তীরে বাঁধা ঘর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রভাতী দাস

(ভার্জিনিয়া থেকে): ওই গানটা আছে না…

‘এই কীর্তিনাশা’র তীরে বাইন্ধা ছিনু ঘর

নদী ভাইঙ্গা নিল তাই হইলাম দেশান্তর…’ আমাদের সময়ের জনপ্রিয় গায়ক/ব্যান্ডশিল্পী তপন চৌধুরী গেয়েছিলেন, এটি তার একক নয়, তখনকার বিখ্যাত ব্যান্ড সোলস’এর গান। আমাদের কৈশোরের অনেকটাই কেটেছে সোলস আর তপনের সঙ্গে। এই অ্যালবাম যখন রিলিজ হয়, তখন সম্ভবত হাইস্কুলে পড়ি। গানটির একটি দৃশ্যায়নও হয়েছিলো। বিটিভিতে দেখানো হতো। তপন এবং সোলস কীর্তিনাশা নদীতে নৌকায় ভাসতে ভাসতে গাইছেন। গানের কথায় ‘স্বজন হারানো পোড়া মন শুধু কাঁদে’ র মতো খুব কেমন মন হুহু করা একটা ব্যাপার ছিলো। কৈশোরের সেই সময়ে গান শুনতে শুনতে গায়কের সঙ্গে, দৃশ্যের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিতে পারতাম সহজেই…।

আমাদের আদি বাড়িটি নদীর পাড় ঘেঁষে ছিলো। আমাদের নদী, আড়িয়াল খাঁ-কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিলো আমাদের জনবসতি। আমাদের জীবনের মতো, জীবন যাপনের মতোই ধ্রুব ছিল, আমাদের আড়িয়াল খাঁ। সে-ও ভেঙে নিয়ে যেতো কত ঘর-বাড়ি, ফসলের ক্ষেত… দেশান্তরি হতো কতোজনা। তবুও নদীর প্রতি ভালোবাসা কারো কমেছে কোনদিন শুনিনি। যদিও নদীর ভাঙন আমাদের পরিবারকে দেশান্তরি করেনি, জীবনের প্রয়োজন করেছিলো তবুও দেশান্তরি হবার অনুভূতি সময় সময় তীব্রভাবেই ছুঁয়ে যেতো আমাদেরও। কার অনুভব কবেই বা কারণ মেনে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে!

আড়িয়াল খাঁকে অস্তিত্বের অংশ জেনে বড় হয়েছি বলেই হয়তো, নদীর বা জলাধারের প্রতি আমার অপরিমেয় ভালোবাসা, এ-এক চিরকালীন প্রেম। এক দেখাতেই ভালোলাগেনি বা ভালোবাসিনি এমন কোন নদীর দেখা পাইনি এখনো। নদী দেখলে তার পাড়ে ঘর বাঁধার ইচ্ছেটাও উঁকি দেয় চুপিচুপি মনের মধ্যে।

নদীর ভাঙনের ভয়ে আমাদের দেশে কেউ নদী বা সমুদ্রের পাড়ে ঘর বাঁধতে না চাইলেও এই দেশে নদী, সমুদ্র বা জলাধারের পাড়ের বাড়ি সবার অতি আকাঙ্ক্ষিত। কোন বাড়ির আশপাশ ঘেঁষে নদী বা সমুদ্র থাকলে তো কথাই নেই, ছোটখাট কোনো পুকুর, খাল এমনকি ডোবা বা নালা থাকলেও তাকে, ‘ওয়াটার ফ্রন্ট প্রপার্টি ‘ বলে ট্যাগ দিয়ে উচ্চমুল্যে বিক্রয় করা হয় এদেশে। সত্যিকারের নদী বা লেকের ধারের জমি অতি উচ্চমূল্যে বিক্রয় হয় বলে, নদীর ধারে গড়ে ওঠা বেশীর ভাগ জনবসতি-ই ভীষন ঘন। সবারই এক চিলতে পাড় চাই, এক টুকরো জলজ সম্পত্তি চাই, নদীতে নৌকা ভাসানোর ডক চাই,

তাই মধ্যবিত্তের সামর্থের মধ্যে থাকা বাড়িগুলোকে বেশীরভাগ সময়ই একে অন্যের ঘাড়ের উপর চেপে বসা বলে মনে হয়। মিলিয়ন ডলার খরচ করে শুধু নামের জন্য নদীর পাড়ে বাড়ি হয় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে। সব অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে, সব নদী, সমুদ্র বা জলাশয়ের ক্ষেত্রে এই কথাটি পুরোপুরি না হলেও কমবেশী সত্য। তাই আ

আড়িয়াল খাঁ

মেরিকার বিখ্যাত দুইটি নদী এবং আটলাণ্টিকের বে’র খুব কাছাকাছি থেকেও নদীর পাড়ে ঘর বাঁধার ইচ্ছেটা আপাতত লুকানো কোটরে বন্দী করে রাখতে হয়েছে। তবুও ইচ্ছেটা মাঝে মাঝে পেয়ে বসে বৈকি !

যে কোন ইচ্ছেপূরণ-ই এই ‘এয়ার বিনবি’র জমানায় কঠিন কিছু নয় অবশ্য। নদী, সমুদ্র বা লেকের পাড়ের বাড়িতে খুব সহজেই থাকা সম্ভব, সামর্থ্য এবং পছন্দ মতো কেবিন, বাড়ি বা প্রাসাদ যা-ই চাই না কেন, খুঁজে নিয়ে সময়মতো তা ভাড়া করে নিলেই হলো। এবারে তাই করলাম। স্মিথ মাউন্টেইন লেকের জলের খুব কাছাকাছি বাড়িটি ভাড়া করেছিলাম এবারের ইংরেজী নববর্ষ কাটাতে। যেদিন গিয়ে পৌঁছেছিলাম সেদিন সারাদিন টিপটিপ বৃষ্টি, শীতের হিমাঙ্ক ঘেঁষা তাপমাত্রা আর লেকের বুকে জমে থাকা ঘন কুয়াশায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তকে আলাদা করে চেনা যায়নি, দমে গিয়েছিলাম কিছুটা। কিন্তু প্রকৃতি আমার লুকানো ইচ্ছেটির কথা মনে রেখেছিলেন নিশ্চিত, তিনি অমোল আলোয় ঝলমল দ্বিতীয় দিনটিকে মনেহয় একান্ত আমার জন্যই উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মেঘলা আকাশ আর ত্রিশের ঘরের তাপমাত্রা কে মিথ্যে করে দিয়ে সেদিন তাপমাত্রা ষাটের ঘরে গিয়ে পৌঁছেছিলো। জলের খুব কাছাকাছি নিজের মতো করে অলস সময় কাটানোর অনেক পুরানো ইচ্ছেটি পূরণ করেছি সেদিন। সকালের হালকা আলোর সূর্যোদয় থেকে বিকেলের অপার্থিব সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে আড়িয়াল খাঁ কথা ভাবছিলাম, জলের প্রতি ভালোবাসার পুরোটাই তাঁকে উৎসর্গ করতে করতে, তপনের গানটি গাইছিলাম গুনগুন করে…

‘…তীরে বাইন্ধ্যা ছিনু ঘর…’ ।

হোকনা সল্পকালীন, হোকনা ভাড়া করা, তবুও তীরে বাঁধা ঘর তো …।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments