দর্শক রিভিউ : ঈদের নাটক

মাসুদুল হাসান রনি

ঈদে অনেক নাটক প্রচারিত হয়।ত্রিশটা চ্যানেলে ভাল- মন্দ মিলিয়ে হাজারের ওপরে নাটক। মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন বিরতির কারনে মনযোগ দিয়ে কোন নাটক দেখা হয় না। তারপরেও যেসব নাটক দেখা হয় তার বেশীরভাগই আঞ্চলিক ভাষার আদিখেতা,হাসির নাটকের নামে ভাড়ামি, প্রেম ভালবাসার নামে কাতুকুতু। এর ভীড়ে এবার বেশ কিছু নাটক দেখে ভাল লেগেছে। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর “আয়েশা”, আশফাক নিপুনের “সোনালী ডানার চিল”, সুমন আনোয়ারের ” জুনিয়র আর্টিস্ট লতিফ”, শাফায়েত মনসুর রানা’র “আমার নাম মানুষ”, মাহমুদ দিদারের ” বৃষ্টিভেজা ঘর” এবং দীপু হাজরা’র ” ভাগের মা” এবারের ঈদে আমার ভাল লাগার নাটক।সেই ভাললাগা থেকে দু’একটা কথা লিখছি ৬টি নাটক নিয়ে।

পরিচালক রেদওয়ান রনির ” ঝরাপাতার দিন” দেখে কিছুটা সময় থ মেরে বসেছিলাম।এতো আবেগ আমাকে চেপে ধরেছে বের হতে পারছিলাম না।চোখের কোন ভিজে কখন যে দু’ফোটা জল গাল বেয়ে পড়েছে টের পাইনি।প্রবাসে বসে বারবার আমার ডায়বেটিস রোগী বাবার কথা মনে পড়ছিলো।বয়স হলে বাবারা বুঝি” ঝরাপাতার দিনে’র সবকিছু ভুলে যাওয়া, রাস্তা হারিয়ে ফেলা বাবার মতনই হন? আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে এ ঘটনাগুলো সব সময় ঘটছে। মামুলি ঘটনা,গল্প বলে কত অবলীলায় আমরা এড়িয়ে যাই।অথচ এগুলো টিভি পর্দায় কেউ তুলে আনছে না। কি সাধারন একটা গল্প নির্মানশৈলী, অভিনয়গুনে কতটা অসাধারন হয়ে ওঠতে পারে “ঝরাপাতার দিন” না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন ।এরকম গল্প বলায় রেদওয়ান রনি, আপনাকে স্যালুট। অভিনয়ে হাসান ইমাম,ঈশিতা অসাধারন।

‘সোনালী ডানার চিল’। পরিচালক আশফাক নিপুন।প্রথমে বলি আমি ব্যক্তিগতভাবে আশফাক নিপুনের নাটকের চরম ভক্ত।কিন্তু সেই আবেগ ধামাচাপা দিয়ে এবার নাটক দেখতে বসেছিলাম যদি কোন খুত খুজে পাই! গল্পের ভেতরে প্রবেশ করে খুত ধরার চেয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখেছি পরিচালকের সামাজিক দায়বদ্ধতা। আশফাক নিপুন সামাজিক দায়বদ্ধতার গল্প নিয়েই নির্মান করেছেন “সোনালী ডানার চিল” । প্রতিবছরের শুরুতে স্কুলগুলোতে ভর্তিযুদ্ধের পেছনের এক মানবিক গল্পের পাশাপাশি নাটকটিতে উঠে এসেছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গল্পও । যৌবনের স্বপ্নভংগের হতাশা, অভিভাবকের টেনশান ইত্যাদী নাটকটিকে অনেক বেশি হ্রদয়স্পর্শী করেছে । পরিচালকের নির্মানভাবনার সঙ্গে শিল্পীদের চমৎকার অভিনয় নাটকটিকে প্রানবন্ত করেছে।

‘আমার নাম মানুষ’। পরিচালক শাফায়েত মনসুর রানা। অনেকদিন যাবত শাফায়েত মনসুর রানা পরিচালিত কোন একটা নাটক নিয়ে লিখবো ভাবছিলাম।তার অনেক নাটকেরগল্প, কাহিনী বিন্যাস ও নির্মানশৈলীর জন্য আলাদাভাবে তাকে দেখতাম।তার ” আমার নাম মানুষ ” নাটকটি গল্পের গাথুনি,বিন্যাস, নির্মানের যত্নের ছোঁয়ায় মুগ্ধতাই আচ্ছন্ন করেছে। সমাজে অনেকেই শিশু অধিকার,সমাজ সচেতনতা নিয়ে কথা বলেন কিন্তু তারা নিজে এবং গৃহে এর চরম লংঘন করেন। মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে পারেন না, একবারও ভাবেন না বাহিরে অধিকার নিয়ে সেমিনার, সভা করলেও নিজে প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠেছেন কিনা! সাম্প্রতিক সময়ের ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী ও ছাত্র আন্দোলনকে উৎসর্গ করে নাটকটি নির্মিত। সমাজে যে অনিয়ম,, দুর্নীতি,অনাচার চলছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এ নাটক। জন কবির, অপর্না ‘র অভিনয় ভাল লেগেছে।

