দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

সাত.

বাতাসে ভর করা সেই যন্ত্রপাখি- বিমান যখন আটলান্টিক পারি দিচ্ছিলো, তার পেটের ভেতর বসে, চোখ বুঁজে আমার কেবলি মনে হচ্ছিলো- ‘কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে; কোথায় যায় মানুষ?’

মরু শহর দোহা থেকে অবিরাম জেগে থাকা শহর’ নিউ ইয়র্ক পৌঁছতে ১৪ ঘণ্টা লাগবে; এটা জানার পর রীতিমত আতঙ্ক কাজ করতে থাকে। বিমানের মাপা পরিসর, ইকোনমিক ক্লাসের চিপা আসনে কী করে কাটবে এতোটা সময়! ঘুম আসবে? চিঠি লেখবো কাউকে? কাকে? বই খুলে ধরবো দৃষ্টিসীমার নাগালে? গান শুনবো? দেখবো সিনেমা? নাকি অসীম এই শূন্যতায় বসে চুমুক দেবো বিমানসেবকের নিপুণ হাতে বানানো উড়ালপেগে?

মানুষের বানানো অবাক সে পাখি উড়ে চলে অসীম আকাশ আর বিশাল জলরাশির মাঝ পথ দিয়ে। পুব থেকে পশ্চিমে, যে আকাশপথে ধায় বিমান, তা আবার পর্দায় ভেসে উঠে। আকস্মিক, গায়েবি আওয়াজ-এর মতো নাড়া দেয় বিমান চালকের কণ্ঠ। কোথায়, কত উচ্চতায়, কেমন আবহাওয়ায় রয়েছে সকলে তার একটু, বর্ণনা সাজানো-পরিপাটি গলায়। তবে এটা তো ঠিক কোনো কিছুতেই  সময় আর  যেতেই চায় না। আর হাওয়ার জাহাজে উড়ে যেতে যেতে ভাবি, এর আগে মানুষ কত কত সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়েছে কেবল নৌকা-জাহাজে করে। মানুষ পেরেছে!
কত ভাবনা পেয়ে বসে! এই উড়োজাহাজ কি পৌঁছতে পারবে কাঙ্ক্ষিত বন্দরে।  এ যাত্রা শুরু ভোর হবার একটু আগে। আমরা কী দেখতে পারবো আরেকটি সকাল, আরেকটি, দুপুর, আরেকটি সন্ধ্যা? এসব ভাবনাপথে একটা বিস্ময়কর কাণ্ড ঘটেই চললো। যে ভোরকে সঙ্গী করে আমরা শুরু করেছিলাম উড়ালযাত্রা; ১৪ ঘণ্টা  পর মার্কিন মুকুলের নিউইয়র্ক আকাশবন্দরে বিমান যখন নামে, তখন সকালের সোনারোদ চারিদিকে। ভোর থেকে সকাল। আমরা পুব থেকে পশ্চিমে সময়কে ধরে নিয়ে ছুটে এসেছি যেন। এ যাত্রায় আবারো, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বুঝে নেয়া গেলো, প্রমাণ মিললো সত্যি সত্যি আমরা যে পৃথিবীতে বাস করি তার আকার-আকৃতি গোলই।

বাহ! আমি তাহলে পৌঁছে গেলাম  কবি লোরকার ‘ City that does not sleep’ –তে,  মিনার মাহমুদের ‘নির্ঘুম স্বপ্নের দেশ’-এ।

তারও আগে, আমি যখন ভাবছিলাম আমেরিকায় যাবো। কথা চালছিলাম নানা ছাকনিতে; তখন অনেকেই কৌতুহলী প্রশ্ন ছুঁড়েছিলেন- ’কেনো’? আমি নির্লিপ্ত হেসে প্রতিবারই বলার চেষ্টা করেছি ‘এমনি এমনি।  একটু দেখে আসি। ঘুরে আসি।’

এবং আমেরিকা মহাদেশে নেমে আমার প্রথমেই মনে হয়েছে, ধারণায় এসেছে যতক্ষণ আলো আছে চোখে, মনের ভেতর, ততোক্ষণ কেবল দেখে নেয়া উচিত সব কিছু, অনেক কিছু- যতটা পারা যায়!
এবং আমি যখন নামি মার্কিন মুলুকে তখন আপেল গাছে গাছে পাতারা সবুজ। তখনো ফুল ফোটেনি পাতার আড়ালে, ডালের শরীরে। আমি একটা সদ্যযৌবন পাওয়া আপেল গাছ দেখে মুগ্ধ হতে থাকলাম। এতো এতো গল্পশোনা অভিজাতগাছ। এবং আমি প্রতিদিন খেয়াল রাখি সেই গাছে। আমার দৃষ্টির আড়ালে কখন সেই গাছে ফুল ফোটে। তারপর সবুজ আপেল কুঁড়ি। দিনে-রাতে রোদ আর বৃষ্টিছোঁয়ায়, হাওয়ায় দোল খেতে খেতে বড় হতে থাকে এক একটা আপেল। সবুজ রঙের আপেলের এই গাছটি প্রথবার ফল দিচ্ছে। গুনে গুনে ১৬টি। আম-কাঁঠাল-লিচুর দেশের মানুষ আমি প্রতিদিন অবাক হয়ে দেখি বৃষ্টিফোটা গায়ে মেখে বাতাসে দোল খাওয়া আপেল। আপেলদের শরীরে লেগে থাকা বৃষ্টির পানিতে যখন আলো পড়ে তখন মুক্তোঝরা দৃশ্য তৈরি হয়। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় আমি ঘুরে ফিরে আপেল গাছ, আপেলেদের বেড়ে ওঠার ছবি তুলি।  সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দি ভার্চুয়াল পৃথিবীতে। সেই ছবি দেখে অনেকে মুগ্ধ হন। পুলক বোধ করেন। অনেকে বলেন, বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে। এতো আহলাদ কেনো বাবা? তবুও, তারপরও আপেল নিয়ে আমার মুগ্ধতা কাটে না। পথে পথে, ঘুরতে ঘুরতে, হাঁটতে হাঁটতে আপেল গাছ দেখলে, গাছের দোল খাওয়া অনেক অনেক বর্ণের আপেল দেখলে, ঝরেপড়া আপেলদের দেখা পেলে স্থির দাঁড়িয়ে যাই। ছবি তুলি।  অন্য গাছের, ভিন্ন ফলের ছবিও তুলি। একবার এক মনখারাপ বিকেলে মার্কিন কিশোর নিকের সঙ্গে নদীঘেঁষা পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা গাছের ছবি তোললাম। ছোট ছোট লাল লাল ফল। আপেলের মতো। নিকের কাছে জানতে চাইলাম এগুলো চেরি কি না। ও নির্বাকার ঢংয়ে বলে দিলো, ‘নো। ক্র্যাপঅ্যাপলস’।

তারপর, পথে পথে, রাস্তার ধারে ধারে, মানুষের বাড়ির উঠানে, বাড়ির পেছনের বাগানে কত কত গাছ, কত কত আপেল গাছ এবং অন্যগাছের  দেখেছি। সব নয়, আমেরিকার কয়েকটি শহর দেখা হয়েছে একটু একটু করে। দেখেছি সেসব শহরে গাছেদের সমারোহ। দেখেছি গাছেদের কদর। আর এতো এতো ফলের গাছ! (চলবে)

ছবি : লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]