দুই কবির ৬ কবিতা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

সাবরিনা শারমিন চৌধুরী

 সাবরিনা শারমিন চৌধুরী’র তিনটি কবিতা  

ছত্রিশ

নভেম্বরের সূর্য হলো অগ্নিসাক্ষী

বসন্ত হাওয়ায় বকুল ফুল বলছিলো তাহার নাম

একটি পরিমিত চুম্বন আগুন জ্বেলেছিল নিমগ্ন হবার ক্ষণে

গন্তব্যহীন দীর্ঘ পথের শেষে

হৃদয়ে পারিজাত নেচেছিল উল্লাসে

পরিপূর্ণ প্রথম প্রণয় এসেছে তখন

ছত্রিশের তপ্ত নিঃশ্বাসে।

ছত্রিশের আগুনে পুড়েছে পরিতাপ

মনের ঈষাণ কোণে ছিলো জমা যত।

ছত্রিশের আলিঙ্গনে পরিশুদ্ধ দেহ

বিষ পোকার আবাসে যেথা ছিলো ক্ষত শত।

পরিযায়ী

খুব একলা লাগা মনউদাস দুপুরে

আমি পরিযায়ী পাখি হবো।

ঠিক দেখো পৌঁছে যাবো

নীল কোবাল্টের মতো শান্ত সেই হ্রদটির কাছে

কিংবা দুঃখ হারিয়ে ফেলা নীলচে পাহাড়ের কোলে।

ঠিক খুঁজে নেবো সেই বেলাভূমি, আর

শিকার ভুলে যাওয়া ঈগলটা।

খুঁজে নেবো পাগলা হেনরির বরফে ঢাকা কেবিন, কফির ধোঁয়া –

যেখানে আমাদের যৌথ জীবনের গল্প আছে জমা।

ঠিক দেখো পৌঁছে যাবো, তোমার কাছেই

তোমার গভীর খয়েরী ভিনদেশী চোখে

আবারও খুঁজে নেবো

আমার প্রহ্লাদী ভালোবাসা স্বপ্নসমেত।

 ভালোবেসে  নত  হও  মেয়ে

কখনো কখনো রুখে দাঁড়িও

কখনো কখনো প্রতিবাদে সংক্ষুব্ধ

কখনো শ্লোগানে মিছিলে গর্বিত রাজহংসী।

তবে, কখনো একবার ভালোবেসে নত হও মেয়ে।

বকুলের ঘ্রাণে ডুবিয়ে রেখো ক্লান্ত হৃদয়।

একবার হেঁটে যেও হিজল বিছানো পথে।

কখনো একবার প্রেমে পড়ো দহনের ক্ষত ভুলে।

একবার বুকে ধরে রেখো এক চিলতে রোদ্দুর।

আর একবারমাত্র ভালোবেসো কিশোর ছেলেটিকে

তোমার সুগন্ধি প্রেম বাজী ধরে হারিয়েছে যে

ভালোবাসার হাওয়াইন গিটার।

সা’দ জগলুল আববাস

সা’দ জগলুল আববাস এর তিনটি কবিতা   

 পরিব্রাজক

তোমাকে খুঁজতে যতোবার আমি সমুদ্রের কাছে গিয়েছি

ততোবারই,হারিয়েছে বোধ,

অস্তিত্ববিহীন এক পরাবাস্তব জীবনের মতো-

আমি যেন তার বুকে অস্পৃয়মান লাইট হাউজের নিঃস্বতা;

অথচ তুমি বলেছিলে হারিয়ে গেলে তোমাকে সমুদ্রেই পাবো।

সমুদ্রের বিস্তৃতিতে বার বার নিজেকে অনাবৃত করেছি-

সমুদ্রেরই মতো,

বালিয়াড়ির মতো বিলীন হয়েছি ভাটার টানে,

উত্তুঙ্গ ফেনিল জলরাশির আহত গোঙানি অবিরাম বাড়ি খেয়ে গেছে নিস্পৃহপাহাড়ের গায়ে!

তোমার জন্য আকাশ আর মেঘের ছায়ায় প্রতিবার সমুদ্রে ভাসি-

আমার নগ্ন শরীর কুরে খায় নীল বিষের মতো লোনা জল;

বুক চিরে দিয়ে যায়,

পূর্ণিমায় ভাসানো অভিশপ্ত জাহাজের নোঙ্গরের ফলা-

শূন্যের পরিব্যাপ্তি জুড়ে সৈকতে পড়ে থাকি-

তোমার খোঁজে আমি আর ক্ষুধার্ত গাংচিল;

দূরে অস্পষ্ট আলোর বৃত্তে অবিরাম পাক খাওয়া

বধির অসহায় দিকহীন এক প্রাচীন বাতিঘর আর পরিব্রাজক সন্ধ্যাতারা।

যদি হয় সমুদ্রের কাছে কালের দেউলিয়াপনা,

তা’হলে তুমি কোথায় ?

