দিল্লী থেকে মানালি, বড্ড বেশি জ্বালালি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

তওহিদ মাহমুদ হোসেন

বরফের ঘাড়ে বসে ঘুরতে বেরিয়েছে রোদ্দুর

ওপরের লাইনটা একজনের লেখা থেকে ধার করা। কবির নামটা এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। তবে হেডিং হিসেবে বড্ড জুৎসই। রোদ্দুর ছিলো। সে বেরিয়ে বা পালিয়ে গেছে। এখন তাকে খোঁজো বরফের মধ্যে। আমরা সেই কাজটাই করতে যাচ্ছি আজ। কিন্তু সবচে’ আগে মানালি নামটা কিভাবে এলো, সেটা বলি। হিন্দু ধর্মের বিখ্যাত আইনপ্রণেতা ‘মনু’র সঙ্গে মানালি জড়িয়ে আছে। বলা হয়ে থাকে মানালি আসলে মনু আলয়, মানে মনুর বাড়ি বা বাসস্থান। এখানে মনু থাকতেন বলেই এর নাম মানালি।

এখানে আসার আগে ফ্রিজের আইসচেম্বার ছাড়া আমি বরফ সামনাসামনি দেখিনি। সেটা দেখার জন্যই মানালির এই মাইনাস দশ ডিগ্রিতে আসা। বরফদর্শনের আগে হোটেলে আমার ত্রিমুখী দিব্যদর্শন হলো। পয়লাটা হলো শরীরের নাম মহাশয়, তবে অবস্থা সাপেক্ষে। পরেরটা হলো দাম্পত্যপ্রেম ঠান্ডায় কষটে যায়। আর তিন নম্বর হলো ঢিলা-কুলুখ।

প্রত্যেকদিন গোসলের অভ্যাস। মানালিতে সেটার কল্পনাও বিভীষিকা। বাথরুম দেখলে মনে হয় হন্টেড হাউজ। তাই একই ইনার পরে দিব্যি চার-চারটে দিন কাটিয়ে দিলাম। কি বললেন? গায়ের গন্ধ? আরে ধুর মশাই। মাইনাস ১০° এ গোবরের গন্ধও মেশক-এ-আম্বর। মনে রাখবেন, এইখানে রুম হিটার ইনবিল্ট নয়। আপনাকে ডেইলি বেসিসে তিন বা চার’শ রুপিতে ভাড়া করতে হবে। দরদাম করবেন, বুঝেছেন? প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে আমার হিমশীতল পা ম্যাডামের অপেক্ষাকৃত উষ্ণ পায়ের দিয়ে অটোম্যাটিক ধেয়ে গেলো। ছোঁয়া লাগতেই খ্যাঁক – “ইশ্…কি ঠান্ডা রে বাবা। অ্যাই…। পা সরাও।” মানালিতে উত্তাপ শেয়ারড হয় না। তাই সংসার টেকাতে ঘুমানোর সময় পশমের মোজা পরুন। না হলে মার অবধারিত। ঢিল ও কুলুখ কেন লাগে সেটা কি আর ব্যাখ্যা করতে হবে? শুধু এইটুকুই বলি, সমস্ত কলে গরম পানির ব্যবস্থা থাকলেও হ্যান্ড শাওয়ারে তো আর সেটা করা যায় না। ওয়াটার জেট আপনার আঙ্গুল এবং আঙ্গুলের উদ্দিষ্ট স্থান স্পর্শ করার ঠিক পাঁচ সেকেন্ড এর মধ্যে দু’টোই অসাড় হয়ে যায়। যেহেতু পাঁচ সেকেন্ডে ওই বিশেষ কর্মটি সমাধা করা যায় না এবং এর মধ্যেই সাধ ও সাধ্য দু’টোরই খেল খতম, তাই জানের তাগিদে একটা উপায় বের করেছিলাম। ইঞ্জিনিয়ার তো। কুবুদ্ধি একটা না একটা এসেই যায়।

