দানব অথবা দানবীয়…

দানব কাকে বলে?কোথায় তাদের বসবাস?কোন পাহাড়ে, জঙ্গলে অথবা মেঘলোকে তারা তাদের ক্ষিপ্ত চলাফেরা আর আক্রোশে সবকিছু লণ্ডভন্ড করার ইচ্ছা দিয়ে স্তম্ভিত এক রাজত্বের অধিকার কায়েম করে রেখেছে? দানবদের এমনি ধারণা আর বিবরণ আমাদের শিশুমনকে একটা সময়ে রূপকথার বই থেকে উঠে এসে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো কিন্তু এখন মনে হয় সেই কল্পিত দানবরাও ততোটা ভয়ংকর দানব হয়ে উঠতে পারেনি। সেইসব গল্পের স্রষ্টারা হয়তো তাদের ভাবনা ব্যবহার করে খুব বেশি ভয়ংকর দানব সৃষ্টি করতে পারেননি। এখন আমাদের সমাজে অনেক অতিমাত্রার দানবদের অবাধ বিচরণ। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা আর ধর্ষণের লোমহর্ষক বিবরণ সেটাই প্রমাণ করছে। নারীর প্রতি পুরুষ তার বিদ্বেষমূলক মনোভাব আর শক্তিকে প্রমাণ করতে চেয়েছে বরাবরই। সেই চেষ্টা আজকের সমাজে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নামিয়ে এনেছে এক আদিম অন্ধকারের যুগ, দানবদের যুগ। পৃথিবীজুড়ে যুগে যুগে মানুষ প্রতিকী অর্থে এই দানব বাহিনী তৈরি করেছে। শাসক, নিয়ন্ত্রক আর স্বৈরাচারী মানসিকতার মানুষ তাদের বর্বরতা আর ক্ষমতার লোভকে চিরস্থায়ী করতে মেরী শেলীর সেই বিখ্যাত ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ উপন্যাসের মতো তৈরি করছে দানব। এই দানবের উল্লাসে চমকে উঠেছে শান্তিপ্রিয় মানুষ। তারা ভয় পেয়েছেতারপর এক সময় তারা  প্রতিরোধ করেছে, যুদ্ধ করেছে এই দানবদের ভয়াবহ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। সে যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত মানুষ-ই জয়ী হয়েছে। আজকের বাংলাদেশও যেন এমন কিছু দানবের উল্লাসমঞ্চ। তারা কেউ একদিনে মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসেনি। একটু একটু করে তাদের তৈরি করা হয়েছে, তৈরি হবার সুযোগ দেয়া হয়েছে। সেই শক্তি এখন গোটা দেশকেই ধ্বংস করে দিতে উদ্যত। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো দানবদের নিয়েদানব অথবা দানবীয়

পাশ্চাত্য সাহিত্যের রোমান্টিক যুগে বিখ্যাত ইংরেজ কবি পার্সি শেলীর স্ত্রী মেরী শেলী ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ নামে উপন্যাস লিখে তোলপাড় ফেলেছিলেন সাহিত্য জগতে। উপন্যাসের নায়ক ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন পেশায় ছিলেন বিজ্ঞানী। তিনি বিদ্যুৎ চমকানোর সময় মেঘ থেকে পতিত বিদ্যুৎ থেকে মৃত মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করতে গিয়ে ভুলক্রমে একটি দানব সৃষ্টি করে ফেলেন। সেই দানবটি ক্রমান্বয়ে একের পর এক মানুষ হত্যা করতে শুরু করে হতাশা থেকে। একপর্যায়ে বিজ্ঞানী ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের স্ত্রী এলিজাবেথকেও হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করেনি তারেই সৃষ্ট সেই দানব। সেই ভয়ংকরদর্শন দানব খুঁজেছিলো তার সঙ্গী। সেই দানবকে নিয়ে লেখা আশ্চরয প্রতিকী উপন্যাসটি পৃথিবীতে আজো আলোচিত। সেই ভয়াল দানবটির পরিচয়ও দাঁড়িয়ে গেছে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানব হিসেবেই।

মেরী শেলীর বিখ্যাত উপন্যাসটি লেখার দু‘শো বছর অতিক্রম করেছে। কিন্তু সেই দানবের ছায়া কি আমাদের প্রতিদিনের জীবন থেকে অপসৃত হয়েছে? আমরা চারপাশে কী দেখছি? মেরী শেলীর সেই দানব চরিত্রটি এখন শাসন করছে আমাদের চারপাশ, আমাদের মানসিকতা। নারীর প্রতি একের পর এক সহিংসতার ঘটনা, ধর্ষণ, খুন, গুম হয়ে যাওয়া মানুষের অসহায় নিয়তি সংবাদের শিরোনাম হয়ে আর শুধু কী বাংলাদেশ? পৃথিবীর কোন প্রান্ত আজ নিরাপদ এই দানবীয় শক্তির বিকাশের হাত থেকে? নিষ্ঠুর এক সময়কে বহু বছর আগে এভাবেই কবিতায় তুলে এনেছিলেন জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায়, ‘‘পৃথিবীর গভীর, গভীরতর অসুখ আজ’’।

