দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

আট

শহরজুড়ে বৃষ্টি। সারাদিন বৃষ্টি পিট পিট পিট। এমন ’চরিত্রহীন’ নাছোড় মেঘকান্না নাকি আরো দু’দিন চলবে! ভীষণ পরিপাটি সবকিছু। বৃষ্টি কখন আসবে তার আগাম সংবাদ-ঠিকঠাক দিয়ে দেয় টেলিভিশন। একটুও এদিক ওদিক হয় না। কতোটা শীতল থাকবে হাওয়া, কতোটা বেগে বইবে। বিদ্যুৎ কতোটা চমকাবে, শব্দ হবে  কতোটা তারও হিসাব পাকা! তাই এই দেশে, এই শহরে ওয়েদার আপডেট সবচেয়ে বিবেচ্য সবার কাছে।

কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই, এমন এক বৃষ্টিভেজা  দুপুরে বিয়ার কেনার তাড়নায় ঘর থেকে মেইনস্ট্রিটে। একটা মেক্সিক্যান রেস্তোরাঁ। পাশ দিয়ে যেতেই ’করোনা’র হাতছানি। লেবুরসে ঠান্ডা করোনার স্বাদ বেঁচে থাকার একটা মানে করে দিতে পারে যে কোরো সময়। না, এই এমন বৃ্ষ্টিপ্লাবিত ওয়েদারে মেক্সিক্যান নয়, জ্যামাইকান স্ট্রং কিছু হতে পারে। এই যখন ভাবনা, বৃষ্টিশব্দ আর শীতলাগা বাতাসে ভেসে আসে একটা আহ্বান-‘ডু ইয়ো নিড অ্যা লেডি?’ কিছুক্ষণ আমি কিছু বুঝে উঠতে পারি না। কথাগুলো কি আকাশ থেকে নেমে এলো? তারপর চলা থামিয়ে প্রথমে আকাশ, তারপর পথ, তারপর ফুটপাতের দিকে তাকাই। তাকাই একটুআগে পেছনে ফেলে আসা মেক্সিক্যান রেস্তোরাঁর দিকে। দেখি, এই বৃষ্টিতে, বৃষ্টিআটকানো জামাপরা এক নারী, দেয়ালে এক পা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে। আমার দিকে মনোযোগের দৃষ্টি রেখে স্নিগ্ধ হাসছেন। আমি বুঝে নিলাম, এই নারীই ডাক পাঠিয়েছিলেন। ‘নো, থ্যান্কস’- ফিরিয়ে দিয়ে আমি হাঁটা ধরি। এবং অনেক কিছু ভাবতে থাকি। ভাবতে ভাবতে মেইনস্ট্রিটের মেক্সিক্যান সুপারসপ কাসালাতিনা’য়। বিয়ার, লেবু, ধনে পাতা, বাদাম কিনে সোজা ঘরে। আমেরিকা, নিউইয়র্ক নিয়ে গোটা দুনিয়ায় মানুষের গল্পের তো শেষ নেই। আর গল্পের এক অনিবার্য অংশ ‘ফ্রি-সেক্স’। তো সেই সেক্সদুনিয়ায় আমার প্রথম ডাক। আমি ঘটনাটা শেয়ার করি নিউইয়র্ক শহরে বাস বন্ধু রিপনের সঙ্গে। রিপন আমেরিকার নাগরিক; সাংস্কৃতিক কর্মী। নিউইয়র্কে আমার প্রথম আশ্রয়দাতা। ফোনে, ঘটনা শুনে রিপন বিশ্লেষণ করেন-এক. হতে পারেন ওই ভদ্রমহিলা সত্যি সত্যি প্রস্টিটিউট। নিতান্তই প্রয়োজনে বৃষ্টির মধ্যে পথে নেমেছেন। দুই. হতে পারেন তিনি পুলিশের লোক। আরো আরো কী যেন বললেন রিপন। এবং এটাও সাবধান করে দিলেন পথে-ঘাটের এমন ডাকে সাড়া না দেয়াই উত্তম।

তো, হঠাৎ শীতনামা চনমনে আলোর সকালে ভীষণ চটপটে এক তরুণী আমাকে বিস্মিত করে, পথ থামিয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন, ’ক্যান ইউ স্পেয়ার অ্যা সিগারেট ফর মি?’ ও ভালো কথা সেদিন ফোনে রিপন এটাও বলেছিলেন অচেনা কারো সঙ্গে সিগারেট বিনিময়েও যেন সাবধান হই। চট করে কথাটা মনে পড়লো আমার। আমি যতটা সম্ভব বিগলিতো হেসে জবাব ফেরাই, নো ম্যাম, আই ডোন্ট হ্যাভ সিগারেট। তিনিও হাসলেন এবং বললেন, তাহলে একটা ডলার দাও। আমি একটু অবাক হলাম। অমন রূপময়, স্মার্ট একজন তরুণী এভাবে একটা ডলারের জন্যে হন্যেপনা কেনো করছেন!  সাত-পাঁচ ভাবলাম এবং একটা ডলার তাকে দিলাম। তিনি আমাকে স্প্যানিশভাষী ভেবে ’গ্রাসিয়াস’ বলে মাথা  নুইয়ে চলে গেলেন। তারপর অনেকদিন এই তরুণীর সঙ্গে আমার  দেখা হয়েছে। গুয়েতেমালা থেকে আসা এই তরুণী সম্পর্কে আমাকে অনেক তথ্য দিয়েছেন আরেক নিকারাগুয়ান তরুণ।
নভেম্বর মাস, তখনো জমাটি শীত নামেনি নিউইয়র্কে, পকেপিসি সিটিতে। তবে দিন ফুরিয়ে যাচ্ছে দুপুরের একটু পরেই। অথচ গরমকালটায় ন’টা বেজে যায় তবুও সন্ধ্যা নামার নামটি ছিলো না। তো, নভেম্বরের  এক বিকেলে, মেইনস্ট্রিটের পুবদিকে এক তরুণী আর এক তরুণ ভীষণ ঝগড়া করছেন। ভাষান্তরে যতোটা বোঝা যাচ্ছে তরুণী বউটির কিছু টাকার প্রয়োজন ছিলো। বর তাকে দেয়নি। বউটি এসেছেন পথে। বলছেন, তুমি আমাকে টাকা দাও নি। আমি এখন আমাকে বেঁচবো। বরটি হাতে পায়ে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করছেন।  কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। একটুপর পথচলতি একটা পুলিশকার থেমে গেলো সেখানে। অফিসার গাড়িতে বসেই দুজনের ঝড়গাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে  থাকলেন। শুধু একবার বললেন, এনি প্রবলেম; ক্যান আই হেল্প? কিছু একটা জবাব পেয়ে চলে গেলেন পুলিশ অফিসার। খানিকবাদে তরুণ-দম্পত্তির ঝগড়ার স্কেলও নেমে এলো। এবং দু’জনে হাত ধরাধরি করে ঘরের দিকে হাঁটতে ‍শুরু করলেন।
এমনি প্রতিদিন অনেক অনেক দৃশ্য রচিত হতে থাকে পকেপসি শহরের মেইনস্ট্রিটের দুদিকে।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]