দিল্লী থেকে মানালি, বড্ড বেশি জ্বালালি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তওহিদ মাহমুদ হোসেন

ঘোড়ায় চড়িয়া মর্দ্দ হাঁটিয়া চলিল

আগেই বলেছি, আজ ভোর ছ’টায় প্রায় ১০ ঘন্টা ড্রাইভিং শেষে হোটেলে পৌঁছেছিলাম। এরপর মাত্র ঘন্টা তিনেকের ঘুমের সুযোগ।

সিমলা ট্রিপের অন্যতম পার্ট হলো কুফ্রি দর্শন। আরও সাইট সিয়িং নিশ্চয়ই আছে কিন্তু আমাদের ট্রিপ প্ল্যানে এইটাই ছিলো। কুফ্রি ৩০ কিমি আমাদের হোটেল থেকে। হোটেল থেকে গাড়ি যে ড্রপ পয়েন্টে নামায় সেই রাস্তাটা পেরোতে প্রায় দুই ঘন্টা লেগে গেলো। ট্র‍্যাফিক জ্যাম মারাত্মক এখানে। কারণ ট্যুরিস্ট সিজন এবং একটাই রাস্তা। যে জায়গাটায় গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিলো সেটার ওপরেও গাড়ি যায় কিন্তু আমাদেরটা যায় নি। এই স্থান থেকে ফোর হুইলার নামক গ্যাসচেম্বারে করে আপনাকে ঘোড়ায় ওঠার পয়েন্টে পৌঁছে দেবে ৩০-৪০ মিনিটে যদিও রাস্তা মাত্র ২ কিমি। কারও ওই একই; সরু রাস্তায় অনেক গাড়ি।

আপনার একটু সচেতনতার অভাবে এই কুফ্রি ভ্রমন ‘কুশ্রি’ ভ্রমনে মানে পেইন-ইন-দ্য-বাট হয়ে যেতে বেশিক্ষন লাগবে না। কি সেই সচেতনতা? আমার এই লেখাটা পড়া। হে…হে…হে…।

প্রতিবছর হাজার হাজার ট্যুরিস্ট কুফ্রিতে আসে এর সর্বোচ্চ পয়েন্ট, যেটার নাম ‘মাহাসু পিক’, সেটায় উঠে বরফ দেখতে। এখানকার সিনিক বিউটি অসাধারণ। হিমালয়ের বদ্রিনাথ এবং কেদারনাথ রেঞ্জ দেখা যায় এই পয়েন্ট থেকে। সে যাই হোক। যে ব্যাপারটা আমরা জানতাম না সেটা হলো সি-লেভেল থেকে ৮,৯২০ ফুট উঁচু এই পয়েন্টে গত দু’বছর ধরে বরফ ভয়াবহরকমের কমে গেছে। এখন কুফ্রিতে বরফ দেখা আর মেরু ভল্লুক দেখা প্রায় সমার্থক।

গাড়ির শেষ পয়েন্ট থেকে দুই তিন কিমি চড়াই পেরিয়ে তবে মাহাসু পিক। আর এই পথের একমাত্র বাহন – ঘোড়া। আপনি মোটা হন বা চিকন, লম্বা হোন বা বেঁটে, শান্ত বা রাগী, বোকা কিংবা চালাক – যদি পায়ে হেঁটে ট্রেকিং করতে না চান তাহলে ঘোড়ায় উঠতেই হবে। আর এরজন্য আছে লম্বা সিরিয়াল। তো আমরাও দাঁড়ালাম। আগেই নিচে থেকে বরফের বুট পরে নিয়েছিলাম। তখন তো বুঝিনি, এই বুট বরফ বাদে বাকি আর অন্য সব ধরনের কাজে লাগবে। ট্যুরিস্ট সিজন বলে লোকের গাদি লেগে গেছে ঘোড়ার সামনে। একের পর এক সিরিয়াল ডাকছে আর মেয়ে-মদ্দা-আন্ডা-বাচ্চা সব গিয়ে ঘোড়ায় চাপছে। প্রায় দেড় ঘন্টা পর আমাদের ডাক এলো। একেক রশিতে তিনটা করে ঘোড়া বাঁধা এক লাইনে। আমাকে তার মানে  আলাদা গ্রুপে যেতে হবে।

আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম যে নিভা ঘোড়ায় উঠতে পারবে না। কিন্তু আমাকে ভুল প্রমাণিত করে হাঁচড়ে পাঁচড়ে ঘোড়াওয়ালা এবং আমার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় (পড়ুন ধাক্কায়) একটা অশ্বের পৃষ্ঠে আরোহন করিলো। আচ্ছা, উঠেছে তো সহজেই। দেখি যায় কদ্দুর।দু’মিনিটের মধ্যে পড়বেই পড়বে। আর সেই দৃশ্য ধরে রাখতে তো আমাকেই হবে, না কি? সেল্ফিস্টিকে মোবাইল ফিট করে আমি পুরো রেডি – জয় মা। একটি বার ফেলে দে।

এর মধ্যে আমার ডাক এসে গেছে। আমার সঙ্গে ‘চোখে-হারাই ভাব’ নিয়ে এক মধুচন্দ্রিমাগ্রস্থ দম্পতি যার বাংলা হলো।হনিমুন কাপল। নাম তমাল আর পিয়ালি। তো আমাদের সিকোয়েন্সটা এমনঃ প্রথমে তমাল, মাঝখানে পিয়ালি, আর সর্বশেষে হাতে সেল্ফিস্টিক নিয়ে আমি। আমার তখন একান ওকান জোড়া হাসি। এই মেয়েটা কি করে দেখি। পরে লেখার অনেক আইটেম পাওয়া যাবে।

হঠাৎ হুংকার কানে এলোঃ “আরে ইয়ে বেয়কুফ। উও মোবাইল ছোড়কে ঘোড়া কো পাকড়ো জ্যলদি। ন্যহি তো গির যাওগে না?”

শ্লা, কাকে কি বলছে? আমি পড়বো? এই ল্যাদামার্কা ঘোড়া থেকে? আমি…!!! অর্বাচিন ঘোড়াওয়ালার দিকে ভর্ৎসনার দৃষ্টিতে তাকালামঃ “ব্যাটা চাষা। ঘোড়া চরাচ্ছিস, সেইটেই কর। ফোটোগ্রাফির তুই কি বুঝিস? এত্তগুলো পয়সার শ্রাদ্ধ করে এয়েচি কি তোর আর তোর ঘোড়ার বোঁটকা গন্ধ শুঁকতে? আর জ্ঞান মারাতে আসিস নে। বলি, কত কষ্ট করে ভুলিয়ে ভালিয়ে আমার মোটু সোনাকে গাড়ি বাদ দিয়ে ঘোড়ায় তুলেছি। সেই এপিক ছবিটা কে তুলবে? তোর শ্বশুর?”

এইসব ভাবছি আর ওদিকে ঘোড়া চলতে শুরু করেছে রশির টানে। নিভারা এরই মধ্যেএগিয়ে গিয়েছে বিশ পঁচিশ ফুট। এ কি রে বাবা? এত দোলে কেন স্যাডেলটা? পা টান করবো? এ রে…! ঘুরে যাচ্ছে নাকি? নাহ…ছবি তুলে কাজ নেই বাবা। মোবাইলটা ঢুকিয়েই ফেলি পকেটে। কিন্তু দু’হাত যে লাগবে স্টিক থেকে খুলতে। ছাড়বো জিনটা? এক সেকেন্ডে কি আর হবে?

আমি কায়দা করে মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেললাম এবং…

আচ্ছা বলুন তো, কখনও কখনও এমন মুহূর্ত আসে না যখন এক পলকে এমন দিব্যজ্ঞান উন্মোচিত হয় যা বহু বছরেও হয়নি? আমার সেইটেই হলো। মনিষীরা কয়েছেন – “অপরের জন্য গর্ত খুঁড়িলে উহাতে নিজেকেই পড়িতে হয়।” আমি নিভার পতনের দৃশ্য মোবাইলবন্দী করবার মানসে বসেছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম, পুরো স্যাডলটা বোঁ করে বাঁয়ে এক চক্কর ঘুরে গেলো আর আমি সড়াৎ করে ইঞ্চি তিনেক পুরু থকথকে কাদা আর ঘোড়ার গোবরের সংমিশ্রনে বিছানো সফট ক্রিমের মধ্যে হড়কে গেলাম। বাঁ পা তখনও স্যাডেলের প্যাডেলে আটকে আছে আর আমি তিন হাত-পা বিছিয়ে লেটকে আছি সেই অঘ্রাতপূর্ব মন্ডে। অহোঃ…কি সৌরভ..!! আর আমি যেন গোবরে পদ্মফুলটি হয়ে শুয়ে আছি। সনাতন ধর্মালম্বী হলে বলতাম ‘অন্নপ্রাশনের ভাত উল্টে আসছে’। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল হারামজাদা ঘোড়াটাও আমার ওপরে শোয়ার তাল করছে। প্রভু…মৃত্যু তবে এইভাবেই স্থির করে রেখেছিলে? আমি ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠলাম – নিজ্যস বলছি।

