দুই ট্র্যাজিক হিরোর বিদায়

শামসুল আলম মঞ্জু
আমেরিকা প্রবাসী

একদা বাংলাদেশের ফুটবলের সোনালী সময়ের খ্যাতিমান ফুটবলার শামসুল আলম মঞ্জু। বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ দেখে প্রাণের বাংলার পাঠকদের জন্য প্রবাসী এই কৃতী ফুটবলার মন্তব্য প্রতিবেদন পাঠাচ্ছেন সুদূর আমেরিকা থেকে।

একে অঘটন না বলে নক্ষত্রের পতন বলাই ভালো। রাশিয়ায় একই দিন সন্ধ্যায় প্রথমে বিদায় নিলো মেসির নীল-সাদা বাহিনী। আর রাতে তাকে অনুসরণ করলো রোনালদোর দল পর্তুগাল। ফুটবল ভক্তদের অনেকেই হিসাব কষেছিলেন আর্জেন্টিনা ফ্রান্সকে হারালে এবং পর্তুগাল উরুগুয়েকে হারাতে পারলে বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হবেন বর্তমান ফুটবলের দুই মহাতারকা লিওনেল মেসি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ৷ আশায় বুক বাঁধছিল গোটা ফুটবলবিশ্ব৷ কিন্তু সব আশায় ছাই দিয়ে এবারের বিশ্বকাপকে বিদায় জানালো এই দুটি দল।

প্রায় খোঁড়াতে খোঁড়াতে নক-আউট পর্বে উঠে এসেছিলো আর্জেন্টিনা। দলটির সমর্থকদের আশা ছিলো হয়তো এখান থেকেই আবার জ্বলে উঠবেন ফুটবলের অসামান্য প্রতিভা লিওনেল মেসি। কিন্তু তিনি পারলেন না৷ শেষ ১৬-তেই থামতে হল আর্জেন্টিনাকে৷ আবার স্বপ্নভঙ্গ হল লিওনেল মেসির৷ ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ গোলে হারল নীল-সাদা জার্সিধারীরা৷ আর মেসির জন্য তৈরি মঞ্চে নায়ক বনে গেলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে৷ জোড়া গোল করে দলের জয়ের অন্যতম কারিগর হয়ে রইলেন ১৯ বছর বয়সি এই খেলোয়াড়৷ রাশিয়ার মাটিতে ফরাসী বিপ্লবের ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়লো আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন।

মেসির মতো রোনাল্ডোরও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল৷কাভানির জোড়া গোলে পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারাল লাতিন আমেরিকার দেশটি৷ পর্তুগিজদের হয়ে একমাত্র গোল পেপের৷কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের মুখোমুখি ফ্রান্স৷

অনেক দ্রুতগামী ফ্রান্সের সামনে আর্জেন্টিনা পুরো খেলায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি। মেসির নড়াচড়া বন্ধ করে দিয়ে ফ্রান্সের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা একের পর এক হামলা চালিয়েছে আর্জেন্টাইন গোলমুখে। আর তা থেকেই ৪ গোল। তবে ফ্রান্সকে একেবারে ছেড়ে কথা বলেনি আর্জেন্টিনা। ডি মারিয়ার অসাধারণ গোল আর ম্যাচের অন্তিমে অ্যাগুইরোর গোল তারই প্রমাণ দেয়। কিন্তু ততক্ষণে সব আশা নিভে গেছে। গোটা খেলায় আবারও মেসিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার খেলার জাদুকরী চমকের ছিঁটেফোঁটাও দেখতে পায়নি আর্জেন্টিনার সমর্থকরা। আর দেখতেও পাবে না তারা। বিশ্বকাপের আসরকে এবারই বিদায় জানিয়েছেন মেসি। আর তাকে দেখা যাবে না নীল-সাদা জার্সি গায়ে খেলতে।

শুরু থেকেই কাভানি-সুয়ারেজ জুটি পর্তুগালের রক্ষণে চাপ বাড়াতে থাকে৷ অপরদিকে, উরুগুয়ের জমাট রক্ষণের সামনে বারেবারেই একা হয়ে যাচ্ছিলেন সি আর সেভেন৷ আর এই সুযোগে খেলা শুরুর সাত মিনিটের মাথায় সুয়ারেজের বাঁক খাওয়ানো সেন্টারে মাথা ছুঁইয়ে দুরন্ত গোল করেন কাভানি৷ শেষ ম্যাচে রাশিয়ার বিরুদ্ধেও গোল পেয়েছিলেন তিনি৷  গোল খাওয়ার পর সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে পর্তুগাল৷ কিন্তু মাঝমাঠে নিজেদের মধ্যে স্কোয়্যার পাসই বেশি খেলছিলেন পর্তুগিজ খেলোয়াড়রা৷ ফলে আক্রমণ সেভাবে দানা বাঁধেনি৷ অন্যদিকে, সেই সুযোগে রক্ষণ আরও জমাট করে দিচ্ছিলেন দিয়েগো গোডিনরা৷ ফলে  প্রথমার্ধে গোল পেতে ব্যর্থ হন রোনাল্ডোরা৷ দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও একই ছবি৷ আক্রমণে উঠলেও গোল করার লোকের অভাবে তা কাজে লাগাতে পারেনি পর্তুগাল৷ শেষপর্যন্ত অবশ্য ৫৫ মিনিটে কর্নার থেকে গোল করে সমতায় ফেরান পেপে৷ কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি৷ ৬২ মিনিটেই নিজের এবং দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন কাভানি৷ পেনাল্টি বক্সের একদম মাথা থেকে নেওয়া তাঁর ডান পায়ের জোরালো শট রুখতে ব্যর্থ হন পর্তুগিজ গোলকিপার রুই প্যাট্রিসিও৷আর এরপর ম্যাচের বাকি সময়টা গোল শোধের মরিয়া চেষ্টা করলেও সফল হননি রোনাল্ডোরা৷ সমস্ত আক্রমণ উরুগুয়ে রক্ষণে বাধা পেয়ে ফিরে আসে৷ সময় যত গড়াতে মেজাজ হারাতে থাকেন রোনাল্ডোও৷ ম্যাচের শেষ লগ্নে এসে রেফারির সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে হলুদ কার্ডও দেখেন তিনি৷

পুরো  ম্যাচেই রোনাল্ডোকে নিঃস্প্রভ মনে হচ্ছিল৷ বারকয়েক সেই ঝাঁঝ দেখা গেলও কোথায় বেসুরেই বাজছিলেন এই অসাধারণ খেলোয়াড়। আর তারই প্রভাব পড়ল পর্তুগাল-উরুগুয়ে ম্যাচের রেজাল্টে।  বিশ্বকাপের শুরুতে পেনাল্টি মিস করেছিলেন মেসি৷ সেই নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি৷ পরে পেনাল্টি মিস করতে দেখা যায় রোনাল্ডোকেও৷ আবার বিশ্বকাপ থেকে দু’জনেই বিদায় নিলেন প্রায় একই সঙ্গে৷ তাই দিনের শেষে কোথাও গিয়ে তাঁরা দু’জনে আর আলাদা নন, দু’জনেই হয়ে রইলেন এবারের বিশ্বকাপের ‘ট্র্যাজিক হিরো’৷দু’জনেই হয়ত বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচটা খেলেই ফেললেন৷

ছবিঃ ফুটবল টুইট