দুর্গে বিষাদ আছে…

স্বরূপ সোহান

 দুর্গ শব্দটির সঙ্গে কোথায় যেন একটা বিষাদ মিশে থাকে। অস্ত্রের ঝনঝনানি বা বন্দীদের চাপা কান্না দিয়ে বুক ভারী করা এক গুমোট পরিবেশ। শত শত বছর জুড়ে শাসকশ্রেনী তাদের ক্ষমতা আর রাজত্ব কুক্ষিগত করার জন্যে পৃথিবীতে তৈরী করেছে একের পর এক দুর্গ। অথচ সেই ক্ষমতা আর রাজত্বের কিছুই বাকী নেই। দেয়ালে দেয়ালে আবদ্ধ এসব প্রাচীন দুর্গের যাপিত দিনগুলো তাই এখন শুধুই ভুলে যাওয়া ইতিহাস।

স্টার্লিং ক্যাসেল

এই সময়ের মানুষ বরং দুর্গ ভ্রমনে যায়। মুগ্ধ হয় স্থাপত্য সৌন্দর্যে। খুঁজে ফেরে বিনোদন। বিষাদময় ইতিহাস তাকে টানে না।ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই রয়েছে। অনেকে হয়তো দুর্গে যান প্রাচীন দিনগুলিকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে। তবে ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে দুর্গ যে আজকাল বিনোদনের কেন্দ্র হয়ে উঠছে তা খোদ যুক্তরাজ্যেই দেখে এলাম। স্কটল্যান্ডে ইবিস হোটেলের ছেলেটা মহা করিৎকর্মা। প্যাকেজট্যুর আপনি নিতে না চাইলেও ঝুলোঝুলি করতে থাকবে। রিসিপশনে টেবিলজুড়ে তার শুধু অফার আর অফার। আর তাই হোটেলে চেক-ইন করেই ভাবলাম অফারগুলোতে একবার চোখ বুলাই। এডিনবরায় থাকবো মোটে দুইদিন। তাই বেষ্ট অফারটাই লাগবে। অবাক ব্যাপার হচ্ছে সব অফারেই একটা স্পট কমন। স্টারলিং ক্যাসেল। দুর্গ দেখার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না। কিন্তু হোটেলের দেয়া সব ট্যুর অফারেই ঘুরেফিরে এই স্টারলিং দুর্গ। মরিস, মানে রিসিপশেনের ছেলেটা আমার খুতখুতানি দেখে বলেই বসল, ‘ষ্টারলিং ক্যাসেল বাদ দিয়ে তুমি স্কটল্যান্ড ট্যুর শেষ করতে পারবে না। আমি কনফার্ম তুমি এনজয় করবে।’ এরপর তো আর কথা চলে না। ঠিক হল পরদিন ভোর সাতটায় সেইন্ট গেইল গীর্জার সামনে আমাদের গাড়ি অপেক্ষা করবে।
ট্যুর তো কনফার্ম করলাম। কিন্তু মনটা খচখচ করছিলো। ধুর, ক্যাসেল দেখে কি হবে। দিল্লী, আগ্রা এমনকি লন্ডনেও তো কম ক্যাসেল দেখলাম না। সেই একই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়। কিন্তু না। আমার সব ভুল নিমিষেই ভেঙ্গে গেল। এডিনবরা থেকে ষাট কিলোমিটার পথ। গ্লাসগোর পথে স্টারলিং। মাত্র একঘন্টা ড্রাইভে পৌছে গেলাম স্টারলিংয়ে। পাহাড়ের চুড়োয় নিয়ে ড্রাইভার যথন ব্রেক করলো তখন গাড়ী থেকে আমরা সবাই নামতেই ভুলে গেলাম। জানালা দিয়ে বিষ্ময়ে দেখছিলাম ষ্টারলিং ক্যাসেল। কী অপুর্ব স্থাপত্য ! কী বিশাল তার আয়তন ! সকালের রোদ যেনো হীরের আলোকছটা দিচ্ছে দুর্গের সবকয়টা চুড়োয়। এই সৌন্দর্য যেন স্বর্গের।

