দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

আট.

মেয়েটার নাম লুসি। মা সীমান্ত পেরিয়ে মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় এসেছেন একটু ভালো থাকার জন্যে। এবং তিনি এখানে, মানে পকেপসি সিটিতে, মেইন স্ট্রিটের পাশে মেক্সিকান খাবার দোকান ‘Chapuline’-খুলে ভালো আছেন। মা-মেয়ে মিলে মানুষ জমাচ্ছেন প্রতিদিন।  লুসির মা আমাকে বলেছেন, আমেরিকায় এসে তিনি অনেক কিছু পেয়েছেন, আর তাদের মধ্যে অন্যতম হলো লুসি। লুসি এবং ছোট এক ভাই; ওদের জন্ম আমেরিকায়, নিউইয়র্ক রাজ্যে। সেই রাজ্যেরই এক প্রেমেপড়ে যাওয়ার মতো শহর পকেপসি। লুসির সঙ্গে আমার সেই শহরেই পরিচয়।
কলেজপড়ুয়া মেয়েটি একাই অনেক কিছু সামলাতে পারে। কিচেন থেকে কাউন্টার। অর্ডার নেয়া থেকে শুরু করে বিল নেয়া পর্যন্ত। আর সারাক্ষণ সব সামলায় হাসিমুখে।
-তোমার কখনো মেজাজ খারাপ হয় না?

আমার প্রশ্নে লুসি ঠোঁটের কোণে ধরে রাখা হাসি আরো বিস্তৃত করে বলে

‘হয়তো।’

-তখনো তুমি এভাবেই হাসতে পারো? ধরো কেউ তোমাকে কষ্ট দিলো; তখনো হাসো।

লুসি, আমেরিকান উচ্চারণে ইংলিশে বললো- ’হাসিই আমার অস্ত্র’।

মেয়েটির এই কথায় রীতিমত অবাক বনে যাই আমি। তারপর দিন, নেই ক্ষণ নেই, লুসির হাসিমাখা মুখ দেখতে ওদের খাবারের দোকানের সামনে যাই। নানা রকম ফলের রস আর  খাবারের জন্যে দুপুর থেকেই ভিড় লেগে থাকতো ওদের দোকানের সামনের পরিপাটি আঙিনায়। সন্ধ্যায় ভিড়টা একটু বেশি হতো। কিছুকালের জন্যে আমারও বাস ছিলো মেইনস্ট্রিটের পাশে। লুসিদের  ‘Chapuline’ হয়ে উঠেছিলো আমার সন্ধ্যাবেলার অবিনবার্য এক সময় কাটানোর জায়গা। পকেপসি থেকে ৮০ মাইল দূরের নিউইয়র্ক সিটি থেকে নিকটজন-বন্ধু এলে তাদেরও পরিচয় হয়েছে লুসি সঙ্গে। বন্ধু রাজ, তার পরিবার নিয়ে পকেপসিতে বসবাস শুরু করার আগে কয়েকবার ঘুরে গেছে মেইন স্ট্রিট। লুসিদের দোকানের ফলের রসে মজেছে তার প্রাণও।

তো এই লুসি যখন আমাকে বললো যে, হাসিই তার  অস্ত্র; তখন আমার একটা চীনা প্রবাদ মনে পড়ে গেলো। ‘তুমি যদি হাসতে না পারো, তাহলে দোকানের ঝাপ খোল না।’ তারপর লুসি আমাকে কয়েকদিন স্প্যানিশ ভাষা শেখানোর চেষ্টা করলো। আমি অনুগত, বাধ্য ছাত্র হয়ে শেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম এবং বুঝলাম বাংলা ভাষার কলাকৌশলের সঙ্গে অনেক মিল আছে স্প্যানিশ ভাষার। শব্দগুলো আয়ত্ত করাটাও খুব কঠিন কিছু নয়। তারপর সকাল-সন্ধ্যা লুসির সঙ্গে দেখা হলে আমি স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলার চেষ্টা করি। উচ্চারণ হয়তো ঠিক ঠাক হয় না।  লুসি কেবল হাসে। আমার প্রয়াসে আনন্দ পায়, ঠিকঠাক করে দেয়। লুসিকে আমি বলি, এই যে তুমি আমায় সময় দিয়ে, কষ্ট সয়ে একটা ভাষা শেখাচ্ছো- তার জন্যে তো আমার পে করা উচিত। লুসি হাসে, বলে, ‘উয়ো নো, ইন অ্যামেরিকা-নাথিং ইজ ফ্রি। বাট ইয়ো আর ভেরি স্পেশাল টু মি।’ বলেই অন্যরকম আলো ছড়িয়ে হাসে মেয়েটা। আমি আর একটুও কথা ছড়াই না।

তখন অক্টোবর অথবা নভেম্বরের শুরু। পকেপসিতে ভীষণ শীত নামে। বরফে ঢেকে যায় শীতকালটা। তারই পূর্বাভাস তখন প্রকৃতিতে। শহর বরফের তলায় হারিয়ে যাওয়ার আগে কিছুদিন জমিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ। তারই ভালো ব্যবহার করছে লুসিরা। শনিবারের বিকালে, ওদের দোকান ঘেষে ডিজে পার্টির আয়োজন। গানের তালে তালে যে যেভাবে পারে নেচে নেয়, একা বা সঙ্গীর সঙ্গে। মেইন স্ট্রিটের এপারে, ওপারে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখে মানুষের নৃত্য-গীতের আয়োজন। এ সময়টা লুসির দম ফেলার যেন ফুরসৎ নেই। তো এমন এক শনিবার বিকালের পার্টিতে এই গান সেই গান বেজে চলেছে। ইংলিশ, স্প্যানিশ আর ক্যারিবীয় গানের তালে তালে  ছন্দময় বিকেল। তারই মধ্যে হঠাৎ লতা  ‍মুঙ্গেশকরের গলা-রঘুপতি রাঘব রাজা রাম সবকো সুমতি দে ভগবান…। আমি রীতিমত আবেগ তাড়িত। এতো, এতোটা পথ পারি দিয়ে, দূর মার্কিন মুলুকের, এই দূর শহরের এক স্প্যানিশ খাবার দোকানের ডিজে পার্টিতে ভারতীয় সঙ্গীতের মুর্ছনা। মুহূর্তেই আমার মনে হতে থাকে- দেশে দেশে, মানুষে মানুষে আমরা সব এই সূত্রে বাঁধা রয়েছি। একই আকাশ, একই বাতাস, একই আলো। সেই সন্ধ্যাছোঁয়া বিকেলে, তখন আমার ভেতর থেকে একরকমের কান্না বেরিয়ে আসছিলো।

ছবি: লেখক ও গুগল

 

 

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]