ঘোড়াওয়ালা যতক্ষনে আমাকে উদ্ধারের জন্য ছুটে এসেছে ততক্ষনে এই ডামাডোলে সামনের ঘোড়া যেটাতে ওই কপোত মানে বরটা মানে তমালটা রয়েছে, সেটা দে ছুট। এইবার কানে এলো নাকিসুরে পারফেক্ট যাত্রাপালাঃ “ওগো, তুমি কোথায় যাচ্ছ? ও দাদা, ও চলে গেলো তো। আমাকে নামাও। ও দাদা। রোকো না উসকো। অ্যাই ঘোড়া, থাম বলছি। অ্যাই..অ্যাই…ও দাদা…ও ভগমান…।’

এ হলো আতংকিত কপোতীর মানে পিয়ালীর বিশুদ্ধ কান্না। কারণ তমালের ঘোড়া অনেকটা দূর এগিয়ে গেছে। আমি কিন্তু গোবরে শুয়ে শুয়েই তাকে স্বান্তনা দিচ্ছিঃ দিদি, ভয় পাবেন না। ঘোড়া অতি শান্ত। আমি পড়লেও আপনি পড়বেন না। তমালদা আছে। ওই যে দেখা যায়। আপনাকে ছেড়ে যায় নি। ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।

ভাবছেন এত পরোপকার কেন করছিলাম? সিম্পল। মনটা অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য। এই মর্মভেদী দুর্গন্ধ, যেটা অবলীলায় নাসারন্ধ্রের মধ্যে দিয়ে সটান পাকস্থলীতে চলে যাচ্ছে সেটাকে তো আটকাতেই হবে যতক্ষন না আবার ঘোড়ায় উঠছি। কারণ এমন প্যাঁচে আটকেছি যে সহজে ছোটানোই যাচ্ছে না। যাই হোক, মহাভারতের যুদ্ধও একদা শেষ হয়েছিল। ‘গিরা হুয়া আদমি’ও আবার ঘোড়ায় সওয়ার হলো এবং আবার যাত্রা শুরু।

অত্যন্ত এবড়ো থেবড়ো রাস্তা। বেশ খাড়া। ঘোড়াগুলোও হাড় বজ্জাতের একশেষ। শুধু খাদের কিনারে চলে যায় মাঝখানটা ছেড়ে। পথ জুড়ে চোখা চোখা পাথর। মধ্যিখানে কাদা আর ঘোবর (গোবর) এর ঘ্যাঁট। এখানে পড়লে কোমর নয় ঘাড় না হয় হাত বা পা – একটা না একটা ভাঙ্গবেই ইনশাআল্লাহ। দোয়াদরুদ যা জানা আছে, সেটা পড়ছি আর ঘোড়া দুলতে দুলতে, পা পিছলাতে পিছলাতে পাহাড় বেয়ে উঠছে। এরকম আতংক আমি এই জীবনে পাইনি। এর আগে কোহ-সামুই ট্রিপে আইল্যান্ড হপিং এ ক্রমাগত বমি করে আধমরা হয়েছিলাম। আজ মনে হলো, সে ছিল নেহায়েতই ছেলেখেলা। পিয়ালি তখনও ফোঁপাচ্ছে। এইরকম সময় কানে এলো এক মহামানবের বাণীঃ “ইয়ে তো কুছ ভী ন্যহি হ্যায়। যারা আগে উতার নে তো দো। সামাঝ হো জায়েগা কেয়া হোতা হ্যায়।” অর্থাৎ “এ তো কিছুই না। আগে তো নামো। টের পাবে কেমন লাগে।” পিয়ালি শুনলো কিনা জানি না। আমার কিন্তু খবর যা হওয়ার হয়ে গেল। কি ফাটা বাঁশের মাঝখানে পড়লাম। উঠতে তো হবেই। এরপর…নামতেও হবে এবং এই পথ দিয়েই, এই হারামজাদা ঘোড়ার পিঠে করেই।

