তুমি না হয় রহিতে কাছে

লুৎফুল কবির রনি

সেই ষাটের দশকের কথা। তৎকালীন কলকাতার সবচাইতে বিখ্যাত আলোচিত পূজা মণ্ডপ ছিলো  সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ফায়ার ব্রিগেডের পূজা। এটা দমকলের পূজা নামেও বিখ্যাত ছিলো। সুচিত্রা সেনের মুখশ্রীর সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিমা গড়ার কারণেই এত জনপ্রিয় হয়েছিলো মধ্য কলকাতার দমকলের সেই পূজামণ্ডপ।

১৯৪০ সালে ‘রূপমঞ্চ’ কলকাতার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন কালীশ মুখোপাধ্যায়। ‘রূপমঞ্চ’ অফিসে কালীশবাবুর ছবি তোলার স্টুডিও ছিলো। জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের পাশাপাশি নবাগতদেরও তিনি আমন্ত্রণ জানাতেন তাঁর স্টুডিও-তে ছবি তোলার জন্য। ততদিনে মুক্তি পেয়েছে সুচিত্রা সেনের প্রথম ছবি – সাত নম্বর কয়েদী। কালীশবাবু ছবি তোলার জন্য সুচিত্রাকেও আমন্ত্রণ জানালেন। কালীশবাবুর প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করলেন সুচিত্রা সেন। তিনি বললেন, ‘মাফ করবেন কালীশবাবু, আমার পক্ষে সম্ভব নয় আপনার নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে ছবি তোলা।’এহেন আচরণে হতবাক কালীশবাবু। এক নবাগতা তাকে ‘না’ বলবেন তা আশা করেননি কালীশবাবু। আর একবার যাচাই করবার জন্য কালীশবাবু সবিনয়ে বলেন, ‘আমার ওখানে গিয়ে ছবি তুলতে তোমার আপত্তির কারণ কী? ওখানে আমার স্ত্রী আছেন, সম্পাদকীয় বিভাগের অন্য কর্মীরাও আছেন। তাছাড়া ইচ্ছে করলে তুমি তোমার স্বামীকেও সঙ্গে নিয়ে আসতে পারো।’শ্রীমতী সেন বললেন, ‘এসব নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই না। আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, সেটাই জানিয়ে দিলাম।’

এই কথা শুনে কালীশবাবু রেগে আগুন। রূপমঞ্চে পরবর্তী সংখ্যায় সুচিত্রা সেন বিষয়ে বিষোদগার করলেন তিনি। তিনি লিখেছিলেন, ‘নটী নটীর মতোই থাকবে। তাকে আমরা এর চেয়ে বেশি মর্যাদা দিতে চাই না।’এই মন্তব্যে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি সুচিত্রা। তিনি বুঝেছিলেন কথায় কথা বাড়ে তার চেয়ে নীরবতাই  শ্রেয়।এরপর প্রায় দশ বছর পরে- কালীশ মুখোপাধ্যায় সুচিত্রার ওই গুণের প্রশংসা না করে পারেননি।তিনি বলেছিলে, ‘সুচিত্রা আমার সঙ্গে সেদিন যে ব্যবহারই করে থাকুক, ওর স্পিরিট দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম, ভেতরে একটু যদি কিছু থাকে তাহলে মেয়েটা অনেক দূর এগোবে। ওকে কেউ আটকাতে পারবে না।’পরবর্তীকালে সুচিত্রা সেন হলেন ‘রূপমঞ্চ’র কভার গার্ল।

উত্তম কুমার একবার নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন তাকে, ‘আমাদের বিয়ে হলে কেমন হতো?’ তার উত্তরে সুচিত্রা বলেছিলেন, ‘একদিনও সেই বিয়ে টিকতো না। তোমার আর আমার ব্যক্তিত্ব অত্যন্ত স্বতন্ত্র। আর খুব স্ট্রং। সেখানে সংঘাত হতোই। তার ওপর, তুমি চাইবে তোমার সাফল্য, আমি চাইবো আমার। এ রকম দু’জন বিয়ে করলে সে বিয়ে খুব বাজে ভাবে ভেঙে যেতো।’ বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রির কাঁচা মেঠোপথটিকে যে রূপ দিতে চেয়েছিলেন একদা কাননদেবী, তাই বাঁধানো রাজপথ হয়ে ওঠে সুচিত্রা সেনের পেশাদারিত্ব ও চারিত্রিক দৃঢ়তায়।ছবির ইতিহাস থেকে সামাজিক পাঁচালি, প্রেম থেকে স্বপ্ন, বাসনা থেকে বাসনাপূরণে তাই সুচিত্রা সেন হয়ে ওঠেন প্রায় অলৌকিক এক আচ্ছন্নতা। নশ্বর সময় ফুরিয়ে যায়। তবু তার চোখের দিকে তাকিয়ে আজো বাঙালি বলতে ভালোবাসে- তুমি না হয় রহিতে কাছে, আরো কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে।বাঁকা ঠোঁটের হাসিতে যে কত তরুণের হৃদস্পন্দন বাড়িয়েছেন সুচিত্রা, তা এতো দিন পরও বাঙ্গালির মুখে মুখে ফেরে। সুচিত্রা ঘাড় ঘুরে তাকালে, সময়ও কি একটু করে থমকে যেতো না? যেতো। পর্দায় সুচিত্রার চোখ টলমল করে উঠলে জল গড়াতো পর্দার এপারে। পঞ্চাশের দশকের মানবী হয়েও মনে-প্রাণে-বিশ্বাসে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কালোত্তীর্ণ। যা সম্ভব হয়েছিলো একান্তই তার নিজের যোগ্যতা, দক্ষতা, সাধনা, চেষ্টা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমে। তাই তো সুচিত্রা সেন আজ আর কোনো নাম নয়। ব্র্যান্ড। আইকন। যে আইকনকে আবিষ্কারের পর্ব চলছে আজও। সুচিত্রা সেনের গগনচুম্বী জনপ্রিয়তার রহস্য তার উত্তরপুরুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে এখনও।

সুচিত্রা সেন অভিনীত শেষ ছবি ‘প্রণয় পাশা’ মুক্তি পায় ১৯৭৮ সালে। ওই বছরই তিনি সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর চলচ্চিত্র অঙ্গন থেকে চিরতরে অবসরগ্রহণ করেন। এরপর তিনি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। কেউ কেউ বলেন, উত্তমকুমারের মৃত্যুর পরই প্রিয় মানুষটিকে হারানোর অভিমানে চলচ্চিত্রে অভিনয় থেকে সরে আসেন তিনি। উত্তম কুমার ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই মারা গেলে সেই রাতে দেখতে এসেছিলেন মালা হাতে নিয়ে। মহানায়কের দেহের ওপর মালা রেখে বলেছিলেন, ‘আমি হেরে গেলাম উত্তম।’২০১৭ সালের ১৭ জানুয়ারী কলকাতায় তাঁর জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হয়।

ছবি:গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box