দুই শীতের মাঝখানে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শীত আসার আগে কত কী যে ঘটে! মানুষের দৃষ্টিগোচর আকাশ বাতাস পাশ ফিরে শোয় গভীর আলস্যে। কেমন এক টান লাগে মানুষের বেঁচে থাকার গল্পে। আশ্বিনের দিন যায়। কেমন ঘোর লাগা ম্লান আলোর ভিতরে মায়াময় এক পৃথিবী কথা বলে।টলটলে একটা ডোবা এই গত বর্ষাতেও। এখন শুকিয়ে গিয়ে জলে সবুজ রঙ ধরেছে। ধীরে ধীরে মাথা তুলে বের হয়ে এসেছে নৌকার গলুই। কী গভীর আলস্য তার কাঠের শরীরে!সে যেন ভেসে বেড়ানোর নিয়তি থেকে নিষ্কৃতি চায়।যেরকম বৃষ্টির হাত থেকে ছাড়া পাওয়া মাকড়সাও লাইব্রেরী ঘরের আলমারির মাথায় আপনমনে বুনতে চায় তার জাল। এসব চাওয়ার ভেতরে আকাঙ্ক্ষায় দুর্যোগপূর্ণ পৃথিবীর আবহাওয়া কোথাও প্রভাব বিস্তার করে নেই।

শীত আসার আগে কত কিছুর আয়োজন পৃথিবীতে। পূর্বপুরুষদের চিহ্নিত করা কত লক্ষণ প্রকৃতির পাল্টে যাওয়াকে নির্ণয় করে। অভিবাসী পাখিরা কি এবার মাটি থেকে অনেক উঁচুতে উড়ে যাচ্ছে? তাহলে সামনের দিনগুলোতে আবহাওয়া সুন্দর থাকবে। এই পাখিরা কি খুব নিচু দিয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে উষ্ণ মন্ডলীয় কোনো দেশে? তাহলে এবার শীত আসবে রুদ্র চেহারা নিয়ে। আশ্বিন মাসের ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে আসা দিন কতকিছু জানায় আমাদের। লোহা আর কংক্রিটে পা গেঁথে দাঁড়িয়ে থাকা শহুরে সীমায় কোথাও একটা গাছ লাগাতে না-পারার অক্ষমতা জ্বলজ্বল করলেও শিউলিফুল ঠিক এসে হাজির হয় শহরতলায়ও।  

অসুখের আগুনে পোড়া পৃথিবীর মানুষ। তবু আশ্বিন কত কী জানায়! বিকেলে কমলা রঙের আলোর ভিতরে ডাক টিকেটের মতো সেঁটে থাকে পাতা পোড়ানোর ঘ্রাণ। চালতা ফুল ঝরে পড়ে খুব আলতো ভঙ্গিতে।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে প্রকৃতির এই ধীরে পাল্টে যাওয়ার নানা গল্প নিয়ে রইলো ‘দুই শীতের মাঝখানে’।

গত শীতে বহু মানুষ কি দলবেঁধে সমুদ্রে গিয়েছিলো? পাহাড় থেকে ফিরে এসে অনেক গল্প করেছিলো? শীত আসার আগে আকাশের গায়ে খুব উজ্জ্বল হয়ে ওঠা নক্ষত্র যে প্রচণ্ড শীতের, গভীর হাওয়ার  ভবিষ্যতবাণী লিখেছিলো মানুষ কি এইসব সংকেত বুঝতে সক্ষম হয়েছিলো?

জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন তাঁর কবিতায়-

‘যতদিন বেঁচে আছি আকাশ চলিয়া গেছে কোথায় আকাশে
অপরাজিতার মতো নীল হ’য়ে- আরো নীল- আরো নীল হ’য়ে
আমি যে দেখিতে চাই;- সে আকাশ পাখনায় নিঙড়ায়ে ল’য়ে
কোথায় ভোরের বক মাছরাঙা উড়ে যায় আশ্বিনের মাসে’।

কোথায় উড়ে যায় বক আশ্বিনের মাসে? পুকুর পার হলেই বাঁশগাছের উঁচু মাথা আকাশে লিখছে কিছু। সেখানেই বসে আছে বক। ভাবছে ভাবছে…তারপর হুট করে উড়ে গেলো। কতদূর গেলো? সে প্রশ্নের উত্তর জানিয়ে কোনোদিন চিঠিও আসে না।

