দুটি অণু গল্প

ফেসবুকে জনপ্রিয় পেইজ ‘পোস্টবক্স’। তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব এলো প্রাণের বাংলার পাতায় তাদের গল্প লেখকদের অণুগল্প ছাপার। যথারীতি গল্প আহ্বান করা হলো পোস্টবক্সে। বিষয়-এ কাপ অফ কফি, কফি খেতে খেতে জীবনের নানা কৌণিকে আলো ফেলে গল্পের খোঁজ। যথেষ্ট সাড়া মিলেছে। সেসব গল্প থেকে বাছাই করে প্রাণের বাংলায় এবার মুদ্রিত হলো দুটি গল্প।

 

অনামিকা    

“ May I have a Latte please?” 

সা’দ জগলুল আব্বাস

 

বহু দিন আগে শোনা বিসমিল্লাহ খাঁ সাহেবের  সানাই এর সুর যেন কানের আলিন্দ পার হয়ে বুকের ভিতর এসে ছড়িয়ে পড়লো!

দিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী বিমান বন্দর! ২০১১র ১১ই আগস্ট! পালাম বিমান বন্দর নতুন করে সেজেছে। ঝকমকে বিরাট আধুনিক অবয়ব। ব্যক্তিগত কাজে দিল্লী এসেছিলাম, ফিরে যাচ্ছি ঢাকা!ইমিগ্রেসান শেষ করে বেটাদের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে…আরে বেকুবরা,জুতা জামা যদি খুলাবি তো এত  যন্ত্র রেখেছিস কেন? মনটা খারাপ হলে আমার কফির পিপাসা জাগে;ভাবনাটা আসতেই  কফির পিপাসাটা এক লাফে দ্বিগুন হয়ে গেলো। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে ভেতরের মানুষগুলোর ছুটাছুটি দেখা আমার খুব পছন্দের একটা বিনোদন! মনে হয় যেন জীবনের সমস্ত অভিব্যাক্তিগুলো ছায়া ছবির মতো আমার সামনে দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে !

ডিউটি ফ্রী দোকানগুলো ঘুরে এসে পাশের কফিশপে ঢুকে পড়লাম,একটা মোকা নিয়ে মগে চুমুক দিচ্ছি আর যাত্রীদের দেখছি।কফিতে চুমুক দেয়া মাত্র সিগারেটের তেষ্টাটাও টগবগিয়ে উঠলো। স্মকিং রুমের অবস্থানটা আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম…ঠিক  তখুনি সেই বহু পরিচিত সানাই এর সুর, May I have a Latte please!

শব্দটার উৎস খুঁজতে এদিক সেদিক তাকাতেই বাঁয়ে দু’টো টেবিল দূরত্বে একমাত্র মহিলা চোখে পড়লো। পিঠটা আমার দিকে,নিটোল খোঁপা করা চুল !পাশে কালো ট্রলিবাগটা,ব্যাগের উপর একটা ওভারকোট। ধূসর ট্রাউজার এর একাংশ দেখা যাচ্ছিলো, কালো ফ্লোরাল শার্ট ! কফির শেষ চুমুকটা দিয়েছি মিনিট পাঁচেক আগে। উনি বাঁদিকে মুখটা একটু সরালেই চেহারাটা দেখা যাবে…কিসের এক ঘোরে ঠায় তাকিয়ে আছি আর ভাবছি, কখন ফেরাবে মুখটা? সানাই এর উৎস কি ওখানেই?

লাত্যে এলো, মনে হোল অনন্তকাল ধরে আমি কফি খাওয়া দেখছি। অবশেষে উনি বিল মিটিয়ে উঠে দাড়িয়ে ওভারকোটটা বাঁ হাতে নিয়ে ব্যাগটার হাতল ধরে ঘুরে দাঁড়ালেন… সঙ্গে সঙ্গে আমার পৃথিবী সমস্ত বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো স্মৃতির আগল খুলে! মাথাটা লাট্টুর মতো ঝিম ধরে গেলো। ধাক্কাটা সামলে নিতে একটু সময় লাগলো! ৪২ বছরে খুব একটা বদলায়নি,বয়সের ছাপ আর চোখে চশমা ছাড়া!

হাতে ধরা ব্যাগটা যেখানে ছিল সেখানেই আছে,মানুষটাও;দুজনই তাকিয়ে আছি…হয়তো ১০ ফুট দুরের চশমার পিছনে কিছুটা অনিশ্চয়তা!অজান্তেই বহুকাল আগের প্রিয় একটা শব্দ আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো,

“মিকা!”

ওদিক থেকেও অস্ফুট  একটা শব্দ কানে ভেসে এলো কি এলোনা বুঝতে পারিনি, ঠায় দাড়িয়ে দেখছি দু’জন দু’জনকে!ওর দু চোখে অবাক এক চিলতে হাসি খেলে মুহূর্তে মিলিয়ে গেলো !

“ মিকা,তুমি?”

এবার ব্যাগটা নড়ে উঠলো, সেই সানাই এর পরিমিত সুর,

“তুমি? কেমন আছো?”

মুখে এবার পরিষ্কার সেই প্রাচীন ‘দিল ফিদা’ হাসি! আমি ধপ করে বসে পড়লাম! হায় আল্লাহ!

“কোথা থেকে আসছো? বসবো?”!

মনে হলও বহুদুর থেকে কথাটা ভেসে এলো! আমি আবার দাঁড়াবার চেষ্টা করলাম ,মনে হচ্ছিলো চেয়ারটিতে আমি আটকে গেছি!কিন্তু আমাকে যে উঠে দাঁড়াতে হবেই । উঠলাম, ঘুরে গিয়ে পাশের চেয়ারটি এগিয়ে দিলাম বসার জন্য! ট্রলি ব্যাগটার উপর ওভার কোটটা রেখে বসতে বসতে আবার ওপার থেকে প্রশ্ন ,

“তুমি এখানে?”

“হ্যাঁ, তুমি?”

“লন্ডন থেকে ফিরছি, মেয়ের কাছে গিয়েছিলাম!”

“মেয়ে ?”

“ ল’ পড়ছে” উত্তর এলো!

এবার ভালো করে তাকালাম,চুলে রূপালী কিছু রেখা। চোখে পড়ে কি পড়েনা,৪২ বছর পার হয়ে আসা ঐ মুখটায় সোনালি ফ্রেমের চশমাজোড়া বেশ মানিয়েছে  !

“কি,ঢাকা ফিরছো তো? চলো উঠি, বোর্ডিং এর সময় হয়ে এলো”।

“ও হ্যাঁ, চলো”।

অনেক কষ্টে নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে কফির বিল মিটিয়ে উঠে দাঁড়ালাম, আমার আধখাওয়া মোকা অনাথের মতো পড়ে রইল টেবিলে, সিগারেট খাওয়াও হোল না!

ওর ব্যাগটার হাতল ধরে বললাম, “এসো”!

“তুমি কিন্তু একই আছো, বদলাওনি খুব একটা”, … হাঁটতে হাঁটতে মিকার মন্তব্য!

বললাম, “তুমিও”।

আমাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চললাম, ফুট দূরত্বে পাশাপাশি, ৪২ বছরে এই প্রথমবার…ভিনদেশী এক এয়ারপোর্ট এর এলিভেটার ধরে!!!!!

হুইলচেয়ার

অপরাজিতা অর্পিতা

এই নিয়ে তিনবার চোখে কাজল মাখছে অহনা৷ কেন যেন বারবারই লেপ্টে যাচ্ছে। এমনিতে অহনা যথেষ্ঠ সুন্দরী,  উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রঙ, ছিপছিপে লম্বা গড়ন, সাজতে দারুন পছন্দ করে সে। অথচ আজই সে সাজতে পারছেনা; হাত কাঁপছে। আজ পারভেজের সঙ্গে প্রথম দেখা হবে অহনার। বাংলাবাজার পত্রিকায় পত্রমিতালী বিভাগে চোখ বোলাতে বোলাতে একটা বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে যায়, “আকাশের সঙ্গে মৃত্তিকার কি কখনো বন্ধুত্ব হয়? হয়, যখন দিগন্তে এসে মেশে তাদের বন্ধুত্বের সিঁড়ি, কেমন হয় সে বন্ধুত্ব? জানতে চান? তবে লিখুন জি পি ও বক্স নং-৩৪৫।” পত্রমিতালীতে বন্ধু হতে চাওয়ার বিজ্ঞাপন দেয় অনেকেই। এমন ব্যতিক্রম বিজ্ঞাপন এই প্রথম চোখে পড়ে অহনার। আকাশ পাতাল ভেবে দুই লাইনের চিঠি পাঠিয়ে দেয় অহনা। সেই থেকে শুরু অহনা ও পারভেজের বন্ধুত্ব।

প্রায় ১২ বছর আগের কথা। জি পি ও বক্সে চিঠি লেখার চল খুব একটা ছিলো না তখন। প্রতিউত্তর আসবে কিনা এই ভাবতে ভাবতে এক সপ্তাহের মাথায় চিঠি এলো পারভেজের। সুন্দর হাতের লেখায় এমন আবেগমাখা চিঠি, অহনা কখনো পায়নি।  চিঠি দিয়ে আলাপ শুরু, পরে তা রূপ নেয় ফোনালাপে। কথোপকথন চলতে থাকে, এক অপার্থিব বন্ধুত্ব শুরু হয় তাদের। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, ক্ষুরধার লেখনী আর ভরাট কন্ঠস্বরে বারবারই মুগ্ধ হয় অহনা। কিন্তু কখনও দেখা হয়না তাদের। পারভেজ দেখা করার বিষয়ে বড়ই উদাসীন।

অবশেষে অহনার জোরাজুরিতে ১২ বছর পর আজ পারভেজের সঙ্গে দেখা হতে যাচ্ছে অহনার। অহনার বুক ধড়ফড় করছে, হাত পা কাঁপছে। অহনা জানে এগুলো কিসের লক্ষণ। পারভেজের বন্ধুত্বের শর্ত ভেঙেছে সে, ভালবেসে ফেলেছে পারভেজকে। বন্ধুত্বের শুরুতে পারভেজ তাকে শর্ত দিয়েছিলো, তারা ভালবাসার সম্পর্কে জড়াবেনা আর কখনো দেখা করবেনা। অহনা সেই শর্ত রাখতে পারেনি। ১২ বছরের অনুভুতি মিলিয়ে অহনার মনে হয়েছে তার ভালবাসার কথা পারভেজকে না বললে নিজের সঙ্গে তার প্রতারণা করা হবে। অনেক মান অভিমানের পর অবশেষে পারভেজের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাকে রাজি করিয়েছে অহনা।

কোন মতে রেডি হয়ে অহনা তাড়াতাড়ি চলে আসে রেস্তোরাঁয়, নির্ধারিত সময়ের ৩০ মিনিট আগেই।  এরপর অপেক্ষা, নিজেকে গুছিয়ে নেয় অহনা, কিভাবে বলবে তার ভালবাসার কথা, সেসব সাজাতে সাজাতেই মুঠোফোনে বেজে ওঠে পারভেজের নাম্বার।
-এসেছো?
-হুম,
-আচ্ছা, কফির অর্ডার দাও, আমি ১৫ মিনিটে আসছি।

বলেই ফোন কেটে দেয় পারভেজ। আজ তার কন্ঠস্বর এমন শোনালো কেন, কেমন যেন বৃষ্টির পর গুমোট আবহাওয়ার মতো। এসব ভাবতে ভাবতে শুধু নিজের জন্যই এক কাপ কফির অর্ডার দেয় অহনা; ১৫ মিনিটে পারভেজের কফি ঠান্ডা হয়ে যাবে তাই। গাঢ় ফেনায় ভরা, মন মাতানো সুগন্ধময় ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি সামনে রেখে চলে যায় ওয়েটার। কফিটা হাতে নেবে, এমন সময় রেস্তোরাঁর দরজা খুলে যায়, অহনা দেখতে পায় প্রিয় মুখ, এলোমেলো চুল, মোটা ফ্রেমে ঢাকা গাঢ় চোখ, নিকোটিনে পোড়া ঠোঁট, কন্ঠহাড়, খদ্দরের পাঞ্জাবী আর… আর…

এরপর আটকে যায় অহনার চোখ, একি!  সে কি দেখলো এটা! এটা কি দেখার কথা ছিলো? পারভেজের হাত দুটো রাখা আছে, হুইল চেয়ারের দুই হাতলের উপর। এই সেই হাত, যে হাতে রাতের পর রাত জেগে পারভেজ লেখে প্রতিবাদের লেখা, প্রেমময় কবিতা, জাগরণের বানী। স্মিত হাসি হেসে, দু হাত দিয়ে ঠেলে ঠেলে হুইলচেয়ার নিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসে পারভেজ অহনার দিকে। সহ্য করতে পারেনা, চোখ সরিয়ে নেয় অহনা, হাত বাড়িয়ে দেয় কফির কাপে। চুমুক দিয়ে টের পায় জুড়িয়ে গেছে কফি। বিদঘুটে আর বিস্বাদ লাগে কফিটা। যেমন মুহুর্তেই জুড়িয়ে গেছে তার জীবনটা, এক কাপ ঠান্ডা বিস্বাদ কফির মতো।