারপর যথাক্রমে তার গোলাপি দু’গাল, থুতনি এবং কপালে। এরপর দু’করতল দিয়ে ঘষে ঘষে তা ছড়িয়ে দিতেন সারা মুখায়বে। তখন আবার ছড়িয়ে পড়তো আরেক প্রস্থ সুগন্ধ।

যেদিন আমার নাচ থাকতো, সেদিন গ্রীন রুমে আম্মা আমাকে স্নো দিয়ে সাজাতেন। যেমন করে তখন বিয়ের কনের মুখে কাঠি দিয়ে স্নো তুলে তুলে মুখে আল্পনা আঁকা হোত। ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই তা শক্ত সুন্দর নক্শা হয়ে বসে থাকতো।

রোজার ছুটিতে সিলেট গেলে পথে পাহাড় দেখেছি, তার সবইতো সবুজ। আব্বা বলেছেন তিব্বত নামে যে জায়গা সেখানের পাহাড় ওভাবেই দুধসাদা বরফেই ঢেকে থাকে সারা বছর। আর বিলেতেও যেখানে আমার তিন মামা -মায়া মামা, সোনা মামা ও মনি মামা থাকেন সেখানেও শীতে অনেক বরফ পড়ে। যা আমি এখন নিজেই দেখি।

তখন আমাদের কোন ড্রেসিং টেবিল ছিলোনা। ছিলো মাছের পিঠরঙা একটি স্টিলের আলমারি। আলমারির কপাটে লাগানো আয়না দেখেই মার স্নো মাখা, সোনালী কাজলদানী থেকে হাতে তোলা কাজল চোখে পরা বা রূপালী সুরমাদানী ঝাঁকিয়ে তার ভেতরের বিপদজনক শলাকা দিয়ে চোখের কপাটের এধার ওধার করা এবং সব শেষে শাড়ি পালটানো- ব্যস। আম্মাকে কোনোদিন লিপস্টিক দিতে দেখিনি। শেষের দিকে দিতেন পেট্রলিয়াম জেলি। রাতে মুখ ধুয়ে হাতের তালুতে ঘন গ্লিসারিনের উপর দু’ফোঁটা তীব্রগন্ধী কেওড়া জল মিশিয়ে পায়ের গোড়ালীতে পরম যত্নে মেখে নিতেন। আম্মার পা কখনো রুক্ষ হতোনা। আম্মা তাঁর পায়ের গোড়ালী ঝামা নামের ঘন কলিজা কালারের পাথর দিয়ে স্নান ঘরের কাঠের পিড়িতে বসে ঘষে নিতেন। ছুটির দিনে আমাদের উপর চলতো সে অত্যাচার। আর আমি খালি গায়ে কুচিওলা প্যান্ট পরে হিহি করে কাঁপতে থাকলেও তিনি গায়ে গ্লিসারিন-গোলাপজল মাখতেই থাকতেন।

আম্মা শাড়ি ঠিক করার মধ্যে, আব্বা ততক্ষণে তার পেছনে দাঁড়িয়ে চিরুনী চালিয়ে চুল ব্যাকব্রাশ করে চশমার খোল থেকে হলুদ ফ্লানেল টুকরো বের করে চশমার কাচ মুছে নিয়েছেন। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে রিক্সা করে বালুর মাঠ পেরিয়ে হয় খালামনির বাসা বাবুরাইল যেতেন। না হয় যেতেন রাইফেল ক্লাবে। ওই সবই ছিল তাদের সান্ধ্য মিলনমেলার স্থান। তাদের ফেরার শব্দ শুনতেই ঝিমানো ছেড়ে পড়ার টেবিল থেকে আমি উচ্চস্বরে মুখস্ত কবিতা শুরু করে দিতাম… তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে ইত্যাদি।

প্লেনের জানালায় আধ ভাঙা স্মৃতি রেখে গরম বিরিয়ানীর স্বাদু গন্ধে এবার আমি ভেতরে তাকাই। খাবার দেয়া শুরু হয়েছে।

ছবি: গুগল