থাকে বাকি পঁচিশ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

সালাহ্ উদ্দিন শৈবাল

দিনটা মন্দ ছিলো না। একটু ঠান্ডা ভাব ছিলো। কিন্তু অল্প- স্বল্প রোদ ছিলো। আলো ছিলো। মাঝে মাঝে মেঘ ছিলো। একটা মোটামুটি হুডি পড়ে চালিয়ে দেয়া যাচ্ছিলো। আমি আর তরঙ্গ বেরিয়ে পড়লাম। আজকে রোববার। কালকে থেকে আবার স্কুল আর অফিস। ছন্দ বেরুতে চাইলো না। তার কাজ আছে।

আমাদের ঠিক ছিলো না কোথায় যাওয়া যায়। অশোয়া শহরে নতুন এসেছি। যেখানে যাই সেটাই নতুন লাগে। শহরের প্রধান লাইব্রেরীতে গিয়ে দুজনের কার্ড করালাম। এই দেশে বই পড়া ফ্রী। এক পয়সাও লাগে না। সময় মতো শুধু ফেরত দিতে হয়। নয়তো ফাইন হয়ে যেতে পারে। বইয়ের সংগে লাইব্রেরীতে রয়েছে ই-বুক…সিডি..নানান ইভেন্ট….সব ফ্রী।

রিশেপসনিষ্ট হাসিখুশি তরুনী। শহরে নতুন জেনে আগ বাড়িয়ে অনেক তথ্য দিয়ে দিলো। শহরের প্রধান চারটা মিউজিয়ামের ফ্রী পাশ দিলো এক সপ্তাহের জন্য।

কাছাকাছিই Canadian Automotive Museum। এটা দিয়েই আজকে শুরু করা যাক। শ‘খানেক দর্শনীয় গাড়ী রয়েছে। সবচেয়ে পুরনো গাড়ীটি দেখলাম ১৯০৩ সালের তৈরী। নাম Redpath Messenger । গাড়ীর মিউজিয়ামে না থাকলে এটাকে দিব্যি ঘোড়ার গাড়ী বলেই চালিয়ে দেয়া যেত।

একটা উভচর গাড়ী দেখলাম। জলে স্থলে চলতো। তরঙ্গ খুশী হলো Lightning McQueen দেখে। ছবি তুললো। যারা Cars ছবি দেখেছেন তারা মজা পাবেন।

মিউজিয়াম শেষে…আমরা অশোয়া ডাউন টাউন দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। হেঁটে হেঁটে না দেখলে কোন শহরই দেখা হয় না। ছুটির দিনে শান্ত..সমাহিত শহর।

হাঁটতে হাঁটতে অশোয়া মেমোরিয়াল পার্ক। কানাডার সকল যুদ্ধে যে সকল অশোয়ার মানুষ প্রান দিয়েছেন। তাদের জন্য এই মেমোরিয়াল পার্ক। স্ট্যাচু রয়েছে। বেশ কিছু শিল্প কর্ম রয়েছে। একটা মঞ্চ রয়েছে। হঠাৎ কয়েকটা লাইনে চোখ আটকে গেল। দেশের জন্য জীবনদানকারী যোদ্ধাদের তালিকার পেছনের একটা দেয়ালে লেখা রয়েছে লাইনগুলো:

“When you go home, tell them of us and say, for your tomorrow, we gave our today.”

“যখন তুমি বাড়ী ফিরবে, তাদেরকে আমাদের কথা বলো…..বলো, তোমাদের আগামীর জন্য আমরা আমাদের বর্তমান উৎসর্গ করেছিলাম।“

John Maxwell Edmonds এর লেখা এই এপিটাফ খুব বিখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ যৌথ বাহিনীর নিহত যোদ্ধাদের স্মরনে ভারতের নাগাল্যান্ডের কহিমা শহরের ওয়ার সিমেট্রীর গায়ে এটা প্রথম লেখা হয়েছে। আজকে আবার দেখলাম এই অশোয়া মেমোরিয়াল পার্কে।

কিন্তু এই লাইনগুলো দেখলে একজন বাংগালীর কোন বাংলা লাইনগুলোর কথা প্রথম মনে পড়ে? অন্তত: মনে হওয়ার কথা? বাংলাদেশের জন্যও অজস্র মানুষ তাদের বর্তমান উৎসর্গ করেছিলেন। একেক জনের হয়তো একেকটা মনে হতে পারে। আমার বারবার মনে হয়েছে…আমাদেরও এই রকম কিছু মাথা উঁচু করা ভালোবাসার লাইন রয়েছে। আমাদের অসম্ভব মেধাবী লেখকেরা লিখেছেন। তাদের একজন নজরুল ইসলাম বাবু।

“সব কটা জানালা খুলে দাও না,
ওরা আসবে চুপি চুপি,
যারা এই দেশটাকে ভালোবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ. . .”

