দু’টো ভাল মিলেই তো তৈরি হয় পরশপাথর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সৃজা ঘোষ

ভালবাসা নিয়ে, সেই ভালবাসাটুকু ফিরিয়ে দেবার ও স্বীকার করার ক্ষমতা যাদের নেই, তারা শিরদাঁড়াহীন। এসব মানুষের সঙ্গে দয়া করে সম্পর্কে জড়াবেন না। আর জড়িয়ে পড়েছেন বুঝতে পারলে বেরিয়ে আসুন। সেইসব মানুষের জন্য নিজের সময়, অপেক্ষা বা ভালমানুষি কোনোটাই নষ্ট করবেন না, যারা দায়িত্ব নিতে শেখে না। আমাদের জেনারেশনে এ যেন এক নতুন ন্যাকামি হয়েছে। ভালো মানুষগুলোর সুযোগ নিয়ে, তাদের যাবতীয় এটেনশন আর ইমোশনাল ইনভেস্টমেন্টের সবটা নিয়ে তাদের নিঃস্ব করে দেওয়া। এই জন্যেই যেকোনো সম্পর্কের প্রথমে দরকার সহ্যের সীমারেখাটাকে নির্ধারণ করা। আমি কতটা সহ্য করবো?- সেটা পরিষ্কার করে দেওয়া পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার কাছে। জীবনটা সিরিয়াল নয়। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সময় মাথায় রাখুন এ শুধু সেই মানুষটা নয় যাকে নিয়ে আপনি ইন্সটা স্টোরি দিতে পারেন, রেস্তোরাঁর নিওন আলোয় ভাসতে পারেন অথবা চুমু খেতে পারেন। মাথায় রাখুন প্রতিটা অসুখে, পরাজয়ে, চরম বিপর্যয়ে, অবসর জীবনেও তিনিই থাকবেন আপনার পাশে। সর্বোপরি খেয়াল রাখুন আপনি যখন লাইফ পার্টনার বাছছেন, আপনি একই সঙ্গে স্থির করছেন আপনার সন্তানের অভিভাবককে, আপনার সঙ্গেই আপনার পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া আর একটা মানুষকে, আপনার বন্ধুকে, আপনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর গোপন মুহূর্তগুলোকে ভাগ করে নেওয়ার মানুষকে। তাই, খুব সাবধানে। জীবনের প্রতিটা সম্পর্কের ভূমিকা আলাদা, চাহিদা আলাদা, প্রয়োজনীয়তা আর ফলাফল আলাদা। আর তার কুঠুরি গুলোও তাই ভাগ করা আছে সামাজিক প্রথায়। বাবা মা ভাই বোন বন্ধু স্বামী স্ত্রী কলিগ আত্নীয় প্রতিবেশী সবার গুরুত্ব আলাদা। একটা ছেলেকে মানুষ করার দায়িত্ব তার বাবা মার। বউ বা প্রেমিকার না। ম্যাচিওর লাইফপার্টনার খুঁজছো, ইমম্যাচিওর আর সারাক্ষণ নিজের অসহায়তা দেখিয়ে সুযোগ নিয়ে বেড়ানো ন্যাকা বাচ্চা না। আমাদের সবার মধ্যে কম বেশি একটা শৈশব বাস করে, কিন্তু শিশু বোধহয় সুযোগ নেয় না, তাই না? যারা অকারণে কষ্ট দেয়, সব কিছুর জন্যে যাদের সময় থাকে শুধু সম্পর্কে সময় দেবার বেলাই তাদের সময় কম পড়ে, যারা সম্পর্কে থেকেও সর্বত্র বলে বেড়ায় ‘আমি সিঙ্গল’, যাদের প্রচুর বন্ধু বান্ধবী থাকতে পারে অথচ প্রেমিকাকে অদ্ভুতভাবে গোপন করে বেড়ানো স্বভাব, যারা সব কিছুতেই একটা অদ্ভুত ধোঁয়াশা রেখে দেয়, যারা অদ্ভুত উদাসীনতা দেখায় কেবল আপনাকে কাছে নিয়ে বসবার বেলায়, আপনার সঙ্গে হাঁটলে যাদের মানে লাগে, যারা যেকোনো সময় যেকোনো হাতছানিতে ভেসে যায় সেটা পরিষ্কার তাদের চরিত্রের সমস্যা। আর বিশ্বাস করুন