দশভূজা

অদিতি বসুরায় (কবি, সাংবাদিক)

(কলকাতা থেকে): মেয়েরা ভাই, দশভূজা। মেয়েরা ‘সব’ পারে। মেয়ে হওয়া কি চাট্টিখানি কথা? অ্যাঁ?
প্রায়ই একটা বিজ্ঞাপনে চোখে পড়ে, নারী মডেলের ১০টি হাতে প্রেশার কুকার থেকে ঝাঁটা পর্যন্ত শোভা পাচ্ছে। তাকে ‘পারতে হবে’ সব। পড়াতে হবে, পড়তে হবে, বাজার করতে হবে, গয়না কিনতে হবে, ফ্যাশান জানতে হবে, ভিমবার কিনতে হবে, আপিস করতে হবে, সন্তানের ক্যারাটে ক্লাশে যেতে হবে, রিপু করতে হবে, ইন্দো-ওরিয়েন্টাল কুইজিনের ঠিকানা জানতে হবে, রাম-বল বানাতে শিখতে হবে ।
আচ্ছা। কেন? কেন একটি মেয়েকে সব পারতে হবে?
কেন তাকে ঝাঁটাও ধরতে হবে আবার ছেলের ইস্কুলেও দৌড়তে হবে? কেন তাকে ঘর-বার সমান তালে সামলাতে হবে?
কেউ কি ভেবে দেখবে না, এগুলো আদতে মেয়েদের সেই দমবন্ধ জায়গায় ঠেলে দেওয়ার বাহারি চক্রান্ত? এসব আসলে সেই সোনার শিকল যা গলায় চেপে বসলেও বোঝা যাবে না,গলাভর্তি কালশিটে-স্বর বুজে আসছে। মরে যাচ্ছে মেয়েগুলো। এদিকে বাড়ি ও প্রতিবেশীর সঙ্গে গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপনগুলো করে চলেছে স্লো পয়জনিং। সামিল করে দিচ্ছে এক প্রাণান্তকর ম্যারাথনে।
তোমাকে রোগা থাকতে হবে। তোমাকে আপিসে সেরাটা দিতে হবে। তোমাকে বাড়িতে হতে হবে, এক নং গিন্নি। মা হিসেবে পেতে হবে ১০০-এ অন্তত ৮০।
সেই সঙ্গে তোমাকে ছোটাতে থাকবে বিজ্ঞাপন। তোমাকে ছোটাতে থাকবে ‘সব পারার’ সোনার হরিণ। তোমাকে ছোটাতে থাকবে পিছিয়ে পড়ার দুঃস্বপ্ন।
গয়না থেকে শাড়ি – হাঁড়ি থেকে নোটবুক – পুজোর মণ্ডপ থেকে প্রতিমা- সর্বত্র তোমাকে গিলিয়ে যাওয়া হবে, সেই মিরাক্যুলাস বড়ি যার নাম ‘তুমি সব পারো’। তোমার দশহাত। তুমি মা দুর্গা। তুমি দেবীর অংশ।
তুমি সেই ‘দেবীত্ব’ অর্জনের ইঁদুর দৌড়ে ঢুকে পড়বে অজান্তেই। ইতিমধ্যেই তোমার মস্তিস্কে সংক্রমিত হয়ে গেছে মগজ ধোলাইয়ের যাবতীয় হোর্ডিং, গণমাধ্যম, বিজ্ঞাপনের বুলি। তাই ‘সব পারার’ ম্যাজিক বাক্সে না ঢুকতে পারলে, তুমি অপরাধী। আর সেই অপরাধবোধও তোমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যাবে হীনমন্যতার শেষ সীমায় আর তুমি শুনতে পাবে, মেয়েরা তো সব পারে। ইন্দিরা গান্ধী থেকে মার্গারেট থ্যাচার মায় পাশের বাড়ির বউটি পর্যন্ত উদাহরণ তুলে ধরা হবে! কারণ তোমাকে হবে রোল মডেল। সেখানে নিজের জন্য ডিস্কো থেক বা স্পা-এর সময় বা কলেজপাড়ায় অকারণের বই খোঁজা বা মাঝরাতে সিনেমার নো এন্ট্রি।
সুতরাং, সব বাদ। সুতরাং, দুই হাতে দশ হাত পাওয়ার অলীক স্বপ্নে শেষ সামান্য অবসর। শেষ বিকেলে কফি খেতে খেতে বোর্হেস উল্টানোর মিনিট কুড়ি। শেষ আকস্মিক লম্বা ড্রাইভের হাতছানি।
রেসের ঘোড়া মারা যাওয়ার আগে কি তাকে কেউ ঘুমানোর অবকাশ দেয়?

ছবি: গুগল