দু’শ বছরের এক জুয়াড়ি…

প্রথম বার পশ্চিম ইউরোপ ভ্রমণের সময় জার্মানির উইসবাডেন শহরে জুয়ার আসরে যোগ দিয়ে এক জুয়াড়ি এগারো হাজার ফ্রাঁ জিতে যান। কিন্তু আবারও খেলতে গিয়ে টাকা উড়ে গেলো হাত থেকে। বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে সাহায্যের জন্য দেশে দাদাকে চিঠি লিখতে হয়েছিলো। দ্বিতীয় বার জুয়ায় জিতে ফের দশ হাজার চারশো ফ্রাঁ পকেটে। তার থেকে কিছু টাকা দেশে আপনজনদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, বাকি টাকাটা নিয়ে আরও কয়েক দান খেলতে গিয়ে আবারও নিঃস্ব হওয়া। হোটেলের বিল, গাড়িভাড়ার টাকা বুদ্ধি করে সরিয়ে রেখেছিলেন বলে বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু জুয়ার উদভ্রান্ত নেশা তাঁর পিছু ছাড়েনি। অন্য এক শহরে গিয়ে আবারও জুয়ার টেবিলে সব হারিয়ে অসুস্থ স্ত্রীর জন্য পাঠানো টাকা ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠাতে হয়েছিলো তাকে। জুয়াড়ির নাম ফিয়োদর মিখাইলোভিচ দস্তয়েভস্কি— কিংবদন্তি রুশ ঔপন্যাসিক ও গল্পকার— জন্মেছিলেন ১৮২১-এর ১১ নভেম্বর।

এই প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিকের দু`শ তম জন্মদিন অতিক্রান্ত হলো গতকাল। প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে এবার রইলো দুশ বছরের এক জুয়াড়ি`।

 

দস্তয়েভস্কি ও আনা

‘দ্য গ্যাম্বলার’ উপন্যাসে জার্মানির মনোরম সব শহরে জুয়ার নেশায় নিজেকে হারিয়ে ফেলা দস্তয়েভস্কিকেই। দ্বিতীয় বার ইউরোপ ভ্রমণের সময় তাঁকে পেয়ে বসেছিলো অনিন্দ্য সুন্দরী পোলিনা সুস্লোভাকে পাওয়ার নেশা। বছর দুই আগে আলাপ হয়েছিলো দু’জনের। সাহিত্যে উৎসাহী পোলিনার মধ্যে চিন্তার ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। সব মিলিয়ে সেই নারীর গভীর আকর্ষণে জড়িয়ে গিয়েছিলেন এই কথা সাহিত্যিক। সে বার সেই উদ্দাম সফরে জুয়াড়ি তাঁর জুয়া খেলার সঙ্গেও জড়িয়ে ফেলেছিলেন পোলিনাকে। নিজের সব হারিয়ে কখনও প্রেমিকার আংটিও বন্ধক দিতে হয়েছে দস্তয়েভস্কিকে।  আবেগে উথালপাথাল সেই দিনগুলো অনিশ্চয়তার এক আশ্চর্য উপাখ্যান।

তেইশ বছর বয়সে দস্তয়েভস্কি মিলিটারি ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি ছেড়ে দেন। উদ্দেশ্য, সাহিত্যে আরও মনোযোগ দেওয়া। অর্থকষ্ট তখন থেকেই তার জামার পকেটে স্থায়ী আশ্রয় তৈরি করে নেয়। হয়তো অর্থকষ্ট থেকেই তাঁর ভেতরে মাথা তুলেছিলো জুয়ার নেশা। জীবনীকার জোসেফ ফ্রাঙ্কের মতে, জার্মানিতে প্রকৃত অর্থে জুয়ার নেশায় মজেছিলেন তিনি। যক্ষ্মা কেড়ে নিয়েছিল স্ত্রী মারিয়াকে। প্রেম করে বিয়ে। খুব সুখকর দাম্পত্য কাটাতে না পারলেও দু’জনের মনের টান ছিলো। শেষ দিকে সে জীবনে দমকা হাওয়ার মতো এসে হাজির হয়েছিলেন পোলিনা। কিন্তু স্ত্রীর শেষ দিনগুলোয় কাছে ছিলেন তিনি। অতি প্রিয় অগ্রজও কিছুদিন পরেই বিদায় নিলেন পৃথিবী ছেড়ে। তাঁর কাঁধে তখন পরিবারের ঋণের পাহাড়। সঙ্গে অগ্রজের পরিবারের দায়িত্বও। কী করবেন দস্তয়েভস্কি? ধূর্ত প্রকাশক স্টেলোভস্কির কাছে হাত পাতলেন। এ যাবৎ যা কিছু লিখেছেন, সব তাঁর হাতে তুলে দিয়ে পেলেন তিন হাজার রুবল। সঙ্গে একটি শর্ত। পরের বছরে লিখে দিতে হবে একটি নতুন উপন্যাস। না পারলে পরবর্তী ন’বছর যা তিনি লিখবেন কোনও পারিশ্রমিক ছাড়াই তুলে দিতে হবে স্টেলোভস্কির হাতে। আকণ্ঠ ডুবে গেছেন তিনি তখন। মন বিপর্য়স্ত। এই উভয় সংকটে ভালো উপন্যাস কেমন করে লেখা হবে? কিন্তু লিখতে না-পারলে তো নয় বছরের জন্য উপার্জনের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। বাঁধা পড়ে যাবেন স্টেলোভস্কির মতো শঠ লোকের হাতে। একদম খাদের ধারে দাঁড়িয়ে দস্তয়েভস্কি অদ্ভুত এক জুয়ার দান ফেলেছিলেন।

