তোমাকে ডাকতে হলে ব্যাঘ্র পাঠাতে হয়

ইরাজ আহমেদ

‘‘তোমাকে ডাকতে হলে ব্যাঘ্র পাঠাতে হয়’’। লাইনটা লিখেছিলেন প্রয়াত কবি ত্রিদিব দস্তিদার। প্রেমের কবিতার একটি লাইন। কিন্তু তাতে ব্যাঘ্র পাঠানোর বিষয়টা কী? লাইনটা মনে পড়লেই মনের মধ্যে ফিরে যাই সেই কয়েন বক্স টেলিফোনের যুগে। কয়েন বক্স ফোনের গহ্বরে বাঘের মুন্ডুর ছাপ দেয়া দু’টি সিকি ফেলে ফোন করতে হতো। ত্রিদিব দস্তিদারের কবিতায় সেই ছবিটিই রেয়ে গেছে পুরনো কালের গন্ধ মেখে।

এক সময়ে এই শহরের রেলস্টেশন, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, পোস্ট অফিসসহ নানা জায়গায় দেয়ালে ঝুলে থাকতো কয়েন বক্স টেলিফোন। কত গুরুত্বপূর্ণ খবরের আদানপ্রদান আর হাজার হাজার প্রেমের সূচনা আর বিচ্ছেদের গল্প নিয়ে কয়েন বক্স ফোন জমা পড়লো ইতিহাসের খাজাঞ্চীখানায়।

এই ফোন সেটের সামনে তখন প্রায়শই লম্বা লাইনচোখে পড়তো। শহরে হঠাৎ করেই বাঘমার্কা চার আনা অর্থাৎ সিকি পয়সার কদর বেড়ে গিয়েছিলো। এক টাকার নোট বদলে সিকি পয়সা মানিব্যাগে রাখার চল শুরু হয়েছিলো তখন।এই জনফোনটি সাধারণ মানুষের জন্য বিশাল সুবিধার ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। কারণ তখন তো আর মোবাইল ফোনের দাপুটে সাম্রাজ্য তৈরী হয়নি। রাতবিরাতে হাসপাতাল থেকে কাউকে কোনো খবর জানাতে কয়েনবক্স ছিলো ভরসা। কিন্তু এই বাক্সসদৃশ্য ফোনটা প্রায়ই বিকল হয়ে থাকতো। আর তাতেই হতো বিপত্তি। আমাদের মনে তখন এই কয়েনবক্স ফোনের অবস্থানের একটি অদৃশ্য তালিকা তৈরী থাকতো।

তখন কয়েনবক্স ফোনের পয়সা খেয়ে ফেলার রোগ ছিলো।হয়তো আপনি কষ্টে জোগাড় করা কয়েন ফেললেন ফোনের ছোট্ট ফাঁক দিয়ে। কয়েনটি হারিয়ে গেলো। যেন চিরকালের জন্য গেলো। ফোনের সংযোগ স্থাপিত হলো না।নিয়ম অনুযায়ী সংযোগ স্থাপন না করা গেলে কয়েনটি ফেরত চলে আসে ফোনবস্কের আরেকটি মুখে। কিন্তু মাঝে মাঝেই সেই অদৃশ্য কয়েন আর দৃশ্যমান হতো না। তারপর যতোই জরুরী কলটি করার জন্য কয়েন ফেলা হচ্ছে সে চিরকালের মতো হারিয়ে যাচ্ছে। তখন বহু মানুষকে ফোনবক্সের গায়ে দুমদাম শব্দে চড় আর কিল মারতে দেখা যেতো হারানো পয়সা ফিরিয়ে আনতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তাতে কাজ হতো।জুয়া খেলায় স্লট মেশিনের মতো এই ফোনও উগড়ে দিতো আটকে থাকা অনেক কয়েন একসঙ্গে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ফোনে এরকম কিলচড় মেরে একসঙ্গে অনেক পয়সা বের হয়ে আসার ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি। সেই পয়সাগুলো হয়তো আমার পূর্ববর্তী মানুষদের।বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তাই মাঝে মাঝে কয়েনবক্স ফোনটিকে খামোখাই চড় চাপড়ের শিকার হতে হতো, যদি মিলে যায় অভাবিত অর্থ। চড় চাপড়ে পাওয়া সিকি দিয়ে আমাদের সিগারেট কেনা হয়ে যেতো।

ছাত্রাবাস অথবা পোস্ট অফিসে দুপুরবেলা এই জনফোন হয়ে উঠতো ভালোবাসার বার্তাবাহক। অনেক তরুণ তরুণীকে দেখা যেতো খুঁজেপেতে নির্জন কয়েন বক্স বের করে একান্ত আলাপে মগ্ন হতে। এসব নিয়ে মাঝে মাঝে বাদানুবাদ আর ঝগড়ার ঘটনাও চোখে পড়তো। লাইনে দাঁড়ানো মানুষ হৈচৈ শুরু করে দিতো।

কয়েন বক্স ফোন ছিলো মহা অনিশ্চিত এক বস্তু। কখন বিকল হয়ে বসবে তা জানার কোনো উপায় থাকতো না। কিন্তু তবুও আমাদের এক ধরণের ভরসার জায়গা ছিলো কয়েন বক্স ফোন। এই অনিশ্চয়তারও এক ধরণের সৌন্দর্য ছিলো। কত ঘটনা আর বিবাদের সাক্ষী এই ফোন। কত ভালোবাসার আলো জ্বালিয়ে রাখতো যন্ত্রটি। নিভিয়েও দিতো সেই আলো। সামান্য দুই মিনিট কারো কন্ঠস্বর শুনতে না পেয়ে গোটা রাত কেটে যেতো অস্থিরতায়। ত্রিদিব দস্তিদাদের সেই ব্যাঘ্র পাঠিয়ে এখন আর কাউকে ডাকতে হয় না এই শহরে। হাতের মুঠোয় আছে ফোন,করায়ত্ত যোগাযোগের সকল আকাশ। তবু মনে পড়লো সেআ অনিশ্চিত সময়ের মধুর যোগাযোগ মাধ্যম কয়েনবক্সে ফোনের কথা।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল