দুই বন্ধুর যুক্তি তক্কো আর গপ্পো

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মৃণাল সেনের চাইতে দুই বছরের বড় ছিলেন সত্যজিৎ রায় (১৯২১ – ১৯৯২), আর ঋত্বিক ঘটক (১৯২৫ – ১৯৭৬) ছিলেন আড়াই বছরের ছোট। একজনকে সম্মান করতেন, অন্যজন ছিলেন বন্ধু। কিন্তু দুজনের সঙ্গেই ছিলো সম্পর্ক। দুজনের সঙ্গেই চলতো বাহাস। সিনেমা নিয়ে, সিনেমার ভাষা নিয়ে। তবে ঋত্বিক ঘটক বন্ধু ছিলেন বলে ওর সঙ্গে ঝগড়াঝাটিও হতো মৃণাল সেনের। আরো হতো রাজনৈতিক আলাপ। পরিকল্পনা হতো কি করে তাঁরা দুজন লুকিয়ে কাকদ্বীপে চলে যাবেন; তারপর সেখানে পুলিশের নজর এড়িয়ে, গেরিলা কায়দায় ১৬ মিলিমিটারে চলচ্চিত্র বানাবেন। এরপর তাঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে সেই ছবি দেখাবেন। সত্যজিত রায়ের সঙ্গে এই দুজনের অবশ্য  সেসব আলাপ জমতো না। সত্যজিৎ রায় এমনিতেই ছিলেন রাজনীতি থেকে দূরে থাকা মানুষ।

বয়সে মৃণাল সেনের ছোট কিন্তু ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে ছিলো তাঁর গভীর বন্ধুত্ব। সম্মান করতেন মৃণাল সেন তাঁকে, ভালোও বাসতেন। কারণ তিনি জানতেন গণমানুষের কাছে গণমানুষের শিল্পকে পৌঁছে দিতে ঋত্বিক ছিলেন ‘দুঃসাহসী’ ও সবচেয়ে ‘বেপরোয়া’। সিনেমাকে বিপ্লবের সঙ্গে জড়িয়ে চলতে শিখেছিলেন ঋত্বিক। মৃণাল সেনও। বলছেন, ‘ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি অচঞ্চল বিশ্বাস রেখে সে দিন থেকেই আমরা অন্তঃস্বারশূণ্য দেশজ সিনেমাকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতে শিখেছিলাম, নতুন একটা ফ্রন্ট গড়ার জন্য মুখিয়ে উঠেছিলাম প্যারাডাইস কাফের ভাঙা চেয়ার-টেবিলে ঠাসা ঐ ছোট্ট ঘরে, যে ফ্রন্টে বিপ্লব আর সিনেমা হাত ধরাধরি করে চলবে। এই প্রাণচঞ্চল আসরগুলোয় যার গলা সবচেয়ে উঁচু পর্দায় বাঁধা ছিলো সে হলো ঋত্বিক। ঋত্বিক ছিলো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেপরোয়া। কোন কিছুকেই তোয়াক্কা করতো না ঋত্বিক, আগু পিছু ভাবার মতো ধৈর্য ছিলো না।’

ঋত্বিক ঘটকের  প্রথম ছবি ‘নাগরিক’ দেখে খুশি হতে পারেননি মৃণাল সেন। কিন্তু দ্বিতীয় ছবি ‘অযান্ত্রিক’ ভীষণ ভালো লাগে তাঁর, প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘একটি অসাধারণ ছবি এবং ভীষণ ভাল ও মৌলিক ছবি। সম্ভবত তাঁর ছোট্ট জীবনে তুলনারহিত। এ-ছবির কাহিনী একটি ভাঙা মোটরগাড়ি এবং এ-মোটরগাড়ির সঙ্গে এক রাগী ড্রাইভারের ভালবাসা-যন্ত্রণার কাহিনী। সবকিছু বলা হয়েছে ভারী সুন্দরভাবে, নিটোলভাবে। ’