সমুদ্র ছুঁয়ো না

সমুদ্র ছুঁয়ো না পথিক, তুমি কলংকিত হবে;

এ তোমার ভুবন মাঝির পানসী দোলানো পাঁজরের কুলুঙ্গীতে রাখা পড়শী নদী না,

অথবা বটের ছায়া ঘেরা বিনুনি খাল বা শাপলার পটভূমে জলরংয়ে আঁকা পদ্মদিঘীও না;

এর জলজ পাড়ে আটপৌরে ভাঁটফুলের শুভ্রতা নেই, গুলমোহরের হোলি খেলা নেই-

এর জলে সাঁঝে ঘরে ফেরা কুসুমের হাঁসগুলোর নিশ্চিন্ত সাঁতার নেই-

নেই রূপালি ছাদে পূর্ণিমার ভেঙে ভেঙে যাওয়া খুনসুটি-

নেই পাড়ের আম আর বটের শাখে ডাহুকের বিষাদ মধ্যাহ্ন কিংবা শালিকের সাথে ফিংগের কানামাছি খেলা-

বা,আতপ জলে রুই কাতলার ঘাঁই দেয়া নির্জন দুপুর ।

সমুদ্র ছুঁলে কলংকের ভাগীদার হবে , পথিক;

মানবাধিকার লংঘনের দায়ে তুমি অভিযুক্ত হতেই পারো-

সমুদ্র ছুঁয়ো না, পথিক।

তুমি কি দেখনি ওর শরীরের পরতে পরতে জমে আছে মহাকালের ক্লেদ,

এর সফেদ বেলাভূমে আলোর আশে জীবনের মুক্তি পেয়ে গেছে কতো লক্ষ প্রাণ-

কান পেতে শোন , পথিক…

দিগন্ত হতে যাযাবর লোনা বাতাসে ভাসে ডানাভাঙ্গা এ্যালবেট্রসের আর্তনাদ,

তপ্ত বালু মুড়ে পড়ে আছে হৃদয় কুরে খাওয়া অগুনতি আশাহত উচ্ছিষ্ট পাজরের খোল,

মৃত কাঁকড়া আর শামুকের পাশে;

নৃশংসতার রক্ত মেশানো ঢেউয়ে

বার বার  মানবতা প্লাবিত হয়েছে নির্বিকার মূঢ় সৈকতে।

পথিক, পাড় ধরে হেঁটে যাও কিন্তু সমুদ্র ছুঁয়ো না কখনো কোনই ছুতায়,

তোমার বোধ কলংকিত হবে,

তুমি অভিশপ্ত হবে-

সৈকতের বালুচরে নীড়হীন নিরীহ গাংচিলের মতো।।

ইচ্ছে ঘুড়ি

জীবনের না ছোঁয়া সমস্ত কাব্যশৈলী আচারের বয়ামের মতো রোদের আঁচে দিয়ে রেখেছিলাম-কখনো কবিতা লিখবো;

অদৃশ্য কালিতে লিখে রাখা সমস্ত কবিতা দিয়ে আমি পঁচিশটা প্রমান সাইজের নোটবুক ভরেছিলাম-কখনো কবি হ’বো।

বিশ্বাস করো কোথায়ও আমার আন্তরিকতা এবং সততার এক চিলতে খামতি ছিলো না-

নিউরনের কোষে পিঁপড়ের মতো কুচকাওয়াজ করে গেছে আমার কবিতার বোধ;

বুকের পাঁজরে কবিতার পংক্তির ধাপের পর ধাপ গাঁথুনি হয়েছে,

আমাদের জন্য অথবা শুধু তোমারই জন্য;

এতটা কাল রোদ মুড়ে রাখা বয়ামের আচারের মতো মনের ভিতরে কাব্যের গাঁজন প্রক্রিয়া চলেছে অনবরত;

নোট বইগুলোর পাতার পর পাতা উল্টে গেছি পলে পলে-

পাতার শব্দগুলো ছিলো বুকের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়া রঙিন কাঁচের মার্বেলের টুপ টাপ নাচানাচি- সবই ছিলো কবিতা লেখার পটভূমি।

আজ ঠিক রাত বারোটা সাত মিনিটে আমি নতুন চকচকে ছাব্বিশ নম্বর নোট বইটা হাতে নিলাম,

কলমে নীল কালি ভরে তৈরী রেখেছি সেই সন্ধ্যা কালেই-আজ কবিতা লিখবো।

আমি জানি একটা স্পষ্ট কবিতা আমাকে দেবে বয়ামে রাখা টক-ঝাল-মিষ্টি আচারী সুখ,

এই একটা কবিতা যদি শেষ করতে পারি,

ঝেড়ে মুছে রাখা পঁচিশটা নোট বইয়ের পাতা জুড়ে

অদৃশ্য কবিতার ডানা ঝাপটানো শূককীটগুলো

ম্যাজিকের মতো স্পষ্ট হবে আমার বুকের ভিতর।

অথচ আমি স্থানুর মতো বসে আছি, অনড় অবশ – স্নানুর কোষে পিঁপড়ের চলাফেরা নেই;

টেবিলে খোলা পড়ে আছে অক্ষত ছাব্বিশ নম্বর নোট বই আর খাপ খোলা কলম –

এক মিনিট দু’মিনিট করে রাত ভোর হয়ে গেছে ,

কিন্তু আমি ঐ কবিতার একটা পংক্তিও লিখতে পারিনি।

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]