দুরুস কুরা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শাম্মী মারজিয়া

এমনটা প্রায়ই হয় আমার।

একদম অসময়ে হঠাৎ করেই কোন একটা খাবার খেতে খুব ইচ্ছে করে।

যেন তখনই না খেলে বাঁচিনা।

প্রাণটা যেন লুকিয়ে আছে সেই খাবারটার ভেতরে।

একদিন রাত এগারোটায় উঠলো খুব মিষ্টি খাবার ঝোঁক। এদিকে ঘরে মিষ্টি নেই। মিষ্টি জাতীয় তেমন খাবারও নেই। অতোরাতে কিছু কিনে আনবো তাও সম্ভব না আবার নিজে কিছু রাঁধবো, তা ও পারছিলাম না।

ওদিকে মিষ্টি কিছু না খেলে আমার প্রাণ যায় যায়। অস্থির লাগছিলো।

কি কারণে যেন মা ফোন করেছিলো, বললাম মিষ্টি খেতে মন চাইছে। ঘরে নেই।

মা বললো “চিনি খা।

নয়তো গুঁড়ো দুধ খা।”

শেষে ছেলেবেলার মতো চামচে করে চিনি খাই, গুঁড়ো দুধ খাই। নাহ্ গুঁড়ো দুধ চামচে করে খেলে আবার স্বাদ পাই না। হাতের তালুতে নিয়ে চেটে চেটে খাই। শেষে গুড়োদুধ গুলে চিনে মিশিয়ে খাই।

অতো রাতে এসব খেয়ে তবেই শান্তি।

নয়তো সেই রাতে ঘুমই আসতো না।

গতকাল হঠাৎই উঠলো ‘দুরুস কুরা’ খাবার ঝোঁক। তাও যেমন তেমন নয় একেবারে চাঁটগ্যাইয়া দাদীর হাতের রাতা কুরা দিয়ে রান্না ‘দম দুরুস’। শিল পাটায় সমস্ত মসলা বেটে যেভাবে আগেরকালের মানুষেরা দুরুস কুরা রাঁধতেন, ঠিক সেভাবে।

আমি নিজেও পারি ‘দম দুরুস’ রাঁধতে এবং খুব ভালোই পারি। কারণ এটা আমার খুব খুব প্রিয় খাবার। শিখেছিও হাতেকলমে সেই ছেলেবেলায়, চাঁটগ্যাইয়া দাদীর কাছে। সেই দাদী শিখেছিলেন তাঁর দাদীর কাছে। এভাবে পরম্পরায় চলে আসছে, মানে এটা ঐতিহ্যবাহী খাবার।

নতুন জামাই, বেয়াই বা বাড়িতে বিশেষ অতিথি এলে তার সামনে ‘দুরুস কুরা’ পরিবেশনের রেওয়াজ রয়েছে চট্টগ্রামে। খাবার টেবিলে তখন ‘দুরুস কুরা’ না দিলে তাঁদের অসম্মান করা হয়।

আমি মাঝে মাঝে রাঁধি। পাটা পেড়ে আমার ছোট ছোট হাতে ভারি শিল দিয়ে বেটে নিই সমস্ত মসলা। কাঁচা মরিচ বাটতে গেলে এখনো খুব হাতের তালু জ্বলে। এমনকি আদা, রসুন বাটলেও জ্বলে। তবু মিক্সিতে ব্লেন্ড করা মসলা দিয়ে রাঁধলে সেই পুরনো স্বাদ কখনোই আসবে না। হুবহু একই উপাদান দিয়ে একইরকম করে রাঁধলেও।

তো, সন্ধ্যে বেলা হঠাৎই উঠলো সেই দুরুস কুরা খাবার ঝোঁক।

জানি ফ্রিজে আস্ত মুরগী নেই। দেশি মোরগও নেই।

তবু ফ্রিজ খুলে দেখি। আবার বন্ধ করি।

মনটা এমনই খাই খাই করছে, সন্ধ্যেবেলার চা মুড়ি খেতে বসে চুমুক দিতে গিয়ে দেখি কাপে দুরুস কুরার ছবি ভাসে। একমুঠো মুড়ি নিলাম মুখে পুরবো বলে, দেখি মুড়ির গায়ে দুরুস কুরার ছবি। মাথার ভেতরে ঘুরছে শুধুই দুরুস কুরা।

কিন্তু তখন বাজারে কে যাবে! আর দেশি রাতা মোরগ তো সবসময় পাওয়াও যায় না।

বর বললো রেস্টুরেন্ট থেকে আস্ত মুরগীর রোস্ট অর্ডার দিয়ে আনবে কিনা। সেটা তো দুরুস কুরার স্বাদের ধারে কাছেও না। তাই না করলাম। মন খারাপ করে রাতের রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

