তুমি রবে নিরবে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাসুদুল হাসান রনি

(মন্ট্রিয়েল থেকে): ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর।  তখন মাত্র টুপ করে সন্ধ্যা নেমেছে। ক্লান্ত শরীর, পা টেনে টেনে বাসায় ফিরছি। সারাটা দিন কেটেছে মন্ট্রিয়েল এয়ারপোর্টে সিভিল এভিয়েশনের একটি ওয়ার্কশপে। অনলাইন এক্সামে পাশ করার পর তিনদিনের শর্টকোর্স শেষে দুইদিনের ওয়ার্কশপের প্রথম দিন ভালভাবে কেটেছে।
দুপুর থেকে প্রচন্ড তুষারপাতে চারিদিক সাদা হয়ে আছে। ধু ধু সাদা তুষারের মাঝে পাইন,ওক, মেপল গাছগুলো পাতা শুন্য, ন্যাড়া মাথায় অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে,বেঁচে আছি!
মানুষ যেখানে মাইনাস ফিফটিন টু টুয়েন্টিতে ভয়ে ঘর থেকে বের হয় না, সেখানে ৬ মাস পাতাশুন্য হয়ে কিভাবে মাইনাস ফোর্টি বা ফোর্টিফাইভে গাছগুলো বেঁচে থাকে! এদের কি অদ্ভুত প্রানশক্তি!

