দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

দশ

মানুষ আইন মেনে চলে কেনো? আইনকে কেনো এতো ভয়? আমার কয়েক মাসের আমেরিকা বাসে যতোটুকু ঠাহর হয়েছে তা হলো ‘টিকিট’- মানে জরিমানা, অর্থদণ্ড। বাংলায় একটা প্রবাদ আছে ‘পুত্রশোকের চেয়ে কষ্টদায়ক টাকার শোক’।
তো সেই টাকার শোক এড়াতেই ‘মহান আমেরিকান’রা আইন মেনে চলে, চলার চেষ্টা করে ক্ষণে ক্ষণে।

নির্জন রাজসড়ক, কোথাও কোনো আইনের রক্ষককে দেখা যায় না। গাড়িটা বেঁধে দেয়া গতিসীমার বাইরে চলছে…চলছে। কোথা থেকে, ভূতের মতো বেজে উঠবে সংকেত। পুলিশ। থামাও গাড়ি। আমাদের শহরের মতো পুলিশ দল বেঁধে আসবে না। একটি গাড়ি। একজন অফিসার। অন্তত বিনয়ী তবে ঋজু ভঙিতে চালকের কাছে আসবেন। চালক গাড়ির ভেতর যে অবস্থায় আছেন থাকতে হবে ঠিক তেমনি। শুভেচ্ছা বিনিময় করে পুলিশ অফিসার চাইবেন ড্রাইভিং লাইসেন্স। তারপর পুলিশ-গাড়ির ভেতর রাখা প্রযুক্তি সহায়তায় সব তথ্য পরীক্ষা করে; ভুলের মাশুল হিসেবে ধরিয়ে দেবেন একটি টিকিট। সীমার বাইরে গতি, ভুল চালনা, ভুল জায়গায় দাঁড়ানো আরো নানা দণ্ড আছে পুলিশের হাতে। আর একবার টিকিট দিয়ে দিলে জরিমানার অর্থ না শোধ করে মাফ নেই। এবং দফায় দফায় ভুল করে, পয়েন্ট যেতে যেতে এক সময় ড্রাইভিং লাইসেন্সও হারাতে হতে পারে। আর  এটা জানা কথা, আমেরিকায় ড্রাইভিং লাইসেন্স একজন নাগরিকের জন্যে অশেষ গুরুত্ববহ বস্তু। এটা কেড়ে নেয়া মানে অনেকক্ষেত্রে একজনকে অকেজো করে দেয়ার সামিল। এসব ভয়ে, আমেরিকায় গাড়িচালনায় সবাই সদা, সব সময় সতর্ক থাকে।
এবং কেবল গাড়িচালনায় নয় জীবন-যাপনের সব অলিতে, গলিতে আইন ভাঙার পরিণতি খুব খারাপ হয়।

আমেরিকানরা এভাবে আইন মানে কেনো? এমন প্রশ্ন আমি করেছিলাম অনেক অনেক বছর ধরে সে দেশে বসবাস করছেন বাংলাদেশের ফুটবল কিংবদন্তী সামসুল আলম মঞ্জুকে। তিনি বুঝিয়ে দিলেন এভাবে- আমেরিকা হলো এমন একটি দেশ যা কারোই ‘নিজদেশ’ না। কতোগুলো মানুষ ভালো থাকবে বলে সমুদ্র পারি দিয়ে যায় আমেরিকা। মানুষের সেই মিছিলে থাকে অনেক অনেক খারাপ মানুষও। অথচ তারা ঠিক সোজা হয়ে চলে। চলতে হয়। কেনো না, আমেরিকায় কেউ আইনে উর্ধ্বে নয়। এতো এতো মানুষ। এতো এতো জাতি, এতো এতো ধর্মবিশ্বাস, ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি-অথচ সবাইকে নিয়ে পৃথিবীর নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে দেশটি। এর একটিমাত্র কারণ হলো আইন। আর আইন বা নিয়ম ভাঙলে অর্থদণ্ড। কারাদণ্ডতো আছেই।

এখন কথা হলো, আমেরিকার আইনের রক্ষক, পুলিশ কি ঘুষ খায় না, তারা জড়ায় না অপরাধে? খায়, জড়ায়, তবে পথেঘাটে, ঢাকার রাজপথের মতো নয় সেসব ঘটনা। আর সংখ্যায়ও তা খুব অগণ্য। আমরাতো এখনো বিশ্বাস করি একটি দেশের পুলিশ, একটি শহরের পুলিশ ভালো হলে, সৎ হলে, দায়িত্ববান হলে সেই দেশ, সেই শহর আপনাআপনি ভালো হতে বাধ্য।

তো হঠাৎ এসব নিয়ম, আইন নিয়ে কেনো কথা উঠছে। উঠছে, কারণ দেশে নতুন সড়ক পরিবহণ আইন হয়েছে। সেই আইনে অনেক অনেক শাস্তি, অনেক অনেক নিয়ম রাখা হয়েছে।  এই আইন কার্যকরে সরকার কঠোর হবে বলে বলছে। আর পরিবহণ মালিক, চালক, শ্রমিক এ আইনের বিরোধীতা করছেন। পুলিশ বলছে, শাস্তি কঠিন তাই ভয়ে এখন আইন মানবে পরিবহণ সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ কর্তারা টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে এও বলছেন, আইন ভাঙার শাস্তি বিধানে পুলিশ যদি অনিয়ম করে, মানে ঘুষ খায় তবে তাদেরও শাস্তি দেয়া হবে। কী করে বোঝা যাবে সড়কে পুলিশ অনিয়ম করছে? কর্তার জবাব, পুলিশের শরীরে ক্যামেরা লাগানো থাকবে। সেই ক্যামেরা সব সময় সচল থাকতে হবে। ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনো দু-নম্বরি করার নাকি কোনো পথ নেই।

ভালো কথা। সড়ক পরিবহণ আইনের সঠিক প্রয়োগ হোক। আমাদের সড়কে শৃঙ্খলা ফিরে আসুক। পথে নামলে বিপদ হতেই পারে, জীবন যেহেতু আছে মৃত্যু হবেই। তাই বলে যত্রতত্র হেনতেনভাবে নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী আরো আরো শহরে গাড়িচালকরা যে আইন মেনে চলে না, তার বড় একটা প্রমাণ বাসগুলোর শরীর। এমন ঘষালাগা, ছালতোলা বাসের শরীর পৃথিবীর কোন শহরে আছে আমি জানি না। তবে আমেরিকার কয়েকটি শহর ঘুরে আমার চোখগোচর হয়নি। কেনো? সোজা উত্তর আমেরিকায় কেউ আইনের বাইরে নয়। তাই, দেশে দেশে, মানুষে মানুষে অনেক অনেক কথা বলার পরও, অনেক বিরোধী বক্তব্য দিয়েও শেষমেশ একটু ভালো থাকার জন্যে, একটু ভালো লেখাপড়ার জন্যে। একটু শান্তি, একটু প্রশান্তির জন্যে যেতে চায় আমেরিকায়।

ছবিঃ লেখক, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]