দিল্লী থেকে মানালি, বড্ড বেশি জ্বালালি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তওহিদ মাহমুদ হোসেন

বিদায় মানালি

এগারো.

আজ আমাদের শেষ রাত্রি মানালিতে। কাল ভোরে আমরা রওনা দেব দিল্লির উদ্দেশ্যে। বছরের শেষ দিনটা কাটানোর জন্য মানালির এই সিটি সেন্টার, যেটাকে ওরা মল রোড বলে, সেটার থেকে ভাইব্রেন্ট আর কিছুই হতে পারে না। জায়গাটা আসলে একটা প্লাজা। বিশাল চত্বরে কতকিছু যে হচ্ছে। মায় বিশাল প্যান্ডেল খাটিয়ে ওপেন গ্যাম্বলিং পর্যন্ত যেটাকে ‘হাউজি’ বলে। দু’পাশে সার দেয়া দোকান। গরম পোষাক সহ মানালির ট্রেডমার্ক জিনিসগুলো এখানে পাবেন। সমস্যা হলো দামের কোন আগামাথা নেই। তেমনি মানেরও। রাস্তার পাশে অসংখ্য দোকানের পসরা সাজিয়ে বসেছে। আমি একটা টুপি কিনলাম স্যুভনির হিসেবে।

এখানে আপনি অনেক নন-ভেজ দোকান পাবেন। ছ’দিন ঘাসপাতা চিবিয়ে প্রায় তৃণভোজীতে পরিনত হতে যাচ্ছিলাম।এখানে সাঁটিয়ে মাংস আর মাছ খাওয়া গেল। ততক্ষনে তাপমাত্রা হিমাংক ছুঁয়েছে। সেই প্রচন্ড ঠান্ডায় কোন জিনিসটা সবচেয়ে মানায়, বলেন তো? আইসক্রিম। ‘সিক্স-ইন-ওয়ান সফটি’ নামে একটা কোন বিক্রি হচ্ছে মাত্র চল্লিশ কি পঞ্চাশ রুপিতে। ছ’টা ভিন্ন ফ্লেভার আর স্বাদ যখন চেটে নেবেন, আহ…! অসাধারণ। আমার দুই ছেলে তো মহা উত্তেজিত। একটা খাওয়ার পর কাতর নয়নে চাইতেই মঞ্জুর হয়ে গেল দ্বিতীয় দফার। আসলেই আইসক্রিমটা মজার।

ইচ্ছে ছিল এইখানেই থার্টি ফার্স্ট নাইটটা উদযাপন করবো। কিন্তু মৃণালদা যে তথ্য দিলেন সেটা হলো রাত দশটার পর এখানটায় উন্মত্ততা লাগাম ছিঁড়ে ফেলে। তখন ছিনতাই এর মত দূর্ঘটনা অতি স্বাভাবিক। সুতরাং সময় থাকতেই হোটেলে ফিরলাম। সেখানে অবশ্য হোটেলের আয়োজনে ডিজে পার্টি আর বন্-ফায়ার হচ্ছে। সারাদিন পাহাড় বেয়ে শরীর ক্লান্ত। তাই আগুনের পাশেই বসে রইলাম। ঠিক বারোটা বাজতেই কেন যেন সব আলো নিভে গেল। আর দিকে দিকে আকাশ ঝলসে উঠতে লাগলো আতশবাজির আলোকোচ্ছটায়। সেই দৃশ্য অনেকদিন আমাদের মনে থাকবে।বিদায় ২০১৯। বিদায় প্রিয় মানালি

রাত সাতটায় (মানালিতে ভোর সাতটা আর রাত সাতটা একই। তবে আপনি বোঝার জন্য ভোর পড়তে পারেন) গাড়িতে উঠেছি। সেটা দিল্লিতে পৌঁছালো রাত সোয়া এগারোটায়। ক’ঘন্টা হলো দাদা? প্রায় সতেরো ঘন্টা…হুম। অতীব সাবধানী ড্রাইভার আর ততোধিক ভীতু স্ত্রী সঙ্গে থাকলে টাইম ডাইলুশন তো হবেই। আমার জানা নেই এই দুরত্ব বাইপাস করার কোন উপায় আছে কি না। আর থাকলেও আমাকে জানিয়ে লাভ নেই। নিশ্চিত এই পথে আর যাবো না কখনও। নামার পর মনে হলো কোমরের নিচটা গাড়িতেই রয়ে গেছে কারণ কোন সাড় নেই। সারাটা পথ হিন্দি গান বাজাতে হয়েছে। উপায় ছিলো না রে ভাই। আমি না বাজালে ওই ব্যাটা ‘বাল্লে বাল্লে’ মার্কা যত্তসব বস্তাপচা গান ছাড়ে। বন্ধও করা যাচ্ছে না। কারন ওর ঘুম এসে যায় নাই। আমি কিছুক্ষন বাংলা গান ছেড়েছিলাম। ‘বান্ধ কিজিয়ে’ বকে এক ধমক। আমি ভাবলাম, শ্লা, গাড়ি ভাড়া আমি করেছি। এই পাঁচটা দিন নিজের ডেটা খরচা করে তোকে হিন্দি গান শোনালাম। তার প্রতিদান এই? আওয়াজটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলাম। এইবার দ্যাখ।