আমার বাবা

বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ নিয়ে বসতেই দরোজায় কড়া নাড়ার শব্দ। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে। উঠতে ইচ্ছে করে না। বেশ ক’বার কড়া নাড়ার পর অনিচ্ছা সত্বে দরোজা খুলতে দেখি দাঁড়িয়ে আছে বন্ধু ছড়াকার মিহির কান্তি রাউৎ , মিঠু। একটু পরে এলো দেশ টিভির সাবেক সাংবাদিক কাজী মাজহারুল ইসলাম বিপুল। অনেকদিন কারো সঙ্গে দেখা হচ্ছিলো না। তাই হঠাৎ তিনজনকে পেয়ে ভীষন ভাল লাগায় মন ভরে গেলো।
আমার রুমে চারজনে মিলে রাজ্যের গল্প, কতকতায় মেতে ওঠেছি।এ সময় পাশের রুম থেকে সংগীতশিল্পী জুবায়ের টিপু দরোজার সামনে এসে দাঁড়াতে আড্ডায় ছন্দপতন ঘটে। কোন ভনিতা ছাড়াই বলল, কাকা, আপনার মন কেমন?
প্রশ্নের ধরন দেখে তখনো বুঝতে পারিনি টিপু কি ভয়াবহ দুঃসংবাদ নিয়ে এসেছে।
বোকার মতন হেসে বলি, পরিশ্রান্ত কিন্তু মন ভালো।
টিপু রুমের অন্যদের একনজর দেখে নিয়ে একটু ভারী গলায় জানালো, কাকা, সম্ভবত আপনার বাবা আর নেই।
কথাটার মানে কি হতে পারে, আমি কি হারিয়েছি কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। ফ্যাল ফ্যাল নয়নে একবার টিপুর দিকে তাকিয়ে চুপ মেরে থাকি। আড্ডায় পিনপতন নিরবতা নেমে আসে। আমাকে সাত্বনা দেবার ভাষা কারো জানা নেই। সবাই চুপচাপ। অসহ্য ঘুমোট পরিবেশ। অনেক পরে নিরবতা ভঙ্গ করে মিহির।
-রনি, বাসায় ফোন দাও।
মনে হচ্ছিল কতক্ষন, কত যুগ নিরবতায় কেটে গেলো!
বাসায় কাকে ফোন দিবো, কার কি অবস্থা কিছুই বুঝতে পারছি না। শুধু মনে হলো মা’কে ফোন দেয়া যাবে না।
এ রকম সময়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতা আমি অর্জন করিনি। বড়ভাইকে ফোন দিতে ও প্রান্ত থেকে ধরে আসা কন্ঠে জানালো আব্বা আর নেই। ভোর পাঁচটায় চলে গেছেন।
মুহুর্তেই আমার বয়স যেন অনেক বেড়ে যায়! সাড়ে এগারো হাজার মাইল দূর হতে আমি বাড়ির অভিভাবক হয়ে যাই। বড়ভাইকে কোন আবেগ দেখানোর সুযোগ না দিয়ে বলি, আত্মীয় স্বজন, আব্বার বন্ধু সবাইকে খবর দাও। আম্মার পাশে বড়খালাম্মা,ছোট খালাম্মাকে সব সময় থাকতে বলো।
জানি না আমার মতন আবেগী মানুষ হঠাৎ কিভাবে নিজেকে সংযত করলাম!
প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদ মানুষকে শুধু ভারাক্রান্ত করে না। অনেক দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। রাতারাতি দায়িত্বশীল মানুষে পরিনত করে। আমি দেশে একটার পর একটা ফোন করে আত্মীয় স্বজন,আমার বন্ধু বান্ধবদের জানাই, আমার বাবা আর নেই। কাউকে সাত্বনা দেয়ার সুযোগ না দিয়ে বলি, বাসায় যান। মাকে একটু সময় দেন। শোক সামলে ওঠা কঠিন। আপনারা কাছে থাকলে আমি দূর হতে সাহস পাবো।
বাল্যবন্ধু শোভনকে ফোন দিয়ে বলি, তুই সবাইকে ফোন দিয়ে জানিয়ে দিস। বাদ জোহর জানাজায় সবাই যেন যেতে পারে। শোভন আমার কথা মতন সবাইকে ফোন করে দ্রুত খবরটি জানিয়ে দেয়।
এদিকে পরবাসে বিষন্ন সন্ধ্যায় পরিবার স্বজনবিহীন আমি তিনবন্ধুর সঙ্গে। আমার ভেতরে ভাংচুর, ক্ষরন।
আমি কি কথা বলব বা ওরা কি বলবে কেউ বুঝতে পারছিলাম না। প্রবাসে আসার মিহিরের বাবাও দেহত্যাগ করেন। আমার কস্টটা সে বুঝতে পেরে কিছু কথা বলার চেস্টা করে। সবার বাবা থাকে না, একদিন সবাইকে যেতে হয়। মন শক্ত করা ছাড়া কিবা করার আছে।
আমি মিহিরের কথাগুলো শুনি। মিঠু এটা সেটা জিগেস করে, বিপুলুভাইও। সেই সবে আমার কোন প্রতিক্রিয়া, ভাবান্তর হয় না। নির্বিকার হয়ে ট্যাবে কি যেন লিখি। my father is no more. অথবা আমার বাবা আর নেই। কি যে লিখেছিলাম আজ কিছুই মনে পড়ছে না।
আমার বন্ধুরা অনেক রাত পর্যন্ত আমাকে সঙ্গ দেয়। বিপুলভাই থেকে যেতে চাইলে আমি না করি। পরক্ষনেই বিপুলভাই বললেন, কিছুটা সময় একা থাকেন। কাঁদতে পারলে বুক হাল্কা হবে।
রাত প্রায় একটা। সবাই চলে যায়। আলো বন্ধ করে আমি অপেক্ষায় থাকি কখন বাংলাদেশে দুপুর ২টা বাজবে। জোহরের নামাজের পর বাবার জানাজা শেষে নিয়ে যাওয়া হবে মাসদাইর কবরস্থানে। সেখানে আমার ছোটবোনও শায়িত। কিছুক্ষন পর পর দেশে ফোন করে খবর নিচ্ছি সব ঠিকঠাক মতন হচ্ছে কি না। সবাই খবর পেয়েছে কি না। মা কি করেন, তার কি অবস্থা ইত্যাদী। এর মাঝে অন্ধকার ঘরে চুপচাপ বসে বাবার কত কথা মনে পড়ে যায়। কানাডায় আসার মুহুর্তে রাত ২টায় বাবা ঘুম থেকে উঠেন। কদমবুচি করতে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বিড়বিড় করে কি যেন বললেন। কে জানতো এটাই হবে বাবার সঙ্গে আমার শেষ আলিঙ্গন?
দুপুর তিনটায় বাবা চিরশয্যায় সমাহিত হবার পর আমি আর নিজেকে সামলে রাখতে পারিনি। বালিশে মুখ চেপে ফুপিয়ে কান্নায় আমার সঙ্গে সেইন্ট মার্টিন এভিনিউর তিনতলার বাসা যেন বারবার কেঁপে ওঠেছে।
প্রতিদিন মায়ের সঙ্গে রাতে কথা না বললে ঘুম হয় না, কি আশ্চর্য সেই আমি আজ একবারের জন্য মাকে ফোন দেইনি! আসলে তখন মায়ের সঙ্গে কথা বলার সাহস আমার ছিলো না।
অনাবাসী জীবনে সবচেয়ে বড় ট্র‍্যাজেডি কি জানেন, বাবার মৃত্যুর ১২ ঘন্টা না যেতেই শোকাগ্রস্থ সেই আমাকে সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে ছুটতে হলো এয়ারপোর্টে! অন্য দশটা দিনের মতন যেন সব কিছু স্বাভাবিক। মেট্রো ও বাস চেপে এয়ারপোর্টে ওয়ার্কশপে যোগ দেই। টিএসএলে কলিগরা কেউ তখনো জানে না মাত্র ১২/১৩ ঘন্টা আগে আমার জীবনে কি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে। বুকে পাথর চেপে সারাটাদিন লেকচার শুনে কেটে গেলো। লাঞ্চ আওয়ারে বড়ভাইকে ও বাল্যবন্ধু নাজমুলকে ফোন দিয়ে বাসার পরিস্থিতি জেনে নিয়েছিলাম। মা একটু শান্ত , চুপচাপ থাকার কথা শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হই।
প্রিয়জন হোক আর দুরের বা অপরিচিত যে কারো মৃত্যুই আমাদের ব্যথিত, শোকাগ্রস্থ করে। সেই শোক ভুলতেও সময় লাগে না। একদিন বা দুইদিন পরে ফিরে যাই যথারীতি জগত সংসারের স্বাভাবিক নিয়মে।

মানুষের জীবনটা বোধ হয় এরকমই। বাবা, যেখানে আছো ভাল থেকো।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]