দিল্লী থেকে মানালি, বড্ড বেশি জ্বালালি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তওহিদ মাহমুদ হোসেন

 রঞ্জু, মঞ্জু, অঞ্জু

 মানালিতে ঢুকতে ঢুকতে সাতটা বেজে গেলো। লাঞ্চ তো হয় নি। তাই ড্রাইভারকে বললামঃ ডিনার করেই হোটেলে যাই, চলো।

ইন্ডিয়া অতি ভেজ ভক্ত জাতি। আর আমরা নন-ভেজ ঢাকাইয়া। বললাম, “থোড়া মাটন-ওয়াটন তো খিলাও ভেইয়া। দো দিন সে ইয়ে ভেজ চাবা চাবাকে লাগতা হ্যায় ম্যায় ভঁইসা হো গ্যয়া।” আমি ভুল করে বিফ উচ্চারণ করে যে ঠান্ডা দৃষ্টি দেখেছি ড্রাইভারের, আমার আত্মা শুকিয়ে গিয়েছিল। প্রিয় ভ্রাতা ও ভগিনি, দুঃস্বপ্নেও ভারতে গিয়ে গরুর মাংস উচ্চারণ করবেন না৷ অল্পমোস্ট প্রাণঘাতী৷ ব্যাপারটা ওদের কাছে অনেকটা এরকম – আপনি একজন কট্টর ইসলাম ধর্মালম্বীর কাছে গিয়ে যদি বলেন যে আল্লাহ বলে কিচ্ছু নেই, তাহলে সে যেরকম অনুভূত করিবে, এদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেকটা এর কাছাকাছি।

যাক, অন্য কথায় চলে এসেছি। মাটন খেতে চাই। কারন ঘাসপাতা খেয়ে আক্ষরিক অর্থেই তৃনভোজী লাগছে নিজেদের। তো ড্রাইভার আমাদের নিয়ে তুললো একদম বেসিক একটা ধাবায়। একদম সাদামাটা দোকান এক্সাকে বলে। আমার অতীত অভিজ্ঞতা বলে, খাবার এসব জায়গাতেই সবচেয়ে খাঁটি এবং স্বাদের হয়। আমাদের গাড়িতে বসিয়ে সে ভেতরে গিয়ে কি সব গুজুরমুজুর করে জানালো এটা একদম আম-আদমীদের জায়গা। তবে খাবার হবে একদম ‘মাস্ত’। আমরা এক কেজি মাটন রেজালার অর্ডার দিলাম। এক ঘন্টা লাগবে রান্না করতে। সমস্যা নেই। আমরা তখন মাংস ভক্ষণের জন্য ক্ষেপে উঠেছি। বসলাম গিয়ে ভেতরে।

ছোট্ট একটা দোকান। আগুন জ্বলছে বাইরে। একদল লোক ঘিরে বসে চা বা দারু খাচ্ছে। ভেতরে রাতের খাবারও সারছে কেউ কেউ। ঠিক ডল পুতুলের মত তিন বোন – অঞ্জু, রঞ্জু, মঞ্জু। এরাই মেশিনের মত এই খাবারের দোকানটা সামলাচ্ছে। এই চা বানায় তো ওই মাংসের মশলা পেষে। এ মাংস কোটে তো ও মোমো বানায়। এর মধ্যে খদ্দেরের ক্রমাগত আনাগোনা তো আছেই। এরকম জায়গায় আমরা আগেও খেয়েছি। বিশ্বাস করুন, ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন না থাকলেও খাঁটি রান্নার স্বাদটা আছে ষোল আনা। আপনি একবার শুধু ওইসব ফক্কা স্ট্যাটাসওয়ালা জায়গা ছেড়ে প্রলেতারিয়েতের লেভেলে নেমে গিয়ে দেখুন, কি যত্ন করে ওরা আপনাকে সমাদর করবে।