চরিত্র আর স্বভাব কাউকে অপমান করেই হোক বা ভালবেসে- বদলানো যায় না। এরা নোংরামি করবে, অন্যায় করবে, আপনাকে যথাসম্ভব ছোট করবে তারপর এসে ক্ষমা চেয়ে বলবে – আমি বুঝতে পারিনি। আমি অসহায়, আমায় প্লিজ সামলে নাও। এ চক্করে পা বাড়াবেন না। মানুষ ভুল করলে সুযোগ দেওয়া যায় কিন্তু অন্যায় আর অসভ্যতার কোনো এক্সকিউজ হয় না। জানি কাউকে ভালবেসে ছেড়ে আসতে কষ্ট হয়, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাতেই মঙ্গল। সুস্থ সম্পর্কের মানে যারা ইচ্ছে করে বুঝতে চায়না, যারা কথায় কথায় I love U বলতে পারে কিন্তু বিয়ের মত কমিটমেন্টে যেতে চায়না, যারা শুধু নিজের পরিবারের কথা ভাবে, আপনার পরিবারকে সম্মান করেনা; যারা নিজের শর্ত ক্রমাগত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয় অথচ অন্যের ইচ্ছের কোনো দায় নেয় না, যারা নিজে স্বেচ্ছাচারিতায় ভেসে পাশের মানুষের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, উল্টোদিকের মানুষটার চোখে জল দেখেও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়তে পারে, যারা নিজের ছাড়া কারোর অসুখ এবং অ-সুখ নিয়ে চিন্তিত নয় এতটুকুও, যারা শুধু নিজের জন্য যত্ন চায় অন্যকে যত্ন করতে শেখেনা, তাদের সঙ্গে থাকা মানে নিজের ক্ষতি বাড়ানো। আর তারা যদি নিজেই থাকতে না চায়, যেতে দিন হাসিমুখে।

নরম হওয়ার মানে আত্মসম্মান, আর নিজের সব ভাললাগা মন্দলাগার স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়া নয়। একটা বয়সের পর কেউ বাচ্চা নয়, কেউ কেউ অসহায় না- বিশ্বাস করুন। এসব মানুষেরা শুরু থেকে এদের অসৎ মোটিভ নিয়ে যথেষ্ট পরিষ্কার। তাই ‘আমার থেকেও ভাল কাউকে ডিসার্ভ করো তুমি’ ‘আমি তোমার যোগ্য নই’ ‘আমারই সব দোষ’ এসব ফালতু নাটকে পা দেবেন না। যোগ্যতা না থাকলে এরা আসে কেন ভালবাসার দাবি নিয়ে, ডিসার্ভ না করলে শুরুতেই বলে দেয়না কেন সব, নিজের দোষ জানলে কেন সেটা শুধু আপনার কাছে গোপনে স্বীকার করে আর এদিকে প্রকাশ্যে তা বলতে ভয় পায়, সমাজে আপনার নামে মিথ্যে রটিয়ে বেড়ায়? উত্তর খুঁজতে শিখুন। জানি ভালবাসতে গেলে চোখ বুজেই বাসতে হয়। কিন্তু তার মানে এই না যে যন্ত্রণায় ছটফট করলেও চোখ খোলা যাবে না। আসলে ভালবাসার একটা আলো থাকে। সেই সুন্দর আলোটা পড়লে চোখ বুজেও আমরা সব আদর দেখতে পাই। কিন্ত অন্ধকার নেমে এলে, চোখ খুলুন। জিজ্ঞাসা করতে শিখুন। কঠোর হন। আপনাকে কেউ অনর্থক ঠকালে, তার জন্যে জেহাদ থাকুক। ভালবাসা মানুষকে স্বচ্ছতা দেয়, শক্তি, সাহস, ভরসা দেয়। মানুষ হিসেবে আপনাকে আরও সুন্দর, আরও উন্নত, আরও ঝলমলে, আরও ভাল করে তোলে। তাই যদি কেউ কনফিউজড করে, বুঝবেন সে যোগ্য নয়। এদের বারবার সুযোগ দেওয়া মানে নিজেকে অসম্মান করা। হাতেনাতে হাজার অন্যায়ের প্রমাণ পাওয়া সত্ত্বেও অকারণে অন্ধবিশ্বাস করবেন