‘আয়েশা’। পরিচালক মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর ” আয়েশা” এবার ঈদে আমার দেখা অন্যতম ভাল কাজ।দীর্ঘ নয় বছর পর তিনি টিভির জন্য নাটক নির্মান করলেন “আয়েশা”।ফারুকীর ভাইয়ের নাটক নিয়ে নিয়ে তেমন কিছু বলতে চাই না।দর্শক তার নাটক,সিনেমা এমনিতেই লুফে নেয়। আনিসুল হকের গল্প “আয়েশা মংগল” থেকে এ নাটকের চিত্রনাট্য। গল্পের প্রধান চরিত্র আয়েশার স্বামী বিমান বাহিনীর কর্পোরাল জয়নাল আবেদীন।তার বাহিনীর প্রধানকে বাঁচিয়ে নিজেই উলটো ফেসে যান, সন্দেহের কবলে পড়েন।তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়।যাবার আগে এক রাতে খেতে বসে জয়নাল তার স্ত্রীকে বলছিলেন, পরিস্থিতি খারাপ।দলে জাসদ ঢুকে পড়েছে। আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।সকালের আগেই ফিরে আসবো। কিন্তু জয়নালের আর ফেরা হয়নি। এরপরের গল্প আয়েশার বেচে থাকার একাকী লড়াই।ফারুকীর নির্মান ভাবনা,পরিচালনা, গল্পের গাঁথুনি ভাবনার খোরাক জোগায়। নি: সন্দেহে এ কাজটি ঈদের অন্যতম সেরা কাজ বলে বিবেচিত হবে।

 ‘বৃষ্টি ভেজা ঘর’। পরিচালক মাহমুদ দিদার। এসময়ের অনেক নাট্যনির্মাতার ভীড়ে মাহমুদ দিদার অনেক আগেই একটা শক্ত অবস্থান করে নিয়েছেন।তার অসংখ্য ভালো কাজ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।তার কাছে দর্শকের আগ্রহ ও চাহিদাও অনেক। এবার ঈদে মাহমুদ দিদার বানিয়েছেন অপেক্ষাকৃত একটু হাল্কা মেজাজের গল্পের নাটক’ ‘বৃষ্টিভেজা ঘর”। নাগরিক জীবনে মানুষ শত কষ্টেও সুদিনের স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নগুলো ছোট না হয়ে বড় হয়।এরকম স্বপ্ন দেখা দুই টোনাটুনির গল্প হচ্ছে ‘ বৃষ্টিভভেজা ঘর’ । একটু বৃষ্টি এলেই যাদের দেয়াল চুঁয়ে চুঁয়ে পানি পড়ে,ঘর ভেসে যায়। কিন্তু তাদের দেখা স্বপ্ন বন্ধ হয় না। একটা সময় বাস্তবতার কাছে হেরে তাদেরও স্বপ্নভঙ্গ হয়। নাটকে মাহমুদ দিদার তাদের সততা আর প্রতারিত হওয়ার গল্প বলেছেন । হাল্কা গল্প হলেও নির্মানশৈলীর গুনে এবং শম্পা রেজা, মিম মানতাসা,আনিসুর রহমান মিলন, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের সুঅভিনয়ে ভাল্লাগার মত কাজ হয়েছে।

 ‘ভাগের মা’। পরিচালক দীপু হাজরা। এবার ঈদে হাজারো নাটকের ভীড়ে জিটিভিতে প্রচারিত দীপু হাজরা’র নাটক ‘ ভাগের মা’ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।বরাবরের মতন বৃন্দাবন দাশ – দীপু হাজরা জুটি পাবনার আঞ্চলিক ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে ‘ভাগের মা ‘নাটক সাজিয়েছেন। বৃন্দাবন দাশের রচনায় ‘ভাগের মা ‘ নাটকটি গ্রাম্য পটভুমিতে নির্মিত। দু’ভায়ের সম্পত্তি ভাগ বন্টনের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের স্থান মেলে না সংসারে।যে মা সারাজীবন কস্ট করে সন্তান বড় করেছেন সেই বৃদ্ধামায়ের দায়িত্ব নিতে সন্তানদের অস্বীকৃতির এই সামাজিক অবক্ষয়কে চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়েছেন নাট্যকার।দীপু হাজরার এ নাটকটি দর্শককে বাস্পরুদ্ধ করেছে, কিছুটা সময় ভাবিয়েছে আমরা সমাজটাকে কোথায় নিয়ে চলেছি? দীপু হাজরার নির্মান কৌশল, কাহিনীর গতিময়তা এবং চঞ্চল চৌধুরী, আ খ ম হাসানের অভিনয় নাটকটিকে সমৃদ্ধ করেছে।নাদিয়া, শাহনাজ খুশীও ভাল অভিনয় করেছেন।

ছবিঃ গুগল