দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

নয়

দক্ষিণের জানালা দিয়ে চোখ মেললেই বয়সী ঝাউ গাছের শরীর বেয়ে উঠে যাওয়া কাঠবেড়ালির অবাক নৃত্য। দৃষ্টিসীমা আরেকটু প্রসারিত করলেই একটা পরিপাটি পার্ক। সেই পার্কে সকাল, দুপুর, বিকাল-সন্ধ্যা শিশুরা খেলা করে। নেচে বেড়ায় বড়োরাও।  সেই পার্কে মাঝে মাঝে এসে ঘুরে যায় দু-একটা হরিণ।  প্রতিদিন জানলায়, দরজা খুলে এসব দৃশ্য দেখে মন ফুরফুরে না হয়ে পারে। আর আকাশ! কোথাও কোনো বাঁধা নেই। ‘আমার বাড়ির জন্যে তোমার আকাশ ঢাকা পড়বে’ এটা হতেই পারে না এ তল্লাটে।
কদিন, নিউইয়র্ক শহরে, তারপর সেই হলাহলের শহর থেকে একটু দূরে পকেপসি নামের  যে সিটিতে আমার থাকা হতো তার কথা বলছি। একটা শহর কেমন মায়া জাগানিয়া, টানের হতে পারে, পকেপসিবাসে না গেলে আমার জানাই হতো না। আর আমার আমেরিকাযাত্রা আর বাসের জন্যে অতল ঋণ স্বীকার করি চটপটে প্রতিভাবান মানুষ মানিক রহমানের কাছে। তিনি দীর্ঘ সময় বাস করছেন ওই সিটিতে। তার সৌজন্য-ভালোবাসায় প্রথমে তার বাড়ি, পরে একটি ফ্ল্যাটে দিন-রাত কাটে আমার। সেই ফ্ল্যাটে পকেপসিবাসী ক’জন বাংলাদেশি আমেরিকান যেমন এসেছেন। সময় কাটিয়েছেন। তেমনি এসেছেন আমেরিকান কিশোর নিক,  মাঝবয়সী জেসিকা, গুয়েতেমালার ভিক্টর। এরা আমার খুববন্ধু।

ঘটনাসব ২০১৫ সালের; এখনো যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করে দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার আগে কোথায় যেতে চাও, কী দেখতে চাও। আমি দ্বিতীয় কোনো ভাবনা ছাড়াই বলে দেবো- পকেপসি যেতে চাই। ঘুরে বেড়াতে চাই তার পথে পথে, অলিতে, গলিতে! সন্ধ্যা নামা দেখতে চাই হাডসন নদীর তীরে বসে।
একটা নদী যে কতোটা প্রভাবশালী হতে পারে হাডসন না দেখা হলে বোঝা হতো এভাবে। নদীর নামে কত কত কিছু। আর নদীকে ঘিরে কত কত আয়োজন। নিউ ইয়র্ক থেকে হাডসনের তীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে রেললাইন গেছে পকেপসিতে। সড়কপথে ৮০ মাইলের একটা হিসাব। এই বন, এই ছোট্ট টিলার পথ পেরুতে দুই ঘণ্টা লাগে। তারপরও পকেপসিতে কেনো বাঙালিরা বাস গড়লেন, এই প্রশ্নের জবাব মিলবে দু-একদিন সেখানে থাকার পরই। আধুনিক জীবন যাপনের সব উপাধান আছে। তবে আধুনিক শহরের মতো অমন ছুটেচলা নেই। ধীর, শান্ত জনপদ। মনে হয় সবাই সবাইকে চেনে। ঘর থেকে মেইনস্ট্রিটের ফুটপাত ধরে হেঁটে হাডসনের তীরে বসে আমার জীবনানন্দ দাশকে মনে পড়তো, মনে পড়তো খুব তার কবিতা। সত্যি সত্যি তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই, পেরুনোরও নেই কিছু। ধীরে-সুস্থে অনেকক্ষণ জিরিয়েও পৌঁছানো যাবে গন্তব্যে। দুপুর গড়িয়ে বিকালের উঠানে পা রাখতেই হাডসনের তীর নেচে উঠে নানা আয়োজনে। নদীর জলের স্পর্শে গড়ে ওঠা রেস্টুরেন্ট। মানুষের আমোদে বাতাসও সঙ্গী হয়। নদীতে অবাক ভ্রমণতরী। এই তরীতে প্যাকেট ট্যুরে ঘুরে আসা যায় কয়েক ঘণ্টা। নদী তীরে হাঁটা সড়ক। দল বেধে মানুষ হাঁটছেন। দল বেধে বা একা একা জগিং করে নিচ্ছেন কেউ কেউ। আবার অনেকে স্থির বসে আছেন নদীর ওপারে প্রকৃতিতে চোখ পেতে। শরতে নদী তীরের গাছে গাছে, ঘন বনে পাতাদের বাহারি রঙ। এতো এতো রঙ, চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ে। আর এই তল্লাটেই নদীর ওপর দুনিয়ার সবচেয়ে লম্বা ওয়াকওয়ে। কত কত মানুষ হাঁটছে, নদীর ওপর সেতু তা কেবল হাঁটার জন্যে। নদী তীর থেকে সেই হাঁটাসেতুতে সোজাসুজি উঠে যেতে আছে লিফটের ব্যবস্থাও।
ছুটির দিনে আগের বিকাল থেকে হাডসনের তীরে আয়োজন আরো জমাটি হয়। গানের দল আসে। খোলা হাওয়ায় চলে কনসার্ট। গানে গানে তখন উদ্দাম চারিদিক।  শিল্পীরা গাইছেন। তার সঙ্গে নেচে গেয়ে একাকার শত শত মানুষ। খোলা এই আয়োজন উপলক্ষ্যে ভাসমান দোকান বসেছে। লেমন জুস থেকে শুরু করে কফি, আইসক্রিম, বার্গার সব আয়োজনই আছে ভাসমান ব্যবস্থায়। আর আছে উদ্বেগহীন, শান্ত চেহরায় প্রশান্ত মন নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানো মানুষ।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]