দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

পর্ব – ৬

সন্ধ্যা নেমে আসে কীভাবে পৃথিবীতে? কুয়াশায় ভর করে? ডাহুকের পায়ে পায়ে? কে জানেন? জীবনানন্দ দাশ? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর?

সন্ধ্যানামা দেখবো বলে, সন্ধ্যার রঙ মনে মাখবো বলে কতোদিন বসে থেকেছি নদীতীরে। নদীরবুকে। বনে, বনভূমিতে। দিন ফুরিয়ে যায়, ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে চরাচরে। এতোটা হলাহলহীন। এতোটা নৈঃশব্দ্যের ভেতর একটা মুহূর্ত সৃষ্টি হয়। এমন মায়াধরানো সেই ক্ষণ, সেই মুহুর্ত।

দিন যায় যায়। পদ্মা নদীর বুকে আমরা ক’জন নৌকায় ভেসে। তখন ভরা বর্ষা। পদ্মা অন্য তারুণ্যে জলের খেলা খেলে বাতাসে বাতাসে। আমাদের নৌকা দোলে বিপুল হাওয়ায় আকাশের দিকে মুখতোলা কচি লাউডগার মতো। তখন কী একটু ভয় এসে টোকা দিয়েছিলো কোথাও? আজ আর মনে নেই সেই বিগতক্ষণ। তবে আমরা তখন জলের সাম্রাজ্যে, নদীর ওপর সন্ধ্যানামা দেখবো বলে, সন্ধ্যাকে স্পর্শ করবো বলে বিভোর। জলের ওপর নৌকা। ঢেউয়ের তালি। জলের উল্লাস। এরই মধ্যে নেমে আসে সন্ধ্যা। আলোহীন এক লাবণ্যভরা আলো ছড়িয়ে আমাদের স্তব্ধ করে দিয়ে আসে সন্ধ্যা। নদীর ওপর আমরা সত্যি সত্যি সন্ধ্যার ছবি দেখি, ঘ্রাণ পাই।

একবার, আমরা ক’জন নগরবাসী সন্ধ্যানামা দেখবো বলে গিয়েছিলাম ছাতিয়ানতলী গ্রামে। বিক্রমপুরের এই গ্রামটি নানা কারণে আমাদের কাছে এখন রীতিমত ইতিহাস। বাংলার একেক ঋতুতে বিক্রমপুরের রূপ একেকরকম। তো আমরা এক হেমন্তে, ঠিক ধানকাটার পর ছাতিয়ানতলী গিয়েছিলাম সন্ধ্যানামা দেখতে। বর্ষার পানি নেমে যাওয়া ছোট্ট খালে তখনো একটু পানি ছিলো। সেই পানিতে দলবেধে হাঁসেরা খেলা করছিলো; একটুখানি প্রেমও বাদ যাচ্ছিলো না। আমরা তখন বসেছিলাম খালের পাড়ে। মাথার ওপর অসীম শূন্য আকাশ। দূরে গাছে গাছে বনভূমিরেখা তৈরি করে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাম। আর কাছাকাছি বিশাল বিল। এই বিলে, এসব ক্ষেতে ক্ষেতে ক’দিন আগেও ছিলো ফসল। তা উঠে গেছে ঘরে ঘরে । আবার মাটি, নরম মাটি তৈরি হচ্ছে নতুন বীজ পাবে বলে। আমাদের হাতের তলে সবুজ-কোমল ঘাস। একটু উচুভূমি। সেই ভূমি ছাড়িয়ে নিকটদূরে একটা পুকুর। পুকুর পাড়ে সরষে ক্ষেত। হেমন্তের বাতাস সেই রাঙাবনে দোলা দেয়। একটা ফিঙে নেচে বেড়ায় ক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কঞ্চির প্রশাখায়। খালের ওপারে তিনটে শাকিল; কথা বলে, খাদ্য খুঁজে, সতর্ক হয়, উড়াল দেয়। ঠিক তখন, দিন কোথায় হারিয়ে যায়। ধীরে ধীরে, হিমপড়ার মতো সন্ধ্যা নেমে আসে। আমাদের কারো  কোনো কথা নেই; কথা থাকে না! বিলের ওপর দিয়ে, দূরের গ্রামের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আমরা একটুপর আর কিছুই দেখি না। পাশের বাঁশবনে পাখিদের সুরেলা ঝংকার। আমরা সেই সুরঝংকার বুকে পুরে, সন্ধ্যাররূপ মনে ধরে রেখে নগরে ফিরে আসি।

এবং, আরেকবার আমরা ক’জন সন্ধ্যা নামা দেখতে গিয়েছিলাম শহর থেকে একটু দূরের বনে। বনে, বনভূমিতে সন্ধ্যা নামে পাখিদের ডানায়-পাখায় পাখায়। প্রজাপতির উড়ালে উড়ালে আর ফড়িঙের নৃত্যে। আমরা হৈ চৈ, কোলাহল মুলতবি রেখে বসে থাকি। তখনো বটের পাতায় পাতায় দিনশেষের আলোরা ঝিলিক তোলে। দূর, আরো দূর থেকে  ফিরে আসে কিছু পাখি। গাছে গাছে আরো পাখিদের এতো এতো সংলাপ, দিনভ্রমণের চিত্রনাট্যআয়োজন। এতোসব সুর, তাল। ঠিক তার মাঝে, ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে। তারপর আর আমাদের কথারা ফিরে আসতে চায় না। আমাদের দৃষ্টি দূরবর্তী হতে চায় না। আমাদের মন কিছুতে লাগতে চায় না। তাহলে কী একেই বলে মায়াবীসন্ধ্যা। দিন শেষে রাত আসার আগের একটুখানিক্ষণ! একটা রেশমি মিহিসুতোর সেতু। খুব কাছে টানা, খুব পাশে থাকা শব্দ- সন্ধ্যা!

মানুষের মন বুঝতে না পারা, অপার জলিরাশির সমুদ্রতীরে দাঁড়িয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে অথবা দলবেধে সন্ধ্যানামা দেখার আনন্দ থাকে, থাকে গভীর বেদনা। আর পাহাড়ের গ্রামে, চুপচাপ বসে থেকে সন্ধ্যানামা দেখে মনে হতেই পারে-

‘সন্ধ্যার কাকের মতো আকাঙ্ক্ষায় আমরা ফিরেছি যারা ঘরে;/ শিশুর মুখের গন্ধ, ঘাস, রোদ, মাছরাঙা, নক্ষত্র, আকাশ/ আমরা পেয়েছি যারা ঘুরে-ফিরে ইহাদের চিহ্ন মারো-মাস;’

ছবি:গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]