এবং সেই ‘দেখাটা’ শেষ পর্যন্ত আমাকেই ‘দেখতে হলো।

ড্রাইভারকে আগেই দিল্লি হোটেলের নাম আর ঠিকানা দিয়েছিলাম। এত রাতে পৌঁছাবো, চেনে কি না চেনে। সে তো বাঁ হাত তুলে আমাকে আশ্বস্ত করলো,

– “ম্যায় সাব জানতা হুঁ। উও হোটেল কা মালিক হামারা গাঁও কি হ্যায়। সারপাঞ্চজী হ্যায় উও।”

বাব্বা…! এ তো মহা তালেবর। হোটেলের ঠিকানা কি, মালিকের ঠিকানা ভি জানে। বললাম,

– “তাহলে তো ভালই। ম্যাপে দেখাচ্ছে ওই যে।”

– ম্যাপ-ফ্যাও ছোড়ো সাবজী। ক্যারল বাগ হ্যায় তো? ম্যায় লে যাতা হুঁ।

এপাশ ওপাশ ঘুরে গাড়ি গিয়ে দাঁড়ালো হোটেলের সামনে। নামার আগেই হোটেল থেকে উদ্বাহুভঙ্গিতে দু’জন দৌড়ে এলো

– আপনাদের আসার কথা ছিলো স্যার। দু’টো রুম তো? এটাই।

বাহ্..! ব্যাটা তো ঠিক জায়গাতেই এনেছে। আর কি সার্ভিস। গাড়ির শব্দেই বুঝে গেলো। মোটা বখশিস দিয়ে যতক্ষন ড্রাইভারকে বিদায় করেছি ততক্ষনে বউ আর পোলাপান যার যার রুমে। আমি পাসপোর্টগুলো ফ্রন্ট ডেস্কে দিয়ে রুমে ঢুকেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বউব ততক্ষনে বাক্স প্যাঁটরা খুলে রাতের পোষাক নিয়ে বাথরুমে ঢুকে পড়েছে। ছেলেরা কম্বলের তলায় ঢুকি ঢুকি। শান্তি। এত লম্বা জার্নি। জান শেষ। কাল দুপুরে ব্যাংককের ফ্লাইট। ঘুমিয়ে পড়তে হবে। শরীর আর চলছে না।

মনে হলো, যাই, পাসপোর্টগুলো নিয়ে আসি। রুম সার্ভিসকে খাবারের অর্ডার দেয়া হয়েছে। একটু না খেলে ঘুম হবে না। নিচে নেমে ফর্মে সাইন-টাইন শেষ করলাম। আড়মোড় ভেঙ্গে ঘুরতে যাব, এমন সময় অদ্ভুত প্রশ্ন- স্যার, আপনাদের তো ডিনার বুক করা আছে, তাই না?

আরেহ…! দারুন তো। আমার ট্র‍্যাভেল অপারেটর নিশ্চয়ই কম্পলিমেন্ট্রি দিয়েছে।

– ডিনার থাকার কথা না। কিন্তু হতেও পারে।

– স্যার, আপনার নামটা আবার বলেন তো।

বললাম। সঙ্গে ট্র‍্যাভেল এজেন্টের নামও। মোবাইল খুলে বুকিংটাও দেখিয়ে দিলাম। তারপর পুরো ট্রিপের সবচে’ মধুর বাণীটা আমার কর্ণকুহরে প্রবেশ করলো- স্যার, একটা ভুল হয়ে গেছে। এটা আপনার হোটেল না। অন্য এক ফ্যামিলি, আপনাদের মতই চারজন মানালি থেকে, তাদের নামে বুক করা। আপনাদের হোটেলটা অন্য। আমাদেরই ভুল।

পাঠক, একবার নিজেকে ওই জায়গায় দাঁড় করিয়ে ভাবুন। সতের ঘন্টা জার্নির পরে জামাকাপড় বদলে বিছানায় শোয়ার পর আপনাকে ভদ্র ভাষায় ডেকে বলা হলো – ‘নিকাল সালে। ইয়ে তেরি কামরা ন্যহি হ্যায়।’ কেমন লাগবে?

অনেকদিন আগে, যখন ডেভ হোয়াটমোর বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন ছিলো, তখন কোন একটা খেলায় বাংলাদেশ অতি অপ্রত্যাশিতভাবে এবং নির্লজ্জতমভাবে হেরে গেলে পরেরদিন পেপারে বেরিয়েছিল-

“অল্প শোকে কাতর

অধিক শোকে পাথর

তারও অধিক শোকে হোয়াটমোর।”

এই লেখক তখন সেই হোয়াটমোর; বিড়বিড় করছে,

“প্রভু, What more? What more?” (সমাপ্ত)

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]