কেন? বিশ্বাসটা সে তৈরি করে দেবে যদি সে যোগ্য হয়। আর তেমন জোর না পেলে, হাত ধরে আঙুলগুলোকে আলগা লাগলে, কাঁধে মাথা দিয়ে কাঁধটাকে নড়বড়ে মনে হলে, ব্যথার রাতের পাশে তাকে না পেলে চুপচাপ বেরিয়ে আসতে শিখুন। শারীরিক নিগ্রহটাই শুধু নিগ্রহ নয়। দিনের পর দিন সম্পর্কে থেকে পাশের মানুষটার মনের ওপর ক্রমাগত বিষ ঢেলে গেলে সেটা অনেক বড় অপরাধ। তার থেকে নানা ট্রমা তৈরি হয়, যেগুলো আপনার মতন একজন নিরপরাধ মানুষকে অনেকটা সময় বয়ে বেড়াতে হয়। আপনিও দোষী। নিজের বিপর্যয়ের জন্য তাই অন্যকে দায়ী না করে নিজেকে দায়ী করতে শিখতে হবে প্রথমে। কেন এতদিন এত অন্যায় সহ্য করে থাকা? কেন ভাগ করে নেবার অঙ্গীকারের পরেও সব বোঝা একা হাতে বয়ে বেড়ানো! কেন এত মিথ্যে হাতেনাতে ধরার পরেও মেনে নেওয়া! ভুল হয়ে যায়। জানি ভালবাসলে হিসেব করে চলা যায়না। তবু আসলে যার কাছে গেলে হিসেব করে চলতে হবে না, তার কাছে না পৌঁছনো অব্দি যে আমাদের সক্কলের হিসেব করে চলাটা জরুরি। ঠিক মানুষের কাছে গেলে এমনিই চোখ বন্ধ হয়ে আসবে, হিসেব করে পা ফেলে চলতে হবে না৷ তাই আগে নিজের ইনটিউশনের প্রতি নজর দিন। আভাস আগে থেকেই পাওয়া যায়। সুর কাটছে মনে হলেই সতর্ক হন। ভালবেসে কেবল এক্সপ্লয়েটই হতে হচ্ছে বুঝতে পারলে তক্ষুণি ওই মানুষটাকে ‘না’ বলতে শিখুন। নইলে কিন্তু নিজের প্রতি অনেক বড় অন্যায় হয়ে যাবে। সারাজীবন একটা সহানুভূতিহীন, নিষ্ঠুর মুখকে নিজের পাশে নিয়ে চলা যায় না। সম্মানটা সম্পর্কে সবচেয়ে জরুরি বিষয়। ওইটুকু থাকলে বাকিটা এমনিই হয়। তাই শিক্ষিত ও সুস্থ ভাবনার মানুষকে ভালবাসুন। যুক্তিহীনতার অসুস্থ অসম্মানের যাপন দেখলে সরে আসুন।

বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর গোটাটাই খারাপ নয়। সবাই-ই ভালবাসতে ভুলে যায় নি, সবার ইতিহাসেই বিশ্বাসঘাতকার দৃষ্টান্ত থাকে না। সবাই অনুভূতিহীন কাপুরুষ হয়না। কেউ কেউ যুদ্ধ করতে জানে পাশের জনের জন্যে। মাটি কামড়ে লেগে থাকতে পারে ভালবাসাকে জেতাতে। কেউ কেউ আজও অজস্রের সঙ্গে বয়ে যাওয়ার চাইতে একের সঙ্গে থিতু হওয়ায় সুখ পায়, আজও কেউ কেউ শরীর দেখে নয় মন স্পর্শ করে কাছে আসে। আজও, হ্যাঁ, আজও অভিমানে জাপটে ধরার, অনিচ্ছাকৃত আঘাতের পর আদরে ভরিয়ে দেবার, প্রচন্ড কান্নায় আগলে রাখার, ঘুমের মধ্যে চাদর টেনে দেবার মানুষ আছে। আছেই। নইলে এত প্রেমের কবিতা গান ছবি… সব যে মাঠে মারা যেত। ভাল আছে। ভালকে থাকতেই হবে। তবে তার আগে যাচাইটুকু বড্ড জরুরি কেননা অনেক খারাপকে পেরিয়ে আমাদের ভালোর কাছে পৌঁছাতে হয়। দুটো ভাল মিলেই তো তৈরি হয় পরশপাথর। সেই যৌথ সুন্দরের ছোঁয়ায় জীবন সোনা হয়ে ওঠে। বাঁচা অসাধারণ আনন্দের হয়ে যায়। মানু্ষ সুখী হয়। তার আর জীবনের কাছে নতুন করে কিচ্ছু চাওয়ার থাকে না।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]