তো এই ত্রিমুখী জ্ঞান নিয়ে মানালিতে আমাদের প্রথম রাত্রিবাস। মাইনাস ৯ ডিগ্রীতে বরফ নিয়ে খেলু, খেলু করতে এসেছি আর তার বাম্বু খাবো না, এ তো হতে পারে না। তো চলো বরফ দেখবো। সেটাই দেখলাম আজ সোলাং ভ্যালিতে। অনেকের জন্য হয়তো মা’র কাছে মাসীর গল্পের মত শোনাবে। মনে হবে, বরফ দেখে দেখে ঘুন হয়ে গেলাম আর এই ছাগল এসেছে একদিনের গল্প শোনাতে। যত্তসব আদিখ্যেতা! না পাঠক, ভয় নেই। আমি আমার স্বল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনাদের কাছে ফেনাতে বসিনি। আসলে আমার এ অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা; এই শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্যের সামনে মূক হয়ে যাওয়ার অবস্থাটা না বলতে পারা পর্যন্ত শান্তি পাব না।

আমার ছোট ছেলে তওসিফ জিজ্ঞেস করছিল – “বাবা, তুমি এইসব ট্র‍্যাভেলগ না কি ছাতা, এইসব লেখ কেন? টাকা পাও?” আমার উত্তরটা ছিলো এরকম – প্রথমত আমার লিখতে ভাল লাগে বলেই আমি লিখি। কেউ পড়ুক আর নাই-ই বা পড়ুক। আর আমার লেখা পড়ে যদি কেউ আনন্দ পায় অথবা অনেকে যারা এখনও এইসব অভিজ্ঞতা নেয় নি, তারা যদি কিছুটা আন্দাজ পায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগ। এই দু’টো কারণেই আমি লিখি।

মানালির এই ‘সোলাং ভ্যালি’ জায়গাটাতেই প্রায় সবাই-ই বরফ দেখতে যায়। ‘আমটা পাস’ বলে আরেকটা জায়গা আছে; আরও উঁচুতে। কিন্তু ডিসেম্বরে সোলাং ভ্যালিতেই যথেষ্ঠ বরফ থাকে। কারও কথায় প্ররোচিত হয়ে অতিরিক্ত খরচ করে ওখানে যাওয়ার দরকার আছে? আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের তো কোন শেষ নেই। সেটা সোলাং এ এক রকম। আমটা পাসে এক রকম। রোতাং পাসে আরেক রকম।

আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো বরফে গড়াগড়ি খাওয়া – খেয়েছি। আমাদের ইচ্ছে ছিলো বরফে মাথা ডুবিয়ে থাকা – থেকেছি। আমরা বুক ভরে ঠান্ডা বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে চেয়েছিলাম – নিয়েছি। আমাদের প্ল্যান ছিলো স্নো-বল ফাইট করা। প্রায় তিন ঘন্টা ধরে আমরা সেটা করেছি এই সোলাং ভ্যালিতেই। আর এই শীতের সময় রোতাং পাস বন্ধ থাকে। তবে আমতা পাসে যাওয়া যায়। এখান থেকেই কিন্তু থ্রি ইডিয়টসের সেই অসাধারণ যায়গাটা যেটায় ফুংসুখ ওয়াংড়ু তার আস্তানা বানায় সেই লাদাখ লেহ-তেও যাওয়া যায়। কিন্তু সেটার জন্য আলাদা প্ল্যান লাগবে।

