দিনাজপুর আমার কাছে একটা ভেসে থাকা সাদা মেঘ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শেখ রানা (গীতিকার, লেখক)

রাজশাহী বি আই টি- তে পড়াকালীন ঘুরে বেড়িয়েছি খুব। সেটা ছিলো বোহেমিয়ান গীতিকার এর শুরুর জীবন।

কান্তজীর মন্দির

কাকা-খালাম্মা দিনাজপুর থাকতেন। ওয়াপদায় কর্মসুত্রে নিয়মিত বিরতিতে কাকার বদলী হতো। আমিও নতুন নতুন জায়গা আবিষ্কার করতাম, নিজের মত করে। গুড্ডিমারী, জলঢাকা, জয়পুরহাট, সৈয়দপুর, দিনাজপুর। কিন্তু দিনাজপুরের মতন এত দাগ কাটে নি অন্য কোথাও। সেটার একটা কারণ হবে তারুণ্য। অন্য কারণ কী, কে জানে!

বড় মাঠের ডান পাশ ঘেঁসে রাস্তা ধরে শহরের প্রাণকেন্দ্র আর বাম পাশের চিলতে পথ ধরে ওয়াপদা কলোনী। বড় মাঠ মানে আক্ষরিক অর্থেই বড় মাঠ। মাঠের পেট চিরে একটা রাস্তা অবশ্য হয়েছে। তবু তার কুল পাওয়া দুষ্কর। সবুজ ঘাস রোদ গায়ে মেখে চিকচিক করে। দিনাজপুরের চমচমে রোদে আমিও হেঁটে বেড়াতাম সেসব চোখে ধরে।

পুনর্ভবা নদী হাঁটাপথ দূরত্বে। আর দেয়াল ঘেঁসে ঘাগড়া খাল। কলোনীর ভিতরে বিকেল হলে ফুটবল খেলা জমে উঠতো। অল্প সময়েই পরিচিতি পেয়েছিলাম, তাই। খেলা আর ধূলো গায়ে মেখে আমার আর এক রোমান্টিসিজম ছিলো কাকার মোটরসাইকেল (তখনও সব মোটর সাইকেল মানেই আমার কাছে হোন্ডা)। কাওয়াসাকি ব্র্যান্ডের বেশ দশাসই চেহারার বাইক। দুপুরে কাকা বাসায় এসে ভাত ঘুম দিতো। আমি অতি সন্তর্পণে চাবি নিয়ে বের হয়ে যেতাম। তারপর দিনাজপুর শহর ঘুরে-বেড়ানো এন্তার। মূল কেন্দ্রটি বেশ জমজমাট ছিলো, বাজারের পাশেই বোধ করি। সেখানেই সেলিম হোটেল। কিছু পরে খোঁজ পেয়ে গেলাম আমার স্কুলের বন্ধু দিনাজপুর মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। একসঙ্গে তো বটেই আমি ফুরসত পেলে একা একাও পুরি আর চা খেয়ে আসতাম। সেলিম হোটেলের পুরি-সিঙাড়া শহরবাসীর মধ্যে জনপ্রিয় ছিলো।

রাজশাহী বি আই টির আর এক বন্ধু পেয়ে গেলাম, দিনাজপুরেই থাকে। নাম- নোবেল। ও সিভিলের ছাত্র আর আমি ইলেক্ট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিক বিভাগের। কিন্তু আমাদের মধ্যে ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। মনে আছে একবার একসঙ্গে রামসাগর দীঘিতে ঘুরতে গেলাম। ঝিম ধরে আছে সেই রামসাগর দীঘি- প্রথম দেখায় আমার তাই মনে হয়েছিলো। এক পড়ন্ত বিকেলে হোন্ডায় চড়ে তিন জন গিয়েছিলাম।

ছুটি-ছাটা পেলে, বিশেষ করে স্বল্পদৈর্ঘ ছুটিতে দিনাজপুর ছুটতাম। তখন ইচ্ছের বাদশা আমি। যেতে চেয়েছি, যাবোই টাইপ একরোখা তরুণ। কত বাহনে চড়ে যে গিয়েছি তার তো ইয়ত্ত্বা নেই। একবার বাসে উঠলাম, মিনিবাস। রাজশাহী আন্তঃ জেলা বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে মাঝ পথে এসে, হেসে সবাইকে নামিয়ে দিলো। নেমে দেখি যেন অমানিশার রাত! এক হাত দূরের মানুষকে দেখা যাচ্ছে না। মানুষ বলতে সেই বাসের দিনাজপুরগামী গুটিকয়েক যাত্রী। কোথায় নেমেছি তাও ঠাহর পাই না। বিপুল বপুর এক ট্রাকে উঠে বসি সবাই মিলে। সেই ট্রাক দশ মাইলের মোড়ে এসে থামে।

আহ! ইয়াসমিনের কথা মনে পড়ে। দূরে পুলিশের টহল দেখে আরো বেশী। তারপর ইয়াসমিন এসে আমার হাত ধরে। রাত তখন দুটো বাজে। কীভাবে কীভাবে যেন দিনাজপুরে পৌঁছে যাই তারপর।

তারপর … পূনর্ভবা নদীতে চর জাগে। পায়ের গোড়ালি ভিজিয়ে খালাতো ভাই হাসিবকে নিয়ে সেই চর পেরিয়ে যাই। শিপলুর বান্ধবীদের সঙ্গে পরিচয় হয়। আমরা দলবেঁধে বালিয়াড়ি ধরে শহরের তীরে উঠি। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নামে।

আর একবার ট্রেন ধরে যাত্রা। রিকো ছিলো। ও জয়পুরহাট নেমে যায়। আমি ফুলবাড়ি নেমে বাসের ছাদে বসি। যাত্রাসঙ্গী আমার ওয়াকম্যান। অঞ্জন দত্তের গান শুরু হয়- ‘দূর থেকে ভেসে, ভেসে আসা/ অদ্ভুত গান পাহাড়ি ভাষা’… সেই মুহূর্তে মনে হয় পৃথিবীর কোথাও কোনো জটিলতা নাই। শুধু ভেসে ভেসে দিনাজপুরে চলে যাওয়া আছে।

দিনাজপুর আমার কাছে এইসব মিলে একটা ভেসে থাকা সাদা মেঘ। সেই মেঘের তুলোয় স্মৃতির পসরা রঙিন।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]