মৃণাল সেনের ছবি নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের প্রতিক্রিয়ার কথা আমরা জানতে পানি মৃণাল সেনের জবানীতে।১৯৭৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর সকাল সকাল ঋত্বিক ঘটক উপস্থিত হন মৃণাল সেনের বাড়িতে। অসুস্থ ছিলেন ভীষণ। মৃণাল সেনের স্ত্রী গীতা ঋত্বিক ঘটককে দেখে চমকে ওঠেন। একদম শুকিয়ে যাওয়া এক মানুষের প্রতিকৃতি। গীতাকে ঋত্বিক বললেন, ‘আর মদ খাবো না’। একটু পর আবারো বললেন, ‘আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না’। গীতা বললেন, ‘মদ না ছাড়লে কী করে বাঁচবেন আপনি?’ উদাস দৃষ্টিতে ঋত্বিক পুনরাবৃত্তি করেছিলেন, ‘আমি আর মদ খাবো না’। এরপর হুট করেই বললেন, ‘গীতা, মৃণাল খুব ভালমানুষ। কিন্তু ওর ‘ভুবন সোম’, ফুঃ!’

মৃণাল সেনের বাড়িতে সেই সকালের মাত্র দেড় মাস পর, ১৯৭৬ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি মারা যান ঋত্বিক ঘটক। অন্তিমশয়নে পাশেই ছিলেন বন্ধু মৃণাল সেন। ঋত্বিক তাঁকে দেখতে পাননি। রাত এগারোটা পাঁচে সমাপ্তি ঘটে ঋত্বিক অধ্যায়ের। মৃণাল বলছেন, ‘বোধহয় মরে গিয়ে ঋত্বিক বেঁচে গেলো। মৃত্যুর কয়েকবছর আগের সময়গুলো ছিল ভয়ংকর। অবাধ্য ঋত্বিক, হৃদয়হীন ঋত্বিক, শৃঙ্খলাহীন ঋত্বিক আবার সবার ওপরে সম্মাননীয় ঋত্বিক! এখনও সেভাবেই বেঁচে আছে। এভাবেই বেঁচে আছেন ঋত্বিক। ‘দামাল ঋত্বিক, বেপরোয়া ঋত্বিক, অসহিষ্ণু ঋত্বিক, বিশৃঙ্খল ঋত্বিক’।

ঋত্বিক ঘটকের শেষ মৌলিক নাটকের নাম ‘সেই মেয়ে’। ১৯৬৯-এ ১০ থেকে ১৪ জুলাই— এই ক’দিনের মধ্যে নাটকটি তিনি লেখেন মানসিক হাসপাতালে বসে। ওই সময় তিনি কিছুদিন সাময়িকভাবে মানসিক অসুস্থতার কারণে ওখানে ভর্তি হয়েছিলেন। সুস্থ হওয়ার পর ওখানেই নাটকটি রচনা করেন, অনুবাদ করেন কুমারসম্ভবের অষ্টম সর্গ। কলকাতার গোবরা মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের দিয়ে নাটকটি অভিনয়ও করান। অভিনয় দর্পণ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় (জুলাই-আগস্ট ১৯৬৯) নাটকটি মুদ্রিত হয়। নাটকটিতে সংযোজিত একটি গানের কথা ও সুর সংযোজনা করেন পণ্ডিত রবিশঙ্কর। একটি মানসিক চিকিৎসালয়ে সন্তানহারা শান্তি নামের এক গৃহবধূর জীবনের কথা ব্যক্ত হয়েছে নাটকটিতে। এই নাটকের একটি চরিত্র ডাক্তারের। তাঁর একটি সংলাপ এই রকম,

“মানুষ ব্যথা পায়, কষ্ট পায়, তরঙ্গে তরঙ্গে যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ভাবে মৃত্যু এলো বুঝি। কিন্তু মৃত্যুর ছদ্মবেশ ছেড়ে বেরিয়ে আসে নবজীবন… সব জন্মই তো তাই।”

ডাক্তার জানান, আসল চিকিৎসা ভালোবাসা। আর ভালোবাসা, মানুষকে ভালোবাসা-ই ঋত্বিক দর্শনের মূল কথা—কি থিয়েটারে, কি সিনেমায়।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ এখন খবর
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]