মাহাসু পিকে নিভা আর বাচ্চারা আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো। প্রশ্নের আগেই ঘোবর ছাপ দেখিয়ে চোখ কটমট করে তাকালাম। কোন প্রশ্ন নয়। হাঁটো। আপনারা যারা এদ্দুর পৌঁছাতে পারবেন তাদের জন্য মাহাসু পিক বরফ ছাড়া আর যা যা আছে তা হলোঃ

-কয়েকটা বোদা বোদা চেহারার ইয়াক যাদের গায়ে ট্যাংকভেদী ‘অমোচনীয়’ বদবু। এগুলোর পিঠে উঠে ছবি তোলে লোকে। খরচ একশ বা দেড়শ রুপি। অমোচনীয় কালির মত এই দুর্গন্ধ হাত ছাড়তে চায় না। মনে রাখবেন গন্ধের কয়েকটা ধাপ আছেঃ সুগন্ধ, গন্ধ, দুর্গন্ধ, ভয়ংকর দুর্গন্ধ, আর ফাইন্যালি ‘আই বাপ!’ ইয়াকের গায়ে ওই শেষটা।

– কয়েকটা তুলতুলে পাহাড়ি খরগোশ। এগুলো জড়িয়ে ছবি তোলে। দাম বিশ থেকে তিরিশ রুপই।

– এয়ারগান এবং তীর-ধনুক দিয়ে লক্ষ্যভেদ।

– তিব্বতী পোষাকে ছবি তোলার জন্য এক বুড়ির প্রানান্তকর জোরাজুরি।

– লোভীদের জন্য একরাশ ন্যাতানো হ-জ-ব-র-ল নিয়ে খাবারের দোকান

– ছাগলদের ধরার ফাঁদ হিসেবে একসারি মনোহরি জিনিসের দোকান।

– বাঁশ দিয়ে ঘেরা একটা জায়গায় কয়েকটা টেলিস্কোপ। সেখান থেকে নাকি মন্দির, চীনের বর্ডারের মত দশটা জিনিস দেখানো হয়। দাম দেড়শ রুপি।

আমার পরামর্শ, এগুলো স্রেফ উপেক্ষা করুন। মানালিতে আরো পরিচ্ছন্নভাবে পাবেন। ভুলেও টেলিস্কোপে যাবেন না বরং একটা ভাল ফ্রেমিং খুঁজে নিয়ে ছবিগুলো তুলে ফেলুন, যেটা আমরা করেছি। হালকা কিছু খেয়ে নিতে পারেন নামবার ধকল সামলানোর জন্য। কারণ পিক দেখা শেষে আসছে আসল অগ্নিপরীক্ষা অথবা অশ্বপরীক্ষা। আসার সময় যদি সিরিয়াল ধরে আসতে হয় নামার সময়ও তাইই হবে। আর এইখানেই লেগে গেল চরম প্যাঁচ।

পাহাড়ি এলাকাতে এমনিতেই তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নামে। তার ওপর শীতকাল। আমরা যখন ঘোড়ার ড্রপ পয়েন্টে এসেছি ততক্ষনে লম্বা লাইন লেগে গেছে। ঘোড়া আর আসে না। দ্রুত দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে আর ঠান্ডা বাড়ছে। এক গোড়ালি প্যাচপ্যাচে কাদায় দাঁড়িয়ে আমার আক্ষরিক অর্থেই ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করলো। অন্ধকারে এই ভয়ানক রাস্তায় নামবো কিভাবে ঘোড়ায় করে? ভয় নিজের জন্য যতটা না নয় তার থেকে বেশি নিভার কিথা ভেবে। এবার তো ও পড়বেই অন্ধকারে। তখন কি হবে?

মিস-ম্যানেজমেন্ট এর ভালই প্রদর্শন করে পাক্কা দু’ঘন্টা দাঁড় করিয়ে রেখে যখন আমাদের সিরিয়াল এলো তার ঘন্টাখানেক আগেই সুয্যিমামা টা-টা জানিয়ে সটকে পড়েছেন। কিভাবে যে আধ হাঁটু কাদা মাড়িয়ে ছোটাছুটি করে ঘোড়া পেলাম আর মোবাইলের আলোতে সেটায় উঠলাম, সেটা আর নাইই বা ফেনাই। শুধু এদ্দুর বলবো, কুফ্রি ভ্রমন আমার এ যাবৎকালের সাইট সিয়িং এর ভয়ংকরতম এবং অবধারিতভাবেই জঘন্যতম স্মৃতি।

