তুংনাথের জাদু

এস এম এমদাদুল ইসলাম

রাস্কিন বন্ড ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত ভারতীয় লেখক।বন্ডের জীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে হিমালয়ের পাদদেশে পাহাড়ী ষ্টেশনে। তাঁর প্রথম উপন্যাস “দ্য রুম অন দ্য রুফ” তিনি লিখেছিলেন ১৭ বছরবয়সে এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিলো যখন তার বয়স ২১ বছর। তিনি তার পরিবার নিয়ে ভারতের মুসৌরিতে থাকেন। Our Trees Still Grow in Dehra লেখার জন্য ১৯৯২ সালে তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরষ্কার পান। ১৯৯৯ সালে পদ্মশ্রী এবং ২০১৪ সালে পদ্মভূষণ পুরষ্কারে ভূষিত হন। তিরিশটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন তিনি। লিখেছেন প্রচুর নিবন্ধও। রাস্কিন বন্ডের উপন্যাস ‘অল রোডস লিড টু গঙ্গা’ একটি আলোচিত উপন্যাস। প্রাণের বাংলায় এই উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ করেছেন  এস এম এমদাদুল ইসলাম। ‘হিমালয় ও গঙ্গা’ নামে উপন্যাসের ধারাবাহিক অনুবাদ এখন থেকে প্রকাশিত হবে প্রাণের বাংলায়।

সৌন্দর্য আবিষ্কারের আশায় আসা পর্যটকরা গাড়োয়ালের পাহাড় আর উপত্যকায় এসে হতাশ হননা কখনো। এখানকার প্রকৃতি নিজের কাছে লুকিয়ে রাখা কিছুনা কিছু আনন্দ-বিস্ময় হঠাৎ হঠাৎ বের করে দেয় তাদের উদ্দেশে। হিমালয়ের প্রতিটি আনাচে কানাচের খবর জানা সম্ভব নয়, ফলে অনুসন্ধানে কোনো নতুন বাঁক, বনাঞ্চল, ঘাসে ছাওয়া পথ, পাহাড়ি স্রোত বা পথের পাশে ছোট্ট একটা মন্দিরের দেখা মিলেই যায়।
হিমালয়ের পর্বত-শ্রেণির ভেতর দিকটাতে অবস্থিত তুংনাথের মন্দিরটি সর্বোচ্চ উচ্চতায় বিরাজ করছে- ১২,০০০ ফুট। চন্দ্রশিলা চূড়ার ঠিক নিচে এর অবস্থান। প্রধান তীর্থপথ থেকে একটু দূরে থাকায় কেদারনাথ বা বদ্রিনাথের চাইতে এখানে পুণ্যদর্শনার্থীদের সংখ্যা অনেক কম, যদিও এটি পঞ্চকেদারের একটি। এই মন্দিরের পুরোহিত একজন স্থানীয়, মাকু নামক গাঁয়ের এক ব্রাহ্মণ। অন্যান্য কেদার মন্দিরের পুরোহিতরা দক্ষিণ ভারতীয়, অষ্টম শতকের হিন্দু সংস্কারবাদী শংকরাচার্য এই প্রথা চালু করেছিলেন।
তুংনাথের নিঃসঙ্গ মহিমার এক জাদু রয়েছে। ওখানে যেতে (বা জায়গাটা পেরিয়ে যেতে) আপনি গাড়োয়াল হিমালয়ের কয়েকটি অসাধারণ বনের দেখা পাবেন। এখানে এলে তীর্থযাত্রী, কী ট্রেকার, বা আমার মতো উদ্দেশ্যবিহীন ঘুরতে আসা কেউ বন-সতেজ হয়ে ফিরবেন,ফিরবেন মানবজাতি বনাঞ্চল ধ্বংসে মেতে ওঠার আগে পৃথিবীটা কেমন ছিলো তার একটা পরিষ্কার ধারণা নিয়ে।