দুর্গের প্রবেশপথ

অথচ কে বলবে এই দুর্গ রক্তাক্ত হয়েছে বহু বহু বার। এই দুর্গেই সবচাইতে বড় যুদ্ধটি হয়েছিল ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের মধ্যে সেই ১৫১৩ সালে। ব্যাটেল অব ফ্লোডেন খ্যাত এই রক্তাক্ত যুদ্ধে স্কটিশ রাজা চতুর্থ জেমসকে নির্মম ভাবে হত্যা করে ব্রিটিশরা রাজত্ব দখল করে নেয়। বলে রাখা ভাল, এই স্কটিশ রাজাই কিন্তু স্টারলিং ক্যাসেলের পরিবর্তিত গোড়াপত্তন করেন, যা আজো টিকে আছে। সময়কালটা ছিল ১৪৭৩ থেকে ১৫১৩ অর্থাৎ তার মৃত্যু পর্যন্ত । এই দুর্গটির নির্মানকাল ধারনা করা হয় দ্বাদশ শতকের শুরুর দিকে।  ভৌগলিকভাবে দুর্গটিকে এমনভাবে নির্মান করা হয়েছে যাতে শত্রু আক্রমণ থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া যায়। এর তিনদিকে এমনভাবে খাড়া বাধ দেয়া যাতে নিরাপত্তা বূহ্য ভেদ করা কারো পক্ষে সম্ভব না হয়।

দুর্গের ভেতরে

আর স্কটল্যান্ডের গুরুত্বপুর্ন নদী রিভার ফোর্থ অন্তত ১৮৯০ সাল পর্যন্ত এই ষ্টারলিং ক্যাসেলকে চারপাশ দিয়ে আগলে রেখে নিরাপত্তা দিয়েছে। শত শত বছরে এই ক্যাসেল বার বার স্কটিশ আর ব্রিটিশদের মধ্যে হাতবদল হয়েছে। এই ক্যাসেলেই রাজকীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে রাজমুকুট পরেছেন স্কটিশ রাজা রানীরা।তাদের মধ্যে মেরী কুইনস অব স্কট বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কুইন মেরী তার জন্ম থেকে আমৃত্যু এই দুর্গেই কাটিয়ে দিয়েছেন। আর এখন প্রাচীন এই দুর্গটি রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে আছে হিস্টোরিক এনভায়রোনমেন্ট অব স্কটল্যান্ড। লেখার একেবারে শুরুতেই বলছিলাম যে, আজকের গ্যাজেটনির্ভর আধুনিক মানুষকে বিষাদময় ইতিহাস আর টানে না। তারা চায় আনন্দময় ভ্রমন। তাই যখন অন্যান্য পর্যটকদের সংগে টিকেট কেটে স্টারলিং ক্যাসেলে ঢুকছি, তখন অবাক হয়ে দেখলাম টিকেটের সংগে দেয়া হিস্ট্রি রেকর্ডার আর হেডফোনে তেমন কারো আগ্রহই নেই। সবার হাতে রেকর্ডার আছে ঠিকই কিন্তু কেউই ঠিকমততো শুনছে না।

নিঃসঙ্গ প্রহরী

বরং ক্যাসেলের স্থাপত্য সৌন্দর্য বিভোর প্রায় সবাই। আবার কেউ কেউ ব্যস্ত ক্যাসেলের ভিতেরে খুলে বসা স্যুভনির শপ থেকে প্রিয়জনের জন্য কেনাকাটায়। সবচাইতে বেশী ভীড় দেখা গেল ক্যাসেলের টপ ট্যারেসে। মনোরোম পরিবেশে সেখানে রয়েছে ক্যাফে। ‘ইউনিকর্ন ক্যাফে’। স্কটিশ স্ন্যাকস আর গরম কফির মগে চুমুক দিতে দিতে সবাই ক্যাসেলের চুড়ো থেকে অপুর্ব সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করছে। কী হবে রক্তাক্ত ইতিহাসে ফিরে গিয়ে। জীবন তো বর্তমান। তাই উপভোগ করা যাক ষোলোআনাই।

ছবিঃ লেখক, গুগল