১৮৬৫-র জুলাই মাসের শেষে দস্তয়েভস্কি উইসবাডেন শহরে ফিরেছিলেন আবার।  স্টেলোভস্কির টাকায় বাজারের দেনা মিটিয়ে যে সামান্য অর্থ তাঁর হাতে ছিলো সেটাই ছিলো সম্বল। সেই সম্বলকে জুয়ার আগুনে গুঁজে দেন কিন্তু না, তৃতীয় বারও জুয়ার দানে সর্বস্বান্ত হতে হলো তাকে! হোটেলের বিল না মেটাতে পারায় মালিক খাবার বন্ধ করে দিলেন। দিন কাটতে লাগল না খেয়েই। লজ্জার মাথা খেয়ে পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি লিখলেন তিনি। কিন্তু কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি সেদিন।

জুয়ার দান শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিলেও দস্তয়েভস্কি কখনও ভাবেননি পোলিনা তাকে ফিরিয়ে দেবেন। দু’জনের দেখা হলো আবার। কিন্তু দেখা দিয়েও ধরা দিলেন না পোলিনা। কপর্দকশূন্য এবং বিধ্বস্ত দস্তয়েভস্কিকে নিয়ে তার আর কোনো আগ্রহ ছিলো না। খালি পেটে উইসবাডেনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ান হৃতসর্বস্ব এক জুয়াড়ি। তেমনি এক ক্লান্তি আর হতাশায় মোড়া দিনে রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে এক শুভার্থীর পরামর্শে ‘রাশিয়ান হেরাল্ড’ পত্রিকার সম্পাদক কাতকভকে প্রস্তাব পাঠালেন, একটি গল্প বা ছোট উপন্যাস লিখবেন তাঁর পত্রিকার জন্য। প্রস্তাবে এটাও বললেন, তলস্তয় তাঁর পত্রিকায় লেখার জন্য যে পারিশ্রমিক পান, তার অর্ধেকেরও কম পারিশ্রমিকে তিনি লিখবেন। সে বছর ‘রাশিয়ান হেরাল্ড’-এ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হতে শুরু করেছিলো লিয়ো তলস্তয়ের উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্যের এক অক্ষয় কীর্তি, ‘ওয়র অ্যান্ড পিস’। তখনকার মতো বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে অগ্রিম হিসেবে দস্তয়েভস্কি চেয়ে পাঠালেন তিনশো রুবল। অগ্রিম এসেছিলো, তবে বেশ দেরিতে। তত দিনে স্থানীয় এক ফাদারের সাহায্য পেয়ে দেশে ফিরে এসেছেন তিনি। ‘রাশিয়ান হেরাল্ড’-এর সঙ্গে তখনই শুরু হয়েছিলো তাঁর যাত্রা। উইসবাডেনের হোটেলে জুয়া খেলার পাগলামি, পোলিনার সঙ্গে কাটানো এলোমেলো কিছু মুহূর্তের উত্তেজনার ফাঁকে অঙ্কুরিত উপন্যাসের রূপরেখা পাল্টে গেলো তাঁর কলমে। ১৮৬৬-র জানুয়ারি থেকে কাতকভের পত্রিকায় দস্তয়েভস্কি লিখতে শুরু করলেন। জন্ম নিলো বিশ্বসাহিত্যের অসাধারণ উপন্যাস ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’। এই উপন্যাস প্রকাশিত হবার পর পত্রিকাটির বিক্রি এক লাফে পাঁচশো কপি বেড়ে যায়।