অশোক হচ্ছে এই দোকানের মালিক। নেপালী। ওরই তিন মেয়ে। রীতিমত লাইসেন্সড এবং ট্যাক্স দিয়ে সার্টিফাইড ফুড ভেণ্ডর। দোকান আর ঘুমানোর ঘর আগে আর পিছে। একসঙ্গেই সব। পিছনে গর্জন করে বয়ে চলেছে বিয়াস। দোকানে একেরপর এক চাচ্চা অথবা দাদ্দু অথবা ভাই আসছে। বোঝাই যায় সবই নিয়মিত খদ্দের, এক আমরা ছাড়া। আমাদের পেয়ে অশোকের পরিবার আক্ষরিক অর্থেই হাতে চাঁদ পাওয়ার মত খুশি। মেয়ে তিনটে ফটাফট ইংলিশ বলছে। শিক্ষিত যে জানলাম একটু কথা বলতেই। সবাইই স্কুলে যায় বা পড়া শেষ। আমাদের সামনেই পুরো রান্নার প্রসেসিংটা হলো। এক ঘন্টাই লাগলো। এরপর গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের মধ্যে টাটকা মাটন রেজালা সঙ্গে ডিম সেদ্ধ। মাই…মাই…।  এ স্বাদ একমাত্র আলী সাহেবই পারতেন বর্ণনা করতে। আমি অক্ষম লেখক। শুধু বলতে পারি, এই স্বাদ অতুলনীয়।

দোকান পাহারা দেয় বিশাল এক সাদা লোমশ কুকুর। আমাদের উচ্ছিষ্ঠ হাড় ওকে খাওয়ালো আইমান। কি যে শান্ত কুকুরটা। আর এত বেশি কিউট।

নিশ্চয়ই জানতে ইচ্ছে করছে আমরা কতটুকু খেয়েছিলাম? ওয়েল, য়্যু নো, উই ওওর হাংরি অ্যান্ড দ্য মাটন ঔজ প্রিপেয়ার্ড ডেল্লিশ্যাসলি। সো, পুরোটাই চেটেপুটে সাবড়ে দেয়া গেল অবলীলায়। দাম? হুম…। এক কেজি খাশির মাংস, মশলা, রান্না করা,  ছ’টা বয়েলড ডিম, তিনটা কোক, অপর্যাপ্ত ভাত, স্পিন্যাচ, পানি, আচার, স্যালাড এ’সব মিলিয়ে ৯৬০ রুপি। কী? বেশি হলো? ম্যান, ইটস গড ড্যামন চিপ। আর আন্তরিকতাটা এবং পারিপার্শিকতাটার দাম কিভাবে হিসেব দেবেন? ফেরার পথে নিভা দু’বোনকে জড়িয়ে ধরলো। ওরা এরকম ব্যবহার মনে হয় আগে খুব বেশি পায় নি। ছাড়তেই চাইছিলো না কেউ কাউকে।

এইখানে একটা জিনিস শিখলাম, জানেন? আকাশ থেকে বরং মাটিতেই অনেক বেশি ভালবাসা, বেশি আনন্দ, বেশি শান্তি এবং বেশি সমাদর। ঢাকার ওই বহুলচর্চিত রেস্টুর‍্যান্টের একঘেয়ে প্রিজার্ভড খাবার আর তাদের পরিবেশনকারীদের কষ্টার্জিত আরোপিত হাসির থেকে এই গ্রাম্য, গরীব মেয়েদের রান্না ও পরিবেশনায় এক্স ফ্যাক্টরটা অনেক, অনেক বেশি জোরালো। তাই আমরা এই স্বাদ ভুলবো না কক্ষোনো।

এই লেখাটা লিখছি গ্যাজলিং ইন শুয়ে। আমাদের মানালির হোটেল। টেরেসে দাঁড়ালে পাহাড়ের গায়ে বিছানো মানালির একাংশ দেখা যায়। আকাশ জোড়া তারা। আবার কিছু কিছু মেঘ। ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া বাংলোগুলোয় তারার মতই মিটমিট জ্বলছে। আসলে স্রষ্টা যখন নিজেই সাজান তখন আমরা মূক হয়ে যাই সেটার সামনে।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]