গ্রামের আশ্বিনের মতো শহরের আশ্বিনকে কে চিনতে পারে?  শীত বিদায় নিলে অভ্যস্ত ছাদের রেলিংয়ে লেপ আর কম্বলে কিছু রোদ সঞ্চয় করে রেখে শীতকে বিদায় জানানো। শহুরে শীত হাত গুটিয়ে সুবোধ বালকের মতো ঠাঁই নেয় মানুষের আধুনিক ফ্ল্যাটবাড়ির সিলিংয়ে লাগানো কুঠুরীতে। ব্যাস, আবার দেখা হবে, এবার বিদায়। মাঝে কয়েকদির পালং শাক, মূলা, কপির আলোকিত মুখ, গরম চা, তারপর সব নিভিয়ে বসন্তকালের জন্য উশখুশ করা। কিন্তু তবুও ভোরবেলা কোথায যেন অবহেলার এই আশ্বিন লেগে থাকে শহরের শরীরে। খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে শোনা যায় ঘুঘু পাখি ডাকছে। নিঃসঙ্গ কুকুর কাদের বাড়ির দরজার কাছে নাক লুকিয়ে ঘুমের রাজ্যে তখনও।বিছানা থেকে নেমে মেঝেতে পা রাখতেই ছ্যাঁৎ করে ওঠে শরীর মৃদু শীত লাগার অনুভূতিতে।জানালার কাচে লেগে থাকে বাইরের নির্জনতা, কখনো ফড়িং।পথে বের হলে মোটরের তেলপোড়ানো গন্ধ নয়, কেমন শুষ্ক, উদাসী, ঘরপালানো ঘ্রাণ কোনো নাগরিকের অন্যমনষ্ক মনের প্রান্তরকে চমকে দেয়।তখন কোথায় যায় মানুষ? কোথায় অন্য গল্পের ছাই ওড়ে? শহরের নির্জন ঘরবাড়িগুলো কেমন অচেনা আর নরম হয়ে থাকে সেই ভোরবেলা। কোনো নির্জন পথ ধরে হেঁটে গেলে আচমকাকোনো বাড়ির দেয়ালের ধার ঘেষে ছড়িয়ে পড়ে থাকা শিউলি ফুল আশ্বিনের সকালকে আলোকিত করে রাখে। চাওয়া পাওয়ার খুনোখুনিতে ভরা এই শহরকে অলৌকিক নদীর পাড়ের এক দেশ বলে মনে হয়।

এক শীত শেষ করে লম্বা সময় কাটে আরেক শীতের গল্প দানা বাঁধতে বাঁধতে। কিন্তু তারপরেও তো কত গল্প! বর্ষার মেঘ আর একটানা বৃষ্টি পেরিয়ে হঠাৎ সব থেমে যাওয়া। শরৎ  এসে গেছে। গ্রামের পথে কাদা শুকিয়ে যায়। কাশফুল গভীর নিষ্ঠায় ঘন হতে হতে শোনায় দূর্গাপূজার গল্প।

আশ্বিন মাসে কখনো একলা নৌকা ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যায় নদীতে।বিকেলের অন্তিমে ফিরে আসে যাত্রীশূন্য লঞ্চ। আশ্বিনকে শূন্য হয়ে থাকা সময় বলে মনে হয়। কিন্তু তবুও আশ্বিন সুসময়ের গল্প বলে, শীতের গল্প বলে। হেমন্তকালের হালকা কুয়াশায় মোড়া সময়ের ইঙ্গিত জানায়। তাই তো দুই শীতের মাঝখানে কত গল্প! কারো কত চিঠি লেখা হলো না। কত কেউ বাজারে যেতে গিয়ে ভুল করে চলে গেলো বিমলের চায়ের দোকানে।কেউ কতো কাজ বকেয়া রেখে ছিপ হাতে বসে রইলো পুকুরঘাটে;তার খুব ভালো লেগে গেলো আশ্বিনের বাতাসে দুপুরের ফুরিয়ে যাওয়ার ছবি।

শহর এমন স্বাদ রাখে কি আশ্বিনে? ভিড়ে, চিৎকারে, শব্দের যুদ্ধে বেলা উঠলেই আশ্বিন মাসের ভোরবেলাটুকু কোথায় উড়ে যায়। এখন তো অসুখের কাল চলছে। সবার জীবনই বদলে গেছে। সেখানে কোথায় আশ্বিন মাসের মৃদু পায়ে কাছে আসা? তবু গল্প জমিয়ে রাখি আমরা এক শীত থেকে অন্য শীতে যাবার আগে। মনে হয় একটা ট্রেন মন্থর গতিতে ছেড়ে চলে যাচ্ছে স্টেশনের সব পিছুটান। সংক্ষিপ্ত আশ্বিনের আয়ু জানিয়ে যাচ্ছে দুই শীতের মাঝখানে বহু কথা জমে আছে মানুষের।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল, জুলফিকার ও দীপ্ত।

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]