দানবের ইংরেজি নাম মনস্টার। অভিধানের বিবরণে বলা আছে, দানব হচ্ছে এক ধরণের বিচিত্র জীব যার চেহারা ভয়ঙ্কর এবং যার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা মানব বিশ্বের সামাজিক বা নৈতিকতার জন্য হুমকি স্বরূপ।

একটি দানব বা দৈত্য মানুষও হতে পারে, কিন্তু লোককাহিনীতে সাধারণতে দানবের বিবরণ দেয়া হয়েছে, নীচুশ্রেণীর, রূপান্তরিত, বিকৃত, অতিপ্রাকৃত এবং পারলৌকিক প্রাণী হিসেবে।

গ্রিক ও ভারতীয় পূরাণে এই দানবদের নানা কাহিনির বিবরণ আছে। গ্রিক পৌরানিক কাহিনীতে বর্ণীত আছে, ক্রিটের রাজা মিনোস সমুদ্র দেবতা সাদা ষাড় পসেইডনকে বলিদান না করায় মিনোসকে ইশ্বরের মুখোমুখি করা হয় বিচারের জন্য।এই অপরাধে  মিনোসের স্ত্রী পাসিফাইকে শাস্তি দেয়া হয়। পাসিফাই ষাড়ের প্রতি প্রেমাসক্ত হয়ে পড়ে এবং সেই ষাড়ের সঙ্গে মিলিত হয়। পসিফাই ষাড়ের মাথাওয়ালা মানব সন্তান মাইনেটোর জন্ম দেয়।

মানব দানব হলো যারা কখনই সম্পূর্ণ মানব হিসেবে জন্ম নেয়নি। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় গ্রিক দেবী মেডুসা এবং তার বোনের কথা। অথবা যারা কিছুটা অতিপ্রাকৃতিক বা অস্বাভাবিক কারণে তাদের মানবিকতা হারিয়েছে যেমন ওয়ারউলভস। এরা কখনোই মানব সমাজের নিয়মনীতি মেনে চলতে পারে না।

দানবদের নিয়ে প্রাচীন ইতিহাস এবং তাদের সম্বন্ধে সমাজের ভিতরে বিশেষ সাংস্কৃতিক বিশ্বাস নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা মনস্ট্রোফি নামে পরিচিত।

দানবদের কল্পিত কাহিনি নিয়ে যতোই চর্চা আর গবেষণা হোক না কেনো মানুষরূপী আসল দানবদের উত্থানের গল্প তো পৃথিবীতে নতুন নয়। আর যুগে যুগে এই দানবদের উত্থান ঘটেছে রাজনীতির হাত ধরেই। হিটলার নিজের রাজনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য তৈরি করেছিলো বিশেষ ফ্যাসিস্ট বাহিনী। ইতালীর দু:শাসক মুসোলিনীও তাই। দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকায় এ ধরণের বাহিনীর কথা আজো শোনা যায়। এই বাহিনীগুলো মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, কথা বলার স্বাধীনতাকে চিরতরে মাটিচাপা দিতেই ব্যবহৃত হয়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্য, আফগানিস্তান আর ভারতের মতো দেশেও তৈরি হয়েছে এ ধরণের দানবীয় শক্তির বাহিনী। আমাদের স্বদেশভূমিও কি এসব থেকে দূরে থাকতে পেরেছে। মধ্যপ্রচ্য এবং আফগানিস্তানে ইসলাম ধর্মের নামে উগ্রবাদী বাহিনীগুলোর চালানো তাণ্ডবের কাহিনি সবারই জানা।

এই দানব অথবা দানবীয় শক্তির বিকাশের পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক নিষ্ঠুরতার ইতিহাসও। কোত্থেকে আসে এই নিষ্ঠুরতা। উত্তরে বলা যায়, সমাজের ভেতরে একটি শ্রেণী প্রতিদিন একটু একটু করে ছড়িয়ে দিচ্ছে নিষ্ঠুরতার বিষাক্ত ওষুধ। পোকা মারার বিষের মতো সেই নিষ্ঠুরতা সমাজগুলোতে তৈরি করছে ভয়ংকর ভারসাম্যহীন এক অবস্থা। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় শঞর অথবা গ্রামে আমরা দেখছি নির্বিকার নিষ্ঠুরতার বিকাশ।

কেন মানুষ এত হিংস্র হয়ে ওঠে? কেন অমানুষিকতা এভাবে উন্মোচীত হয়? মানুষের এই অমানবিক আচরণ আসলে তার পাশবিক প্রবৃত্তির প্রকাশ। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, এই ধরনের আচরণের পেছনে রয়েছে মানুষের অবদমিত কামনা-বাসনা, যাকে তিনি তুলনা করেছেন অবচেতন মনের খিড়কি খুলে দেওয়ার সঙ্গে। অবচেতনে মানুষ যা কামনা করে, চেতন মনে সে তার শিক্ষা, সভ্যতা, সামাজিকতা আর নৈতিকতা দিয়ে সেগুলো ঢেকে রাখে। সেই অবদমিত কামনা—সরাসরি পূরণ হয় না বলে হিংস্রতা আর নৃশংসতার মধ্য দিয়ে ঘুরপথে পূরণ করার চেষ্টা চলে। কখনো এই হিংসতার প্রকাশ মানুষ একাই ঘটায়। আবার কখনো তা প্রকাশ করতে আশ্রয় নেয় যূথবদ্ধতার। এভাবেই মিলিত হিংসার জোরে তারা খুন করে ফেলে নিজের বহুচেনা মানুষটিকে। ফরাসী মনোবিজ্ঞানী এই হিংস্রতার প্রকাশকে `মবসাইকোলজি বা ক্রাউড সাইকোলজি‘ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এই বিজ্ঞানীর মতে মানুষ কখনো এই অবদমিত কামনাকে দলবদ্ধ হয়েও প্রকাশ করে এবং পুরো মানসিকতাটা ছোঁয়াচে হয়ে ছড়িয়ে পড়ে অন্যদের মাঝেও। ইতিহাসের পৃষ্ঠা উল্টালে দেখা যায় ১৪৩১ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসী দেশের জোয়ান অব আর্ককে ডাইনি অপবাদ দিয়ে দলবদ্ধ মানুষ পুড়িয়ে মেরেছিলো।

মানুষের মধ্যে এই হিংস্রতা অথবা দানবীয় আচরণকে মনোবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছে, মানুষ নিজের হতাশা কাটাতে, নিজের অপ্রাপ্তিজনিত হতাশাকে দূরে ঠেলতে তার নিজের চেয়েও দূর্বল কাউকে বেছে নেয় শিকার হিসেবে। আর এই দূর্বলের ওপর হিংস্রতা প্রকাশ করে এক ধরণের তৃপ্তি পেতে চায়।এই তত্ত্বকে বলা হয় ফ্রাস্ট্রেশন-অ্যাগ্রেসন হাইপোথিসিস।কিন্তু যতোই আমরা মানুষের এই অমানুষিকতাকে নানা তত্ত্বের আড়ালে দাঁড় করাতে চাই না কেন পৃথিবী কিন্তু এই দানবীয় শক্তির কাছেই ধরে ধরে আত্মসমর্পন করছে।

কারা তৈরি করছে এই শক্তিকে? তারাই করছে যাদের কাছে ক্ষমতা, লোভ আর যুদ্ধের নেশা আজো শাসনের প্রধান হাতিয়ার। যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখ বন্ধ করে নিজের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু সে পথে কি সফলতা আসে। মেরী শেলীর উপন্যাসে মানুষের তৈরি দানবকে দিয়ে সে কাজটা করা সম্ভব হয়নি। বরং উল্টো দানব নিজের স্রষ্টার জীবন নাশ করতেই উদ্যত হয়েছিলো। যুগে যুগে এই দানবরা তাই করে থাকে। কিন্তু যারা তাদের তৈরি করে তারাই এই সত্যটি বিশ্বাস করতে চায় না।

আমাদের সাহিত্যে, পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে দানবের উপস্থিতি আছে। উপন্যাসের জগতে সুপরিচিত দানবগুলোর মধ্যে আছে কাউন্ট ড্রাকুলা, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের তৈরি দানব, মমি আর জম্বি। দীর্ঘদিন থেকেই সাহিত্যে দানবের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। মহাকাব্য বেউলফ-এ পানির দানব গ্রেনডেল একজন বিকৃত, নৃশংস, প্রচন্ড শক্তিশালী এক আদিম দানব। এটি শিকার ধরা ও খাওয়ার জন্য রাত্রীবেলা মানব বসতিতে হামলা চালাত। নানা ধরণের কল্পবিজ্ঞানের গল্পেও এই দানব চরিত্রের উপস্থিতি দেখা যায়।

দানবদের গল্প কিন্তু শেষ হওয়ার নয়। পৃথিবীতে ক্ষমতা আর সম্পদের লোভ যত দিন থাকবে সেগুলো রক্ষা করার জন্য দানবদেরও আবির্ভাব ঘটবে। তবে সত্য হচ্ছে এই দানবদের বিরুদ্ধ মানুষের প্রতিরোধের, সংগ্রামের ইতিহাসও কিন্তু সুপ্রাচীন।

ইরাজআহমেদ
তথ্যসূত্র:উইকিপিডিয়া
ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box