দিস বিউটিফুল লেডি ইজ আ টেররিস্ট !

এক ইংরেজ পুলিশ অফিসার তাঁর ছবি দেখে মন্তব্য করেছিলেন, ‘ডিসগাস্টিং, দিস বিউটিফুল লেডি ইজ আ টেররিস্ট! আই ডোন্ট বিলিভ। ইউ অল আর ননসেন্স।’

কল্পনা দত্ত

চট্টগ্রামের বাড়িতে থাকতেই দেশপ্রেমের আদর্শের বীজ বপন হয়েছিলো। কলকাতায় বেথুন কলেজে পড়ার সময় তা ক্রমে ভিন্ন অবয়ব নেয়।ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ইংরেজ পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিলো তাঁকে। পুলিশের খাতায় তিনি ছিলেন ‘terrorist’, বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ। তিনিই আবার বিজ্ঞানের একনিষ্ঠ ছাত্রী। তাঁর রূপে ‘মোহিত’ হয়ে গিয়েছিল পুলিশরা।এই নারীর নাম কল্পনা দত্ত। জন্মেছিলেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। হয়ে উঠেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অসাধারণ যোদ্ধা। গত ৮ ফ্রেব্রুয়ারী ছিলো তাঁর মৃত্যুদিন।

১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। চট্টগ্রামের আদালত চত্ত্বরে লোকনাথ বল, অনন্ত সিংসহ আরো অনেকের আদালতে হাজিরা দেওয়ার কথা। পুলিশ কর্তাদের কাছে খবর ছিলো হামলার পরিকল্পনা নিয়ে। দায়িত্বে আছেন কল্পনা দত্ত। পুলিশ ভ্যান বেরোনোর ঠিক আগে ভিড়ের মাঝে দেখা গেলো বোরখা পরিহিত এক মুসলিম মহিলাকে। তাঁর লম্বা শরীরিক গঠন বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছিলো পুলিশের। মহিলা পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলেছিলো গোটা এলাকা। আদালতের গেটেও বসানো হয়েছিলো পাহারা। কিন্তু ঘেরাও কেটে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন কল্পনা। এবারও ধোঁকা। মুসলিম নারী নয়, লাঠি হাতে বেড়িয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধার ছদ্মবেশে  ছিলেন কল্পনা।

সূর্য সেন

আদালত চত্ত্বরে সেদিন পাওয়া গিয়েছিলো মারাত্মক বিস্ফোরক গান কটন। কার্পাস তুলোর ওপর নাইট্রিক অ্যাসিডের মিশ্রণ দিয়ে তৈরি এই গান কটন ডিনামাইটের মতো কাজ করতে সক্ষম ছিলো। বিজ্ঞান এবং বিপ্লবের চেতনার মিশ্রণ। বোমা তৈরি করেছিলেন কল্পনা নিজে। পরিকল্পনা ছিলো এই গান কটন দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বন্দিদের মুক্ত করা। যে বিস্ফোরকের ভয়ে বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ থেকে শুরু করে ফরাসি সেনারা কেঁপে যেতো, তা পোশাকের মধ্যে করে জেলে সরবরাহ করেছিলেন কল্পনা দত্ত।

ক্ষুদিরামের শহীদ হওয়ার কাহিনী,কানাইলাল দত্তের বীরগাথা গভীর ভাবে অনুপ্রানিত করেছিলো তাঁকে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝঁপিয়ে পড়তে। পুলিশ জানতো মাস্টার’দা সূর্য্ সেনের  ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির সদস্য কল্পনা। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন কেসে গ্রেফতার হওয়া রিপাবলিকান আর্মির সদস্য অনন্ত সিং,লোকনাথ বল,গণেশ ঘোষদের সঙ্গে একাধিকবার জেলে এসে সে দেখা করেও গেছেন এই দুর্ধর্ষ নারী।  কখনও কারও স্ত্রী সেজে, কখনও বা বোন হিসাবে। পুরুষ সেজেও জেলে এসে খবর দেওয়া নেওয়া করতেন তিনি। কিন্তু ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ভাষায়, সুন্দরী ‘আতঙ্কবাদী’-র বিষয়ে সব জেনেও তাঁকে ধরাটা ছিলো কঠিন। কল্পনার বাড়ির বাইরে গুপ্তচর রেখেও কিচ্ছু করতে পারেনি পুলিশ। রাতবিরেতে বিপ্লবীরা আসতেন তাঁর বাড়িতে। তাদের ধরতে কয়েকবার অনুসরনও করেছিলো ব্রিটিশের চর। কিন্তু সবার চোখে ধূলো দিয়ে কল্পনা দত্তের নিখুঁত পরিকল্পনায় বাতাসে মিলিয়ে যেতেন বিপ্লবীরা।

সূর্য্ সেন কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদাকে স্থান দিয়েছিলেন তাঁর বাহিনীতে। অদম্য সাহস,বন্দুক পিস্তলে নিখুঁত নিশানা ছিলো কল্পনা দত্তের। নতুন বিপ্লবীদের হাতে করে বিস্ফোরক তৈরিও শেখাতেন তিনি।

১৯৩২ সাল। ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করেন সূর্য্ সেন। আক্রমণের অন্যতম ‘মাস্টার মাইন্ড’ ছিলেন কল্পনা। দায়িত্ব ছিল ছদ্মবেশে ক্লাবে ঢুকে পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখে আসা। পুরুষের ছদ্মবেশে ক্লাবে ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন। অনাহুত হিসাবে পুলিশ গ্রেফতার করেছিলো পুলিশ। কথা বের করার জন্য অকথ্য অত্যাচার থেকে শুরু করে মহিলা পুলিশ দিয়ে দৈহিক নির্যাতন কিছুই বাদ যায়নি। কিন্তু একটি কথাও বের করা যায়নি কল্পনা দত্তের মুখ থেকে। টানা ২ মাসের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলো।

আবারো ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি গইরালা গ্রামে মাস্টারদার দলের নতুন বৈপ্লবিক পরিকল্পনার সময়ে পুলিশ ঘিরে ফেলে পুরো দলটাকে। শুরু হয় লড়াই। সে যুদ্ধে কল্পনা দত্ত পালিয়ে যেতে পারলেও ধরা পড়েন সূর্য্ সেন। অনেক পরে শেষ পর্যন্ত কল্পনাসহ গোটা দল ধরা পড়ে পুলিশের হাতে।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরক, হত্যা নানা অপরাধে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির আদেশ হয়। মহিলা এবং বয়স কম। সম্ভবত সেই কারনেই কল্পনা দত্তের ফাঁসি হয়নি। বিচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় তাঁকে। জেলে বসেই শুনেছিলেন মাস্টারদার ফাঁসির খবর। ১৯৩৯ সালে জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দেন। গরীব প্রান্তিক মানুষদের জন্য কাজ করেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। যুদ্ধ,দাঙ্গা,রোগ মহামারী, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মানুষের পাশে ছুটে যেতেন বারবার। ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পরলোক গমন করেন মহীয়সী নারী কল্পনা দত্ত।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ বাংলা লাইভ, কলকাতা

ছবিঃ গুগল