সেই ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ নিয়ে ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৯-এ এক গবেষনা প্রতিবেদনের ফলাফল শেয়ার করেছে টিআইবি। তারা বলছে “বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ ঘুষ দেন কোন প্রতিবাদ ছাড়া।”

আমাদের জন্য কি এগুলো নতুন খবর? মোটেও না। আমি কিন্তু অবাক হয়েছি এখনো ২৫% মানুষ ঘুষ দিতে চায় না এটা জেনে। ঘুষ না দিলে আপনার জীবনটা কিভাবে চলে? আপনি কিভাবে পাসপোর্ট পান? আপনার ছেলে মেয়েরা কি স্কুলে যায়? আপনার সংগে কোন অন্যায় হলে কি আপনি বিচার পান? আপনি কি চিকিৎসা পান?

সৌভাগ্যক্রমে এই ২৫% শতাংশের কয়েকজনের সংগে আমার ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় আছে। এরা আসলেই ভিন্ন মানুষ। এরা আমাদের মতো ‘দেখানো মানুষ’ হন না। বই পড়ার আগেই বইয়ের ছবি পোষ্ট করার কথা তাদের মনে থাকে না। দু‘লাইন লিখেই নিজেকে একটিভিষ্ট বা লেখক তারা নিজেদের মনে করেন না। সারাদিন ফেইসবুকে গণ লাইক-কমেন্ট দিয়ে নিজেকে চেনানো তাদের হয় না। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তাদের সংগে অনেকের দেখাও হয় না। আমি তাদের সংগে জোর করে কথা বলি। এদের কেউ কেউ সরকারী চাকরীতে অচল বলে ‘পানিশমেন্ট’ ট্রান্সফার পেয়ে খাগড়াছড়ি চলে যান। কেউ কেউ নিরবে ব্যবসা করেন। কষ্ট করে করেন। জীবনে অনেক সুযোগ হারাতে হয়। তাদের ছেলে মেয়েদের জেল্লাদার কাপড়-চোপর থাকে না। নিজেদের গাড়ী থাকে না। বড় বাড়ী হয় না। দূর্নীতির নোংরা হলুদ আলোতে ডুবে থাকা সমাজে তাদের অনেককেই ব্যর্থ মানুষই মনে হয়।

কিন্তু তবু এরা ‘ঘুষ’ দেন না। ‘ঘুষ দেয়া’ তাদের কাছে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা না। তাদের প্রধান সমস্যা অন্য জায়গায়। ঘুষ দেয়ারও অনেক আগে মনে মনে একজন ‘পরাজিত নীতিহীন’ মানুষে পরিনত হতে হয়। সেটাই তাদের কাছে প্রধান সমস্যা।

পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত কোন যুদ্ধ হয়নি যে যুদ্ধে মানুষ মরে নি। যুদ্ধে গেলে মৃত্যু স্বীকার করেই যেতে হয়। এর বিকল্প নেই। তাই আমরা দেশের জন্য যুদ্ধ করা বীরদের স্মরণ করি আমাদের সেরা পংক্তি দিয়ে। শ্রদ্ধা জানাই অন্তরের অন্তস্থল থেকে।

পৃথিবীতে এখনো যারা অর্থনৈতিক, অ-অর্থনৈতিক….টাকা-কড়ির ঘুষ বা তেল-চামচামির ঘুষ বা অনৈতিক পক্ষপাত না দিয়ে বেঁচে আছেন…বেঁচে থাকতে চাইছেন তাদের আমি অ-নে-ক বড় বীর যোদ্ধা মনে করি। মনে করি তারাও তাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করছেন আমাদের সন্তানদের ন্যায্য একটা ভবিষ্যতের জন্যই।

কথা দিলাম আমি আমার সন্তানকে আপনাদের আজকের আত্ম উৎসর্গের কথা গর্ব ভরে বলে যাবো।

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]