দুইরিতাল নামে একটি ছোটো হ্রদ উখিমঠের উপরে ৮,০০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ের উপর শুয়ে আছে। গাড়োয়ালের এক আদি ব্রিটিশ কমিশনার, জে. এইচ. ব্যাটেন-এর খুব প্রিয় জায়গা ছিলো এটা। বিশ বছর তার কর্তৃত্ব ছিলো সেখানে, ১৮৩৬ থেকে ১৮৫৬ পর্যন্ত। তিনি লিখেছেন: ‘যেদিন এসে পৌঁছাই সেদিন তুষারপাত হচ্ছিলো এবং কচি গাছগুলো তুষারের ভারে ন্যুব্জ হয়ে ছিলো। হ্রদের পানি নিচে দু’ইঞ্চিরও বেশি জমে বরফ হয়ে গিয়েছিলো। মানুষজনের চিহ্ন নেই, জায়গাটি যেন নির্জনতার এক প্রতীক। পরদিন সকালে সূর্য উঠলে দেখা গেল কেদারনাথ পর্যন্ত বিস্তৃত চৌখাম্বা সহ অন্যান্য চূড়া নতুন করে আবার তুষারে তৈরি কম্বলে ঢেকে গিয়েছে। দৃশ্যটি এতই হৃদয়গ্রাহী যে ওর দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ে থাকতে ক্লান্তি ধরেনা। আমার মনে হয়, যে মানুষের মনে হতাশা স্থায়ী বাসা বেঁধেছে সে-ও এখানে এলে দুইরি তাল- এর পরিবেশে কষ্ট ভুলে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে, প্রাণ আনন্দে নেচে উঠবে তারও।’
বলতে গেলে তুংনাথ পাহাড়শ্রেণির যে কোনোখানেই চিত্ত উৎফুল্ল হওয়ার মতো উপকরণ রয়েছে। দুইরি তাল অবশ্য সরু পথটি থেকে বেশ খানিকটা দূরে, রাত্রিযাপনের জন্য কেউ এলে তাকে সঙ্গে করে তাবু নিয়ে আসতে হবে। ওখান থেকে আরেকটু গেলে পথ উঠে গেছে ৯,০০০ ফুট উঁচুতে ডুগালবেটা চূড়ায়। ওখানে পি. ডাবলিউ. ডি. -এর একটা বিশ্রামাগার রয়েছে বেশ রঙচঙা। পাইন ও সিডারের সঙ্গে ঘন সবুজের মাঝে রেস্টহাউজটি দেখতে একটা অচেনা অর্কিডের মতই লাগে। সরকারি কর্মকর্তারা যারাই এখানে থেকেছেন তারা প্রত্যেকেই বলতে গেলে দুগালবেটা-এর গুনগান করেছেন। আপনি বেসরকারি কেউ হলে সেক্ষেত্রে রেস্টহাউজে থাকার অনুমতি আপনার নেই, কিন্তু তাতে কী? একটু এগুলেই চপ্তা, আরো সবুজ, সেখানে তীর্থযাত্রী বা অন্য যেকোনো কষ্টসহিষ্ণু পর্যটকের জন্য আশ্রয় মিলবে। দু’তিনটে চায়ের দোকানে লেপ-তোশক মিলবে। গাড়োয়াল মণ্ডল বিকাশ নিগম একটা বিশ্রামাগার খুলেছে। গাড়োয়ালের দৈর্ঘ-প্রস্থ জুড়ে এরকম বিশ্রামাগার ছড়িয়ে রয়েছে, যা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আশীর্বাদের মতো। তবে তীর্থের মৌসুমে (মে/জুন), রেস্টহাউজগুলোতে ভিড় উপচে পড়ে। তখন হঠাৎ কেউ চলে এলে তাকে ওই চা-দোকানিদের স্মরণাপন্ন হতে হবে। ভাগ্য ভালো হলে হয়তো আরামদায়ক ও পরিষ্কার একটা থাকার জায়গা মিলে যেতেও পারে সেখানে।
চোপ্তা থেকে তুংনাথ মাত্র সাড়ে তিন ঘণ্টার ট্রেক, তবে এটুকু পথে আপনাকে ৩,০০০ ফুট উঠে যেতে হবে, কখনো মনে হবে সম্পূর্ণ খাড়া উঠতে হচ্ছে আপনাকে। আমার মনে হয়েছে, যেন মইয়ে চড়ে স্বর্গারোহন।
পথ দুরারোহ ও খাড়া হওয়া সত্ত্বেও আমার দুর্দান্ত আরোহী সঙ্গী গনেশ সাইলি গোঁ ধরলো সংক্ষিপ্ত রাস্তা বের করতে। আমাদের নখ ও আঙুল গেঁথে গেঁথে পাহাড়ের খাঁজ ধরে কিছুটা উঠছি, আবার পথ অগম্য হওয়ায় ইঞ্চি ইঞ্চি করে নেমে পড়ছি, এভাবে চলতে লাগলো। এ যেন সাপ লুডু খেলার মতো।
উপরে উঠতেই দেখা মিলল দেবতা গনেশের উদ্দেশে নিবেদিত এক রক্ষক মন্দিরের। চারিদিকে মনমাতানো গাঢ় সবুজের আবহে, আর টাট্কা হাওয়ায় তেমন ক্লান্ত আমি হইনি। চওড়া ঢাল জুড়ে অসংখ্য বুনো ফুল ফুটে আছে- সোনালি শিমুল (বাটার কাপ), অ্যানিমোনি, জংলা স্ট্রবেরি, ফরগেট-মি-নট, আরো কতো কী! এই সময়টাতে ভাইয়ুন্ডার-এর পুষ্প-উপত্যকায় প্রচুর ফুল ফোটে, তবে এখানকার অবস্থা তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
এই পার্বত্য তৃণভূমিতে পৌঁছার আগে আমরা এক রডোডেনড্রন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে উঠে আসি। এখানে রডোডেনড্রনের অন্তত তিনটি জাত দেখা যাবে। লাল রঙের ফুল-যা হিমালয়ের ৬,০০০ ফুট থেকে ১০,০০০ ফুটের মধ্যে সর্বত্র দেখতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় জাতটি দেখতে হালকা লাল বা গোলাপি; আর তৃতীয়টি সাদা রঙের-১০,০০০ ফুট থেকে ১৩,০০০ ফুটের মধ্যে এদের দর্শন মেলে। এই ফুলের ঝোপ উচ্চতায় বারো ফুটের উপরে কমই হয়, আর বছরের প্রায় ছয়মাস তুষারের বোঝা বয়েবেড়াতে হয় বলে এরা বেড়েও ওঠে একটু এঁকেবেঁকে।
আমাদের পর্বতারোহনে এই ঝোপওয়ালা রডোডেনড্রন-ই হলো শেষ বৃক্ষ, কারণ এরপর তুংনাথের পথে যত এগোই বড়ো গাছ আর দেখা যায় না। আসমান আর জমিনের মাঝে কেবল ঘাস, পাথর, আর ছোটো কিছু ফুল। আমাদের মাথার উপরে একজোড়া কাক একটা চিল্কে তাড়া করে ফিরছে। চিল্টি নিজেকে ওদের হাত থেকে বাঁচাবার যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। টিকে থাকার ক্ষেত্রে কাকেরা দুনিয়ার সেরা। এরা যেকোনো উচ্চতায়, যেকোনো আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে, তা দিল্লির এঁদো গলিতেই হোক, কী তুংনাথের পাহাড়েই হোক।
এখানে অন্তত এমন আরেকটি প্রাণী দেখা যায়। পিকা-একধরনের ছুঁচো-খরগোস, দেখতে না খরগোসের মতো, না ছুঁচোর মতো। বরং অনেকটা খুদে গিনিপিগ-এর মতো; ছোটো একজোড়া কান, লেজ নেই, ধুসর-বাদামি লোম, মোটাসোটা পা। এরা পাথরের ভিতরে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে ঘাসের খোঁজে। ঘাস খেয়েই বাঁচে এরা। তাদের এই সরল খাদ্যাভ্যাস ও শরীরের পুরু লোম এদেরকে এরকম চরম আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সাহায্য করে। ১৬,০০০ ফুট উচ্চতাতেও এদেরকে দেখা গেছে, যা কিনা কোনো স্তন্যপায়ীর টিকে থাকার উচ্চতার সীমার উপরে।গাড়োয়ালিরা এই খুদে প্রাণীটিকে রুন্ডা বলে ডাকে। মন্দিরের পুরোহিত অন্তত এদেরকে এই নামেই ডেকেছেন এবং বলেছেন যে ঘর-বাড়িতে ঢুকে শস্য বা অন্য কোনো খাবার খুঁজে খেতে এদের কোনো অস্বস্তি নেই। এতে মনে হয় এদের মধ্যে খরগোসের চাইতে বরং ছুঁচোর বৈশিষ্ট বেশি বিদ্যমান।
চোপ্তা থেকে তুংনাথ পর্যন্ত সারা পথেই এই রুন্ডারা ছিলো আমাদের সঙ্গে। পাথরের আড়ালে গর্ত থেকে উঁকি দিচ্ছে বা কখনো আমাদের সামনে দিয়েই ছুটে যাচ্ছে আরেকদিকে। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের উপস্থিতি এদেরকে মোটেই বিব্রত করছেনা। তুংনাথে এরা মেঝে বাঁধাবার পাথরের স্তুপের আড়ালে থাকে। পুরোহিতের নাতি-নাতনিরা খেলতে গিয়ে ওদেরকে আবিষ্কার করে। রুন্ডারা একবার এক গর্তে অদৃশ্য হয়ে আরেকটা দিয়ে বেরিয়ে আসছে। মাটির নিচে নিশ্চয় ওরা রাস্তা বানিয়ে নিয়েছে।
আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে তুংনাথের আকাশে মেঘ জমে উঠেছে, যেমনটা প্রায় প্রতিটি সন্ধ্যায়ই হচ্ছে। ঘোর হয়ে আসা পরিবেশে মন্দিরটিকে অনেকটা জৌলুসহীন লাগছে।
কেউ কেউ ‘তুং’ নামের সার্থকতা খোঁজে মন্দিরটির সুউচ্চ অবস্থানের মধ্যে, এর অর্থ হচ্ছে-‘শীর্ষে’। অন্যদের কাছে এর তাৎপর্য ভিন্ন। ‘টাংনা’ শব্দের অর্থ হলো ‘ঝুলবে’-এমন। এটি ইঙ্গিত করে কোন্ অবস্থায় ঈশ্বরের পুজো হয় এখানে তার প্রতি। এখানে পুজোর প্রতীক হলো শম্ভুলিঙ্গ। শিবরাত্রিতে সত্যিকারের ভক্ত তাদের বিশ্বাসের চোখ দিয়ে দেখলে দেখতে পাবে, লিঙ্গের আকার বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে পাপীদের চোখে ওই দৃশ্য ধরা দেবে না।
মন্দিরটি খুব বড়ো না হলেও দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। এর কারণ হলো আস্ত সব ধুসর গ্রানাইট-এর মস্ত সব খণ্ড থেকে এর নির্মাণ বিন্যাস। জায়গাটায় এসে কেন যেন আমার এমিলি ব্রন্তে-এর ‘উদারিং হাইটস’-এর সেই ঊষর, বাতাস-বিধৌত, খোলা আকাশের নিচের নির্জনতার কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দির থেকে নিচের দিকে তাকালে আপনার নজরে আসবে ছাইরঙা স্লেটে ছাওয়া পাথরের স্তুপে তৈরি ঘর-বাড়ি সমেত অর্ধেক পরিত্যক্ত ছোট্ট গ্রামটি। গ্রীষ্মকালে এটি ব্যস্ত থাকে। এখন কেবল কষ্টসহিষ্ণু কয়েকটি মানুষ থাকে ওখানে, বেশিরভাগ তীর্থযাত্রী আজকাল নিচে চোপ্তায় রাত কাটাতে পছন্দ করে।
এমনকি মন্দিরটির পুরোহিত, যিনি তাঁর পুত্র-পৌত্র নিয়ে এখানে আছেন, তিনিও এই ঠান্ডার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তিক্ততার সঙ্গে। প্রতিদিন নগ্নপায়ে ওই শীতল পাথরে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো বিচারেই সহজ কাজ নয়। পাঁচমিনিটেই আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়, তার উপরে আবার মেঝেতে জমে থাকা বরফশীতল পানিতে পা পড়ে গিয়েছিল একটু। ভালো একজন তীর্থযাত্রী বনবার কোনো সম্ভাবনাই আমার নেই, না এই দুনিয়াতে মিলবে কোনো পুরষ্কার, না ওই পারে গিয়ে। তবে আমার মনে হয়েছে পুরোহিতের পায়ের তলার চামড়া বেশ পুরু, আর তাঁর ছেলেদেরও যেন কোনো বোধ নেই এই ঠান্ডার ব্যাপারে। তারপরেও অক্টোবরে দুগালবেটা-এর নিচে তাদের গাঁ মাকু-তে যেতে পেরে নিশ্চয় বেজায় খুশি হবে তারা।
মন্দির ছেড়ে আসতেই বৃষ্টি নামলো। ভাঙাচোড়া ধর্মশালার ভিতর ভেড়াদের উপস্থিতি লক্ষ করি আমরা। ক্রন্দনরত সুরমারঙা আকাশে তখনো উড়ে বেড়াচ্ছে কাক, তবে চিলেরা নিরাপদ জায়গায় চলে গিয়েছে আগেই। একটা রুন্ডা নাক বের করে আনলো তার গর্তমুখ থেকে, বোধহয় আবহাওয়াটা একনজর দেখে নেবার জন্য। হঠাৎ কড়কড় শব্দে বাজ ডেকে উঠতেই সুড়ুৎ করে অদৃশ্য হলো সে, ঠিক ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর সাদা খরগোসের মতো। তুংনাথ ছেড়ে অর্ধেক পথ নামতেই বৃষ্টির জোর বেড়ে গেল। ঠিক তখনি আমরা প্রকৃত একদল তীর্থযাত্রীর দেখা পেলাম, একদল সাহসী বাঙালী, সোজা বৃষ্টির ভিতরে নেমে পড়েছে। এদের কারো সাথে ছাতা বা বর্ষাতি নেই, তাও এরা অদম্য।
খাড়া ও প্যাঁচানো পথ ধরে ছুটে নামছি আমরা ওক্-এর সারি ও রডোডেনড্রন-এর ঝোপ পিছনে ফেলে। একটা সংক্ষিপ্ত পথ নিতে গিয়ে পর্বতারোহী গনেশ সাইলি পড়ে গেল হোঁচট খেয়ে, তবে পুরু শ্যাওলা ও বাটারকাপ ফুলের ঝোপ তাকে রক্ষা করেছে। বে-খেয়ালে আমার হাতঘড়ি আঘাত করলো এক পাথরে, চুরমার হলো কাচ। কোনো ব্যাপার না। সময়ের গুরুত্ব এখানে খুবই কম। সময়ের চাপমুক্ত! ব্যাটেন কি এমন অভিজ্ঞতার কথাই বর্ণনা করেছিলেনÑ‘চমকিত আনন্দে অবগাহন!’ যেমনটি এখন আমার সামনে উপস্থিত?
চায়ের দোকানের আকুল আহ্বান টের পাচ্ছি ভিতরে। এরকম পাহাড়ি পরিবেশে পথের ধারের চা-দোকান ছাড়া চলা সম্ভব? ছোট্ট সরাইগুলো খাদ্য ও আশ্রয় জোগাচ্ছে, একসঙ্গে এমনকি ডজন ডজন মানুষকেও।
আমরা এক গুজার রাখাল আর এক তীর্থযাত্রীর মাঝখানে বসলাম। তীর্থযাত্রীটি পণ করেছে যে সে মন্দির যাবেই। তার চায়ের সঙ্গে আমার দেয়া অ্যাসপিরিন-টা খেতে রাজি হলো সে। পাথরের মতো শক্ত বনরুটি মিষ্টি ও গরম চা দিয়ে ভিজিয়ে খেলাম আমরা। বনরুটি যেন পরিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে বানানো।
এখানে চায়ের দোকানের ঠিক সামনেই একটা ভক্তি-বস্তু রয়েছে। লিঙ্গাকৃতির একটা প্রস্তরখণ্ড। ওতে প্রচুর পরিমাণে সিঁদুরের প্রলেপ ও বুনো ফুলের পুষ্পার্ঘ্য ছড়ানো রয়েছে। পাথরে অভ্রের উপস্থিতি থাকায় তাতে সুন্দর একটা ঔজ্জ্বল্য এসেছে।
আমার ধারণা হিন্দু ধর্ম পরিবেশ ধর্মের খুব কাছে অবস্থান করে।
নদী, শিলা, গাছপালা, লতাপাতা, পশু-পাখি, সবই পুরাণে রয়েছে, আর ব্যবহৃত হচ্ছে প্রতিদিনের পূজা অর্চনায়। এরকম দূরবর্তী অঞ্চলে এ ধরনের সম্প্রিতি স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়, যেখানে ভগবান ও পর্বত সহাবস্থান করে। তুংনাথ এখনো বস্তুজগতের কলুষতা মুক্ত। কাজেই যারা এখানে মুক্ত মন ও হৃদয় নিয়ে আসেন তারা এই জায়গার চমৎকারিত্বটা পেয়ে যান। (চলবে)

ছবি: গুগল