ঠিক তখনই, আমাদের গলিপথে ‘মুরগী, মুরগী’ বলে মুরগীওয়ালার হাঁক শোনা গেলো।

আমিও দিলাম দৌড়। যে মাপের মুরগীই পাই না কেন, তাই দিয়েই হবে আমার ‘দম দুরুস’।

তখুনি না খেলে যে জান বাঁচে না।

এককেজি চারশো গ্রামের একটা মুরগী পেলাম। খুশিতে আমার টেকনাফ, তেতুলিয়া এক।

প্রথমে চামড়া ছাড়ানো আস্ত মুরগীটা খুব পরিষ্কার করে (মুরগির পেটের ভেতরটা আরো ভালোভাবে) ধুয়ে মুরগির বুকের দুই পাশে সামান্য ছিদ্র করে ডানাগুলো ঢুকিয়ে দিলাম। নিচের দিকে পাঁজরের হাড়ের পাশে সামান্য ছিদ্র করে রানগুলো ঢুকিয়ে দুরুস কুরার শেপ দিলাম। এরপর কাঁটা চামচ দিয়ে পুরো মুরগীটা ভালোভাবে ছিদ্র ছিদ্র করে সামান্য লবন মেখে রেখে বসলাম পাটা নিয়ে। ভাগ্যিস ফ্রিজে একমুঠ নারিকেল কোরা ছিলো। প্রথমে নারকেল, কয়েকটা বাদাম ও ১ টেবিল চামচ পোস্ত দানা বেটে নিলাম। এসব ১ টেবিল চামচ পরিমানের করে দিতে হবে। এরপর পরিমানমতো গরম মসলা (এলাচি, দারুচিনি, তেজপাতা, জয়ত্রী, জয়ফল, গোলমরিচ ও লবঙ্গ) বেটে যখন আদা, রসুন, পেঁয়াজ, শুকনো ও কাঁচা মরিচ, জিরা বাটলাম, হাতে জ্বালা শুরু হলো। তাতে কি দুরুস কুরা খাবো সেই খুশিতেই কোমরে ওড়না পেচিয়ে বসে পড়ি।

এরপর আস্ত সেই মুরগিতে বেটে নেওয়া সব মসলা সঙ্গে পরিমানমতো লবন, আধা চা চামচ হলুদ ও ধনিয়া গুড়ো (এই দুটো পাটায় বাটতে পারিনি, শুকনো হলুদ তো বাসায় নেই আর ধনে বাটতে গেলে জিহবা বেরিয়ে যায় তবু মিহি হয় না) দিয়ে খুব ভালোমতো ডলে ডলে মেখে আধা ঘণ্টা ঢেকে রাখতে হবে, যেন ভেতরে ভালো করে মসলা ঢুকতে পারে।

এরপর চুলায় কড়াই চাপিয়ে সেই মসলাসহ মুরগি আড়াই কাপ পানি দিয়ে ভালোমতো ঢেকে দিতে হবে। ১৫ মিনিট পর মুরগি উল্টে দিতে হবে। এরপর প্রতি ১৫ মিনিট অন্তর উল্টেপাল্টে দিতে হবে যেন সবদিক ভালোভাবে সেদ্ধ হয় এবং ঘন মসলার কারণে পোড়া দাগ না লাগে। ঢাকনাটা ভালোমতো দেওয়া থাকে যেন দমে সুসিদ্ধ হয় কিন্তু ঘর ছাড়িয়ে সেই সুবাস সিড়ি বেয়ে নেমে গিয়ে রাস্তায় হাঁটা ধরে। সে এমনই এক মিষ্টি সুগন্ধ পথ চলতি মানুষ এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাড়াবে।

এরপর মুরগিটা ভালোমতো সেদ্ধ ও মসলা ঘন হয়ে এলে দিতে হবে এককাপ দুধ ও আধা চামচ চিনি।

এবার বাগাড় দেবার পালা। আলাদা কড়াইতে পরিমানমতো সয়াবিন তেলে আধা কাপ পেঁয়াজ কুচি, একটা তেজপাতা, একটুকরো দারুচিনি ও দুটো এলাচি ভেজে, সেই তেল সমেত মুরগির কড়াইতে ঢেলে দিয়ে আবারো ঢাকনা দিতে হবে। মন চাইলে একম চামচ ঘি দেওয়া যেতে পারে। একটা বলক আসলেই রান্না কমপ্লিট অসাধারণ স্বাদ গন্ধে ভরা ‘দুরুস কুরা’।

এতো স্বাদের রান্না কি আর সাদা ভাত দিয়ে খাবো!

সেই রাতে রাঁধলাম পোলাও।

তর সয় না। চুলা থেকে নামিয়েই বসে পড়লাম খেতে।

দুরুস কুরা কিন্তু হাত দিয়ে ছিড়ে খেতে হয়। প্রথমে রানের টুকরো ছিড়ে নিয়ে খাই। সে এক স্বাদ। এরপর বুকের মাংস ছিড়ে খাই, সে আরেক স্বাদ।

এরপর পাখনা, হাড্ডি চিবুয়। তা আবার অন্য স্বাদ।

আর সুগন্ধে পাগল করা ঘন ঝোল, চামচ দিয়ে একটু নিয়ে ভাত দিয়ে মেখে খাই।

একটু ঝোল শুধু শুধু খাই। এর সঙ্গে অন্য কোন খাবারের তুলনা চলে!

মোটেও না।

বহুদিন পর মন ভরে সেই পুরনো স্বাদের দুরুস কুরা খেলাম।

আমাদের ঐতিহ্য।

আর ঐতিহ্য ধরে রাখা তো আমাদেরই কর্তব্য।


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments