দুটি আংশিক সত্যি ঘটনা এবং কন্যার নিরাপত্তা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের পরিচালক যুগ্ম সচিব,বাংলাদিশ ট্যুরিজম বোর্ড

ঘটনা: এক
আদালতে তুমুল বাক বিতন্ডা হচ্ছে বিজ্ঞ আইনজীবীগণের মধ্যে। তর্কের বিষয় ৫/৬ বছরের একটি কন্যা শিশু। শিশুটি কার কাছে থাকবে? মায়ের কাছে? না বাবার কাছে?

শিশুটির মা বাবার মধ্যে মামলা চলছে। মায়ের অভিযোগ তার স্বামী যৌতুকের টাকার জন্য তাকে চাপ দেয়, মাঝে মাঝে মারধরও করে। বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর চাহিদা মতো টাকা এনে দিতে না পারার কারণে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাড়িয়ে দেয়ার সময় তার মেয়েটিকে জোর করে তার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে। তিনি এখন মা বাবার কাছেই আছেন। মা বাবা মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে টাকা দিতে রাজি ছিলো কিন্তু তাদের ক্ষমতা (সামর্থ্য) নেই। তাই তারা মেয়ের জামাইকে টাকা দিতে পারছেনা। অগ্যতা উপায়ান্তর না দেখে স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলা পরিনতি নির্ভর করবে সাক্ষ্য-প্রমাণের উপর। কিন্তু আপাতত প্রশ্ন, কন্যা শিশুটি আশ্রয় কোথায় হবে?

আমি তখন সে আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট। উভয় পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীদের বক্তব্য বিশেষ মনোযোগের সঙ্গেই শুনেছিলাম। এমন সময় আসামী পক্ষের তথা স্বামীর পক্ষের একজন আইনজীবী আসামী তথা শিশুর বাবাকে বললেন শিশুটিকে মায়ের কাছে দিয়ে দিতে। শিশুটির বাবা শিশুটিকে মায়ের কাছে নিয়ে গেলেন। মা হাত বাড়ালেন কিন্ত শিশুটি মায়ের কাছে গেলোনা। শিশুটিকে নিয়ে বাবা আবার আসামীর কাঠগড়ায় ফিরে গেলেন। এবার আসামী পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবী বললেন, মাননীয় আদালত আপনি স্বচক্ষে দেখলেন, শিশুটির মা কত নিষ্ঠুর! যার কারণে শিশুটি মায়ের কাছে যেতেই চায় না। অতএব, শিশুটি তার বাবার কাছে থাকাই নিরাপদ। আমি আবেদন করবো শিশুটির মঙ্গলের কথা ভেবে শিশুটিকে বাবার জিম্মায় রাখার জন্য।

সবার কথা শুনে এবং ওই দৃশ্যটি দেখে আমি আদেশ দিলাম, ’শিশুটি তার মায়ের হেফাজতে থাকবে’। মৌখিকভাবে আদেশ দিলাম আদালতের সামনেই শিশুটিকে মায়ের কাছে দেয়ার জন্য। মা এগিয়ে এসে শিশুটিকে নিয়ে গেলো। প্রথমে শিশুটি একটু কাঁদলো বটে তবে পরক্ষণেই মাকে জাপটে ধরে মায়ের কোলে থিতু হয়ে গেলো।

যে কোন হাকিম যখন দেখতেন শিশুটি তার মায়ের কাছে যেতে চায় না, তখন ভাবতেন শিশুটি বাবার কাছেই থাকতে চায়। তাহলে থাকুক সেখানেই। বাবাও তো সন্তানের জন্য নিরাপদ জায়গা। তাহলে আমি কেন শিশুটিকে তার মায়ের হেফাজতে দেয়ার আদেশ দিলাম।

আমার একটি কন্যা সন্তান আছে। তখন তার বয়স আড়াই বছর। সে যখন আমার কোলে থাকতো তখন তার মা তাকে নিতে চাইলে সে যেতে চাইতো না। তার মানে এই নয় যে আমার স্ত্রী নিষ্ঠুর বা তিনি মেয়েকে আমার তুলনায় কম ভালোবাসেন। আমার নিজের বিবেচনায় কন্যা শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় তার মা। মা বাবাকে একসঙ্গে না পাওয়া গেলে সে ক্ষেত্রে মায়ের কাছেই কন্যা শিশুকে রাখা উচিত।

ঘটনা: দুই

ওয়ারেন্ট তামিল করা পুলিশের কর্মতৎপরতা মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাগণ যখন থানা পরিদর্শনে যান তখন তারা পর্যালোচনা করে দেখেন থানায় ওয়ারেন্ট এসেছে কিন্তু তামিল হয়নি এমন ওয়ারেন্টের সংখ্যা কত এবং কত দিনের পুরানো ওয়ারেন্ট। এমনি একটি ওয়ারেন্ট তামিল করার জন্য নেত্রকোনা জেলার একটি সীমান্তবর্তী গ্রাম থেকে এক কিশোরী মেয়েকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করেছে পুলিশ। দন্ডবিধির ৩৭৯ ধারার অপরাধে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মামলায় আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করা হয়েছে। আদালতে উপস্থিত সরকার পক্ষে কোর্টে দায়িত ¡পালনরত পুলিশ ইন্সপেক্টর হাকিমকে বলেছেন, মেয়েটির বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ এবং গ্রেফতারী পরোয়ানা নিয়ে দীর্ঘদিন পলাতক ছিলো। পুলিশ গ্রেফতার করেছে; সেচ্ছায় হাজির হয়নি। অতএব তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হোক। আসামী মেয়েটির পক্ষে কোন আইনজীবীকে পাওয়া যায় নি। অগত্যা হাকিম তাকে হাজতে প্রেরণের আদেশ দেন। মেয়েটিকে জেলখানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

মেয়েটি যে গ্রামের বাসিন্দা সেখানকার একজন আইনজীবী মামলার প্রেক্ষাপট জানতেন। তিনি তখন জেলা ও দায়রাজজ আদালতে একটি মামলার শুনানীতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি যখন জানতে পারলেন মেয়েটি জেল হাজতে গিয়েছে তখন তিনি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবরে একটি আবেদন করলেন পুনরায় শুনানীর জন্য। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে আদেশ করলেন পুন:শুনানী গ্রহণ করে যথোপযুক্ত আদেশ প্রদানের জন্য। আমি তখন নেত্রকোনা জেলায় প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত। আদেশ করলাম, আসামী মেয়েটিকে আদালতে হাজির করার জন্য। মেয়েটিকে আদালতে হাজির করা হলো। সরকার পক্ষে পুলিশ ইন্সপেক্টর এবং আসামী পক্ষে আইনজীবী হাজির ছিলেন। আমি মেয়েটিকে বললাম, মা তোমার বিরুদ্ধে ঢাকায় একটি চুরির মামলা হয়েছে, তুমি কি কিছু জান? তুমি যা জান আমাকে বলো। মেয়েটি যা বললো তার বিবরণ মেয়েটির জবানীতে পেশ করছি: “আমি ঢাকায় একটি বাসায় কাজ করতাম। আমার গ্রামের এক চাচি আমাকে সে বাসায় দিয়ে আসে। বাসার মালিক স্বামী-স্ত্রী খুব ভাল মানুষ। আমার কাজ কামে তারা খুব খুশী। আমাকে খুব মায়া করে। আমার খাবার, কাপড় চোপড়ে কোন কমতি নাই। আমি ভাবি, অনেক ভাগ্য নিয়া আমি জন্মাইছি তাই এই রকম ভাল কাজের জায়গা পাইছি। মাস চার পরে সে বাসায় একজন মেহমান এসেছে। খালাম্মা পরিচয় করে দিয়েছেন, তার ভাই। অনেক দিন পর বিদেশ থেকে এসেছে। তাদের সাথেই থাকবে। তার যেন আদর যতেœ কমতি না হয়। বাড়িতে অনেক ঘর। একটি ঘরে তাকে থাকতে দেয়া হয়েছে। তিনি আমাকে বলেছেন মাঝে মাঝে গিয়ে যেন খবর নেই তার কিছু লাগবে কিনা। লোকটা সুবিধার ছিলোনা। সে কারণে অকারণে আমারে গায়ে হাত দিতো। আমাকে জাপটে ধরতো। আস্তে আস্তে তার হাত বেশিই বাড়তে লাগলো। একদিন আমাকে বলে, তার হাত পা এবং মাথা টিপে দিতে। আমি ভেবে দেখলাম লোকটা একা ঘরে থাকে। সে আমাকে নষ্ট করে ফেলবে। তাই আমি নিজের ইজ্জত রক্ষার জন্য পালাইয়া আসলাম” আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আসার সময় তাদের কোন জিনিস কি চুরি করে নিয়ে এসেছো? সে বললো, তাদের জিনিস তো দূরের কথা। তারা আমাকে যা দিয়েছিল তাও আনি নাই। জিনিষপত্র নিয়ে কিভাবে আসবো। বেতনের টাকাগুলোই শুধু নিয়ে আসছি। আমি অনুমান করলাম, মেয়েটি যখন পালিয়ে এসেছে তখন বাড়ির মালিক নিজেকে নিরাপদ করার জন্য লোকাল থানায় একটি মামলা করেছে। আমি উভয় পক্ষকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি মেয়েটির বক্তব্যের ভিত্তিতেই কি আদেশ দিতে পারি। তারা সম্মত হলেন। আমি মেয়েটির জামিন মঞ্জুর করলাম এবং আমার মতামতসহ মেয়েটির বক্তব্য সম্বলিত বিবরণ সংশ্লিষ্ট ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে প্রেরণের আদেশ দিলাম। বিজ্ঞআইনজীবীকে মৌখিকভাবে অনুরোধ করলাম ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে প্র্যাকটিসরত তার কোন বন্ধু আইনজীবীর মাধ্যমে মেয়েটিকে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিতে, অন্যথায় সে অতল গহবরে হারিয়ে যাবে। আর তাকে স্বাভাবিক আলোয় পাওয়া যাবে না।

এই দুটি ঘটনা আনুমানিক ২০০০-২০০১ সময়ের। এখনও এমন ঘটনা অহরহই ঘটছে। কন্যা দিবসে আমরা সকলে বলছি কন্যার জন্য পৃথিবীর যেন বাসযোগ্য হয়- বিশেষ করে ফেইসবুকে অনেকেই এদিনটিতে এ রকম স্ট্যাটাস দেন।তবে সকল কন্যা শিশুর জন্য পৃথিবী বাসযোগ্য করে তোলা সত্যিই কি কঠিন? এ বিষয়টা শুধু মা বাবার উপরই নির্ভর করে না।জগতের সকল কন্যাকে নিরাপদ জীবন দেয়ার জন্য সমাজে সকলেরই ভূমিকা থাকতে হবে। প্রতিটি মানুষেরই ভাবা প্রয়োজন যে, তার কোনো কর্মের জন্য কন্যা শিশুর জীবন বিপন্ন হচ্ছে কিনা? সে কন্যা নিজের হোক বা অন্যের। প্রতিটি মানুষের উচিৎ কন্যার তথা নারীর প্রতি সহানুভূতি ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া। তবেই কন্যাদিবস সার্থক হবে।কন্যাদের জন্য পৃথিবী বাসযোগ্য হবে।

ছবি: অনিরুদ্ধ দাস

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]