মানালিতে এই সময়ে অসংখ্য ট্যুরিস্ট। রাস্তা যেহেতু একটাই সুতরাং ভয়াবহ ট্র‍্যাফিক জ্যাম; সেই শহর থেকে ভ্যালি পর্যন্ত। সুতরাং একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টের পর হয় অশ্বারোহন নয় হন্টন। কুফ্রির পর ঘোড়া শুনলেই আমরা আঁতকে উঠি। শুরু হলো হাঁটা এবং টের পেলাম, মেঘে মেঘে বেলা ভালই গড়িয়েছে। ফিটনেস শূন্য। খাড়াই উঠতে গিয়ে দশ পা চলি আর দু’মিনিট কুকুরের মত হ্যাহ হ্যাহ করে হাঁপাই। ফিটনেস বলে কিচ্ছু আর বাকি নেই। ভুঁড়ি টান করে স্টাইল মারা যায় বস, পাহাড়ে কোন মাফ নেই। নিভা যে দুই আড়াই কিমি হেঁটে উঠেছে তার কৃতিত্ব অবশ্যই ধর্মেন্দ্রর। এ আমাদের প্যাঁকাটির মত গাইড। সে প্রায় টেনে টেনেই অনেকটা জায়গা পার করেছে নিভাকে। নায়ক নামের এমনই গুণ।

বরফের উপযোগী পোষাক পরাই ছিলো। অনেকটা অ্যাস্ট্রোনাটের মতো। পার্থক্য কেবল পাছার কাছটাতে এক টুকরো একস্ট্রা মোটা কাপড় লাগানো। সোলাং ভ্যালিতে গড়াগড়ি শেষে বুঝতে পেরেছি কেনো এই আলাদা ডায়াপার।

ভ্যালিতে পৌঁছালাম।

এক কথায় অপূর্ব। তিন চার হাত, কোথাও এক কোমর বা তার বেশিও হতে পারে, বরফ জমে আছে। অন্য জায়গা চেক করা রিস্কি। হুশ করে দেবে গেলাম বরফে। তখন বাঁচাবে কে? থেকে থেকে ক্রিসনাস ট্রি। দূরে সুউচ্চ শৈলশিরা। মাথায় তাদের ঝকমকে বরফের মুকুট। ঈগল বা চিল উড়ছে ঝাঁক বেঁধে। অল্প ঢালু পাহাড়ে টেরেস ফার্মিং যেন ঘন সবুজ ভেলভেট বিছানো। ছবির মত সাজানো বাড়িগুলো ধাপে ধাপে সাজিয়েছে এরা। এই সৌন্দর্য লিখে প্রকাশ করতে হলে বিভূতিভুষণ হতে হবে। আমরা স্কিইং করলাম, ছবি তুললাম, এ ওর মাথায় বরফের ঝুরি ফেললাম, মাথা বরফে ঠেসে ধরমাল, গড়াগড়ি খেলাম, বরফের গোলা মেরে কোমর ভাঙ্গবার জোগাড় করলাম এবং অসংখ্যবার আছাড় খেলাম। কিন্তু প্রত্যেকটাই অসাধারণ থেকে অসাধারণতর হয়ে এলো যেনো। এখানে একটা খোলা চত্বর আছে। সেইখানটাতেই যতো হট্টগোল। আমি একটু পাশে সরে গেলাম। বাহ্…! এখানে তো কেউ নেই। বুক ভরে বাতাস টেনে নিতে নিতে মনে হলো, আমার জন্ম সার্থক। এই দৃশ্য স্রষ্টা আমাকে কোনদিন দেখাবেন, কল্পনাও করিনি। আজ আমি রাজাধিরাজ। আপনা থেকেই মাথা নুয়ে এলো কৃতজ্ঞতায়।

