দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

পর্ব – ৫

এখন যেখানে আমেরিকার দূতাবাস। বারিধারার ঠিক সেখানে, সার্কাসের প্যান্ডেল নাড়া বেধেছিলো।  একবছর আগে পরে, পাশেই বসেছিলো যাত্রার প্যান্ডেল। তখনো পর্যন্ত বারিধারায় একটিও দালান হয়নি। বিগত শতাব্দীর আটের দশকের কথা এসব। আমরা বড় হই তখন গুলশান থানাধীন শাহজাদপুর নামে গ্রামটিতে। গ্রামের পশ্চিম দিকে লেক। লেক পেরুলে ‘নীরব এলাকা’-গুলশান। আর তখনো গুলশান মানে একটা একতলা কিংবা দোতলা বাড়ি। তারপর কয়েকটা প্লট খালি। আর ছোট ছোট বাড়ির সামনে বড় বড় বাগান। আমাদের কাছে  গুলশান মানে বাংলা সিনেমায় দেখা নাইটগাউনপরা নায়িকার বড়লোক বাবা ‘চৌধুরী সাহেব’দের বসবাস। তখন অবশ্য অনেক ইংরাজ( বিদেশি মানেই আমরা তখন ইংরাজ বলি) দেখছি গুশলানে। আর তখন রোববার ছুটির দিন হওয়ায় গুলশানের পার্কে, মাঠে  বিদেশিদের অনেক খেলা, দৌড়, আয়োজন দেখেছি।  তখনতো বারিধারা মানে কিছু ধানের ক্ষেত। কিছুটা উচু-নিচু ভূমি। সেই ভূমিতে কেউ কেউ লাউয়ের টাল বা জাঙলা করতো। আমরা নিকটে গিয়ে দেখেছি লাউডগায় দুধসাদা ফুল। কিছুদিন পর  সেখানে কচি কচি সবুজ লাউয়েরা বাতাসে দোল খেতো। সেই লাউ জাঙলার পাশি দিয়ে, মাটির পথে বিদেশিরা দল বেধে দৌড়ে বেড়াতেন। আর দু-একজন বিদেশি তরুণ  মোটর সাইকেল নিয়ে আমাদের গ্রামের ভেতর আসতেন। অনেক পরে জেনেছি ওই গ্রামে কেউ একজন গাঁজা বেচতো। আর গাঁজায় ছিলো ওই বিদেশি তরুণদের প্রিয় নেশা।

তো, বারিধারায় আমরা প্রথম দেখলাম ভ্যাটিক্যান দূতাবাস। তারপর হলো নেপাল দূতাবাস। তারও আগে ওই যে যাত্রার প্যান্ডেল বসলো। সেখানেই প্রথম যাত্রা দেখা আমার; আমাদের। তখনতো আমাদের স্কুলবেলা। অযুত-নিযুত নিধি-নিষেধের পাহাড়।

তারপরও  বড়দের চোখ এড়িয়ে আমরা কজন ‘শিশু’ ঢুকে পড়ি। চোখের সামনে আলো ঝলমলে মঞ্চ। বন্দনাগান দিয়ে শুরু হয় যাত্রা। এই রাজা, এই রানি, এই রাজকন্যা-আসেন যান।

রাজকন্যার প্রেম হয় গরীব মুসাফিরের সঙ্গে। মাঝ মাঝে দলবেধে নৃত্যগীত হয়। আমরা নির্মিমেষ তাকিয়ে, দেখতে থাকি। যাত্রা মঞ্চের পাশেই একটু খোলা জায়গা। সেখানে দেখানো হয় অনেক মরণ খেলা। এক নারী। তার চোখ কালো কাপড়ে বাঁধা। তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয় একটি কাঠের বোর্ডের সামনে। মূর্তির মতো কাঠে হেলান দিয়ে ওই নারী। মাপা দূর থেকে এজন নিপুণ কৌশলে একের পর এক ধারালো চাকু ছুড়ে মারেন । গেথে

ফেলেন নারীর চারদিকে থাকা কাঠের বোর্ডের ফাঁকা অংশে। এমন খেলায় আমরা একটু ভয় পাই, আবার ভালোও লাগে। একটু পরই দেখি যে নারীকে মধ্যমনি করে চাকু ছোঁড়া হলো তিনি মাইক্রোফোন হাতে গান গাইছেন। ‘সোন চম্পা, সোন তারা..’

যাত্রার সেই মঞ্চ, সার্কাসের অবাক খেলা, গান-গল্প আজো বুকের গভীর তলে হীরকদ্যুতি হয়ে রিনিকঝিনিক আলোতোলে!

তখন পুরো বারিধারাই যেন একটা খেলার মাঠ। দুটো বড় বড় মাঠ বরাদ্দ ছিলো ফুটবল খেলার জন্যে। গরমকালের বিকেল বেলা আমাদের অনিবার্য ঠিকানা ছিলো সেই মাঠ। শীতকালে ব্যথার ভয়ে ফুটবল খেলা মুলতবি করে  কোর্ট কেটে, নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে খেলা হতো ব্যাডমিন্টন। আর বর্ষাকাল মানে বারিধারায় বৃষ্টির পানি জমে থাকতো এখানে সেখানে। তেমনি এক বর্ষাদুপুরে আমরা অনেক বড় এটা কৈ মাছ পেলাম  এখন যেখানে নেপাল অ্যাম্বাসি তার পাশের ধানক্ষেতে। আরেক বিকেল বেলা, তখন নেপাল অ্যাম্বাসির দালানের কাজ শুরু হয়েছে। একটা বকপাখি পুব দিকে থেকে উড়ে এসে বাড়ি খেলো দেয়ালে। আমরা বন্ধুরা মিলে সেই আহত বকের সেবা করলাম। আর সন্ধ্যা নামার আগেই বক পাখি পুরোপুরি উড়াল ক্ষমতা ফিরে পেলো। তখন আমাদের যে কী ভালো লেগেছিলো। মনে হচ্ছিলো আমরা একটা যুদ্ধ জয় করে রাজকুমারী হাতে পেয়েছি!

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]