ঘোড়াওয়ালার হাতে মোবাইল টর্চ। সবচেয়ে সামনে তওসিফ, তারপর নিভা এবং তার পরেই আইমান, সবশেষে আমি। ঘোড়া হাঁটা শুরু করার দু’মিনিটের আগেই নিশ্চিত হলাম, আমি আবার আছাড় খেতে যাচ্ছি। মনে হওয়ার সাথে সাথে স্যাডল আবারও বামদিকে পিছলাতে শুরু করলো আর আমার ইঞ্জিনিয়ারিং এর পুরোনো একটা সূত্র মনে পড়ে গেল – টর্ক। সৃষ্টির আদি নিয়ম, ঘোড়া দুলবে এবং পিঠের ওপর বসা মনুষ্যরূপী গর্ধবটা পিছলে যাবে স্যাডল নিয়ে। ব্যালেন্সটা হল আপনার ওজন যে টর্ক তৈরি করে সেটাকে কাউন্টার ব্যালেন্স করবে স্যাডলের ফিতা কতটা শক্ত করে বাঁধা, তার ওপর। বাচ্চাদের ওজন যেহেতু কম, তাই স্যাডলে ঝুলে ধরে ব্যালেন্স রাখতে পেরেছে। কিন্তু ৭৫ থেকে ৮০ কেজি সামলানোর ক্ষমতা পাহাড়ি ঘোড়ার বাবারও নেই। এই কথা মনে আসার সাথে সাথে তাই আমি আবার পিছলে গেলাম। পাঠক, আম্মো সত্যি সত্যি গ্যাঁ…গ্যাঁ… অ্যাঁ…অ্যাঁ… স্বরে ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠেছিলাম এই প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও। ঘোড়চালক অসম্ভব বিরক্ত হয়ে আমাকে নামিয়ে দিল। মনে হয় গালিও দিল। দিক গে। জান তো বাঁচাই। শুরু হলো ঘোড়ার লেজ স্পর্ষ করে আমার ডাউনহিল হন্টন।

অনেক কথা বলে ফেলেছি। সংক্ষেপে শেষটুকু সারি। এবারও ওদের তিনজনের কেউই পড়েনি। আর আমি পায়ে হেঁটে নামতে গিয়ে দু’বার হড়কেছি কাদা পাথরে। পরবর্তী দু’দিন নিজেকে ঘোড়া বলে মনে হতো। কারণ ওই যে, অমোচনীয় দুর্গন্ধ।

কুফ্রি তথা মাহাসু পিক নিয়ে আমার সামারি মতামত হলো এত বেশি কষ্ট করে তেমন কিচ্ছু না দেখার অভিজ্ঞতা না নেয়াই ভাল। বরফ দেখা ছাড়া এখানে আরও কয়েকটা অ্যাকটিভিটি আছে। যেমন রোপ স্লাইডিং, প্যারাগ্লাইডিং, স্কিইং। আপনার ইচ্ছে আপনি কোনটা নেবেন বা আদৌ নেবেন কি না। খরচ দেড় থেকে সাড়ে তিন হাজারের মধ্যে ওঠানামা করে। আমরা যেমন কিছুই নেই নি কারণ মানালিতে এগুলো আছে। ঘোড়ায় চড়াটা একটা অভিজ্ঞতা হতে পারে। কিন্তু তার মাশুলও তো আছে ভাল রকম। এরপরও যদি আপনি সত্যিই যেতে চান তাহলে অনেক সকালে, এই ধরুন সাতটার আগেই হোটেল থেকে রওনা দিন। তাহলে রাস্তার ট্র‍্যাফিক আর স্টার্টিং পয়েন্টের ভীড় – দুটোই এড়াতে পারবেন। আর অবশ্যই মাহাসু পিক থেকে আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে ফেরার চেষ্টা করবেন। না হলে যে অশেষ দুর্গতি আপনার জন্য অপেক্ষা করবে সে জন্য কিন্তু আমাকে দুষবেন না পরে। ফেরার পথে ঘোড়া আপনাকে পিক এর কাছে যেই পয়েন্টে নামিয়েছিল ঠিক সেইখানে গিয়ে লাইনে দাঁড়াবেন। ওদের লোক থাকে। তার কাছ থেকে সিরিয়াল নিয়ে এবার আল্লাহ…আল্লাহ… করতে থাকুন।(চলবে)

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]