সোলাং ভ্যালির ট্রিপের প্রস্তুতি আপনি নিচেও নিতে পারেন আবার ভ্যালিতে যাওয়ার পথেও অনেককে পাবেন যারা বুট-কোট-দস্তানা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা যেখান থেকে নিলাম সেখানে কয়েকটা প্যাকেজ অফার করলো। এই যেমন স্কিইং, প্যারারাগ্লাইডিং, রোপ স্লাইডিং, ইয়াকে করে বেড়ানো – এইসব আর কি। এগুলো ওপরেও নেয়া যায় আলাদা আলাদা করে অথবা কম্বিনেশন করে। না নিলে গাইডের একটা বাড়তি চার্জ করবে।যেটা কম নয়। পোষাকের চার্জ আড়াইশ রুপি। আপনার মোটা উলের মোজা না থাকলে অবশ্যই কিনে নিন। না হলে পা জমে যাবে। গাইডের ব্যাপারটা আমার কাছে ধাপ্পা ছাড়া আর কিছু মনে হয় নি। ওর কাজ হলো পথ দেখিয়ে নেয়া যেটা এক্কেবারে অনর্থক। কারন পথ তো একটাই আর সেটা দিয়ে কাতারে কাতারে লোক যাচ্ছে। ও শুধু আমাদের ছবি তুলে দিয়েছিলো মাঝে মাঝে যেটা আসলে নিজেরাই করা যায় একটা সেল্ফিস্ট্যান্ড থাকলে।

মোদ্দা কথা হলো, আপনি শুধু ড্রেসটা ভাড়া নিতে পারেন। এরপর ওপরে উঠে দেখেশুনে ঠিক করবেন কোন রাইডটা নেবেন বা আদৌ নেবেন কি না। আনলিমিটেড স্কিইং শুনতে যতটা রোমহর্ষক, বাস্তবে তারচেয়ে অনেক, অনেক বেশি ঘাম-কর্ষক। মানে ঘামিয়ে ছাড়বে। দু’চার মিনিট করা যায়, তা-ও গাইডকে ধরে ধরে। ঘেমে নেয়ে যাবেন। আরে বাবা, এ তো আর হলিউডি সিনেমা নয় যে চাইলেন আর শাঁ শাঁ করে স্কি করে গেলেন। মারাত্মক ব্যালেন্স লাগে। ধড়াদ্ধড় লোকে আছাড় খাচ্ছে। আম্মোও খেয়েছি চার বার, মোট দশ মিনিটের মধ্যে এবং তারপর ক্ষ্যান্ত দিয়েছি।

নামার পথটা আসলে ঘোড়া চলাচলের। যেই রকম কাদা, সেই রকম গন্ধ আর তারচেয়েও বেশি পিচ্ছিল। আমার সামনেই স্কিনি জিন্স আর হাইবুট পরা এক সুবেশী তন্বী উপুর্যুপরি তিনবার হড়কালো। ঘোবর মেখে একশেষ। তার সঙ্গী প্রথম দু’বার তো চুপ। এরপর পেট চেপে ঠা ঠা করে হাসি আর থামাতে পারে না। আমার বউ তো আবার মানবদরদী। সে এগোচ্ছিল মেয়েটাকে তুলতে। আটকালাম। নিজের ব্যালেন্সই থাকে না। এই শরীর নিয়ে পড়লে তো ল্যান্ডস্লাইড হবে। জনসেবার অনেক জায়গা আছে, ঘোড়ার গোবরের মধ্যে নয়।

ও হ্যাঁ। প্যান্টের পিছনে মোটা কাপড় কেন লাগানো বলি এবার। সেটা যখন পোষাকটা খুলবেন, তখনই টের পাবেন। এতক্ষন তো বরফে থেবড়ে বসে খেলছিলেন। সেই পানি মোটা কাপড়ের ব্যারিকেড ভেদ করে, জোব্বার আবরন অতিক্রম করে, আপনার জিন্সের মোটাত্বকে কচু দেখিয়ে, ইনারকে চুটকি মেরে একদম অন্দরমহলে পৌঁছে গিয়েছে এর মধ্যে। এইজন্য ফেরার পথে অনেককেই দেখবেন পেছনটা ভেজা। যেন একপাল হিশু করা শিশু; সোলাং ভ্যালিতে মুত্র-বিসর্জন করে এলো। ওই মোটা কাপড়টা না থাকলে ঠান্ডায় ভেতরের সবকিছু (!!!) জমে যেত, বুঝলেন?

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]