উইসবাডেন থেকে দেশে ফেরার পর নানা শারীরিক অসুস্থতা, বিশেষত মৃগী রোগের আক্রমণ দিন দিন অসহনীয় হয়ে ওঠে। সঙ্গে ছিলো পাওনাদারদের উপদ্রব। আর ভয়ংকর নিয়তির মতো পেছনে তাড়া করে আসছিলো স্টেলোভস্কির সঙ্গে খেলা যে জুয়ার পরিণাম। কী করবেন দস্তয়েভস্কি? শর্তের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু লেখা হচ্ছে না একটি শব্দও। এক বন্ধু পরামর্শ দিলেন, স্টেনোগ্রাফারের সাহায্যে লিখতে। তখন  স্টেনোগ্রাফি ব্যাপারটা ছিলো একদম নতুন। কিন্তু সদ্য চালু হওয়া স্টেনোগ্রাফি কোর্সের   সেরা ছাত্রী আনা স্নিতকিনাকে কপাল গুনে পেয়ে গেলেন তিনি। দুপুর থেকে বিকেল কয়েক ঘণ্টা তিনি মুখে-মুখে বলে যান তাঁর কাহিনি। আনা শর্টহ্যান্ড নেন নোটবুকে। মাত্র ছাব্বিশ দিনে সম্পূর্ণ হয়ে যায় নতুন উপন্যাস ‘দ্য গ্যাম্বলার’। স্টেলোভস্কির শর্তের শেষ তারিখের ঠিক আগে আগেই লেখা শেষ করেছিলেন দস্তয়েভস্কি। কিন্তু হাওয়া হয়ে গিয়েছিলেন ধূর্ত স্টেলোভস্কি। সদ্য শেষ হওয়া উপন্যাস হাতে ধরিয়ে দিয়ে দস্তয়েভস্কি যাতে শর্ত জিততে না পারেন, সে জন্য গা ঢাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু আনার বুদ্ধিতে আইনের দ্বারস্থ হয়ে সেই জুয়ায় জিতে যান দস্তয়েভস্কি।

স্টেলোভস্কির সঙ্গে খেলায় এ বার যখন বাজি জিতলেন, তাঁর বয়স পঁয়তাল্লিশ। অনেকটা বিজয় উদযাপনের জন্য এক রেস্তোরাঁয় ডাকলেন আনাকে। আনার মনেও তখন বেজেছিলো বিদায়ের সুর। কিন্তু দস্তয়েভস্কির মনে তখন তাঁর থেকে ২৫ বছরের ছোট আনার জন্য আলাদা একটা জায়গা তৈরি হয়ে গেছে। নিঃসঙ্গ, অসুস্থ কথাশিল্পী সেই তরুণীর সঙ্গে সময় কাটিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর আঁধারমনে উজ্জ্বল আলো জ্বালিয়ে দেয় মেয়েটির উপস্থিতি। সেদিনই তিনি অস্থির হয়ে আনাকে বলেন ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাস শেষ করতে তার সাহায্য লাগবে। আনাও এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। দস্তয়েভস্কি শুরু করলেন তাঁর নতুন উপন্যাসের কথা। সে উপন্যাসের বিষণ্ণ নায়ক জীবনে হারিয়েছেন বহু কিছু, সমস্যার ভারে নুয়ে পড়া মানুষটি দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত। দস্তয়েভস্কি আনাকে প্রশ্ন করলেন— এই নায়কের প্রেমে পড়া কি মেয়েটির পক্ষে সম্ভব? আবেগতাড়িত আনা উত্তর দিয়েছিলেন— কেন অসম্ভব? সে ভালবাসতেই পারে শিল্পীকে।আনা গভীর আন্তরিকতায় তাঁর ভালবাসার কথা জানিয়েছিলেন সেই জুয়াড়িকে। জুয়াড়ি দস্তয়েভস্কি জিতে গিয়েছিলেন। আনার সঙ্গে দস্তয়েভস্কি জীবনের শেষ ১৪ বছর বছর কাটিয়েছিলেন। সেই সময়কাল তাঁর আজন্ম বেদনার দীর্ঘ কাহিনির মাঝে আনন্দের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর অগোছালো জীবন পাল্টে দিতে আনার চেষ্টার কমতি ছিলো না।

১৮৮১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার দু’মাস আগে দস্তয়েভস্কি সম্পূর্ণ করে গিয়েছিলেন তাঁর শেষ উপন্যাস ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজ়ভ’। উপন্যাসটি তিনি উৎসর্গ করে যান আনাকে, যার হাত ধরে তিনি জিতেছিলেন জীবনের অনেক বাজি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box