তুমি মানুষের হাত ধরো, সে কিছু বলতে চায়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শতবর্ষে অতিক্রান্ত হলো কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের। আগুনের বয়স তো এই পৃথিবীতে সত্যিই অনেক। বাংলা কবিতায় আগুনের ফুলকিই তো বলা যায় এই কবিকে। কবি নাজিম হিকমত বলেছিলেন, ‘আধুনিক বিশ্বের কবিতা দুই ধরনের। এক, প্রতিবাদী কবিতা। দুই, যে কবিতা নিজেই প্রতিবাদ।’ বাংলা ভাষায় যে ক’জন আধুনিক কবির কবিতা নিজেই প্রতিবাদ হয়ে উঠেছে, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

কবির জন্ম ১৯২০ সালে বাংলাদেশের বিক্রমপুরে। লেখাপড়া করেছেন কলকাতায়। প্রায় চার দশক একটানা লিখেছেন তিনি। প্রথম জীবনে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অনুশীলন দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী কালে কবিতাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবন।
দেশ ভাগ, খাদ্য আন্দোলন, ভিয়েতনামের যুদ্ধ, জেল, জরুরি অবস্থা, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, নকশালবাড়ি— এত আগুনের ভিতর দিয়ে বয়ে গেছেন কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।কবিতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন নতুন এক সমাজ তৈরির স্বপ্ন। রূঢ়, অন্ধ, আর ক্ষতবিক্ষত এক সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধ ধ্বংসের একটি ছবি আঁকতে চেয়েছেন নিজের কবিতায়।

অভাবের সঙ্গে তাঁকে লড়তে হয়েছে প্রতিদিন। বার বার হয়েছেন চাকরিহীন। কিন্তু তারপরেও সরকারী বৃত্তির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। যারা তাকে দেখেছেন খুব সাধারণ এক ছবি একেছেন- চশমা, কলম, ছাতা. সাধারণ চটি, ধুতি আধময়লা পাঞ্জাবি পরিহিত কবি চলেছেন। সঙ্গী সিগারেট অথবা বিড়ি। খেতে পছন্দ করতেন মুড়ি আর জিলাপি। এমনটাই ছিলো কবির বাইরের পরিচয়। নিজের কবিতার বই গ্রামবাংলার কবিতা পাঠের আসরে নিজেই কখনো ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। তিনি কবিতায় লিখেছেন ‘তুমি মাটির দিকে তাকাও, সে প্রতীক্ষা করছে,/তুমি মানুষের হাত ধরো, সে কিছু বলতে চায়।’ মানুষের কন্ঠস্বর তাঁর কবিতায় বার বার ফিরে এসেছে। বুদ্ধদেব বসু বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় উচ্চকিত স্বরের কথা বলেছেন। কিন্তু এই স্বরটাই হয়তো তাঁকে বাংলা কবিতায় আলাদা বৈশিষ্ট দিয়েছে। তাঁর কবিতায় ক্ষুধা, চিৎকার, আতঙ্ক, কান্না আর প্রলয়ের সহাবস্থান দেখতে পাই। দেখতে পাই আগুনের ভেতর দিয়ে প্রস্ফুটিত হচ্ছে এক ফুল।সেই ফুল শত পরাজয়েও ম্লান হয়নি। রিলকে বলেছিলেন, ‘একমাত্র তা-ই থেকে যাবে যা রক্ত দিয়ে লেখা।’ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কবিতায় লিখেছেন : ‘শীতের মতই রক্ত মিশে আছে কবিতায়/মৃত্যুর মতই রক্ত মিশে আছে কবিতায়।’

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কনিষ্ঠ কন্যা মিত্রা ঘোষ চট্টোপাধ্যায় তার বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে দশ মাস যুদ্ধ করে আমাদের ১৪ স্টেশন রোড ঢাকুরিয়ার বাড়িতে, ১৯৮৫ সালের ১১ জুলাই সকালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাবা, যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র পঁয়ষট্টি, মা রানি ভবানীর বয়স সাতান্ন। কবি ও মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওথোরাসিক সার্জন ভূমেন্দ্র গুহরায় তাঁর অপারেশন, কেমোথেরাপি এবং পরবর্তী চিকিৎসা করেন। এর পরে ভর্তি হন ঠাকুরপুকুরে ডাক্তার সরোজ গুপ্তের ক্যান্সার হাসপাতালে, রেডিয়েশন কোর্স ও সেরে ওঠার জন্য। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে এলেও জীবনের দীপ একটু একটু করে নিভে আসছিল তাঁর। হোমিওপ্যাথ ডাক্তার ভোলানাথ চক্রবর্তী এসে যেদিন দেখলেন, ১০ জুলাই, সে দিনই জানিয়ে গেলেন অন্তিম সময় উপস্থিত। লিখছিলেন কবিতা। অসাধারণ এক মানুষ ছিলেন তিনি, শুধু তাঁর কবিতার জন্য নয়— ভালোবাসা ও মানবিকতার জন্য, পিতৃত্বের অমৃত দানের জন্য। আমার সম্পূর্ণ জীবনে এমন দৃঢ় অথচ উদার, এমন মমতাময় অথচ অনমনীয় নির্ভীক মানুষ আমি আর একজনকেও পাইনি।’

১৯৮৫ সালের ১১ই জুলাই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। তারপর বাংলা কবিতার পাঠক হয়তো একটু একটু করে ভুলে গেছেন এই কবিকে। কিন্তু বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে কি ভোলা সম্ভব? কবি নিজেই বলে গিয়েছেন : ‘সমগ্রে নয়, এসো, আমাকে বিচ্ছিন্নে পাঠ করো।’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ প্রহর, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম (কলকাতা)
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box