দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

এগারো

মানুষের মুখ দেখার মতো অভিজ্ঞতা, আনন্দ, সুখ, বেদনা আর কিছুতে হতে পারে?
শীত আসি আসি করছে এমন এক সকালে, আমি দাঁড়িয়ে আছি পকেপসির মেইনস্ট্রিটের পাশে। সৌম্যদর্শন, চোখে-মুখে জ্ঞানের দীপ্তি লেগে থাকা একজন মানুষ আমার কাছে এলেন? পরিমিত অথচ স্নিগ্ধ হাসি ছড়িয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি আমেরিকায় কেনো?
তারপর একটু ইস্তত করে নিজের এমন প্রশ্নের ব্যাখ্যা করতে লাগলেন? আমি তাকে একটু থামিয়ে দিয়ে বললাম, ‘ টু সি দ্য পিপল’। মানুষ দেখতে আমি আমেরিকা এসেছি। আমার এমন জবাবে তিনি একটু হতবাক হলেন। নিউ ইয়র্ক রাজ্যের একটি কলেজে ফিলোসফি পড়ানো এই শিক্ষক তারপর জানতে চাইলেন আমি কোথা থেকে এসেছি। যখন বললাম বাংলাদেশ থেকে, এবং তার কৌতুহলে জানিয়ে দিলাম এখান থেকে অনেক অনেক দূরে সেই দেশ; তখন তার বিস্ময়ের আর সীমা থাকতে চাইলো না। এতো দূর থেকে, এতো টাকা খরচ করে তুমি আমেরিকায় এসেছো মানুষ দেখতে! আমি তোমাকে দেখে অবাক হচ্ছি। এই প্রথম একজনকে পেলাম যে মানুষ দেখতে এদেশে এসেছে। তারপর তিনি তার ডলারব্যাক থেকে কার্ড বের করে আমাকে দিলেন। এবং কেবল বলার জন্য বলা নয়, অন্তর থেকে নিমন্ত্রণ জানালেন। বললেন, খুব দূরে নয় তার ঘর। এক বিকেল বা সন্ধ্যায় যদি তার ঘরে যাই এক পেয়ালা কফি  পান করতে তাহলে তিনি খুশি হবেন।

এই পরিসরে বলে রাখা ভালো, এরপর তার সঙ্গে আমার দুদফা পথেই দেখা হয়েছে। আমি কফিপানের ডাকে সাড়া দিয়ে তার ঘরে যেতে পারিনি। এবং একটা কথা বলে রাখি তিনি আমাকে এও বলেছিলেন আমি যদি আমেরিকায় পাকাপাকিভাবে থাকতে চাই, তিনি আমাকে আইনি সহায়তার পথ বলে দেবেন। অনেক কেজো আইনজীবী আছেন শহরে তার বন্ধু। তার এমন কথায় আমি একটু হেসে, একটু মাথা নুইয়ে, একটু কৃতজ্ঞ হয়ে জবাব ফিরিয়েছিলাম-‘আমি আমেরিকায় থাকতে আসি নি। দেখতে এসেছি। মানুষ দেখতে। এবং আমার মনে পড়ছিলো ঢাকায় আমেরিকান দূতাবাসের ৬ নম্বর বুথে ভিসার জন্যে কথা বলার সময় ভদ্রমহিলা বাংলায় আমাকে যখন প্রশ্ন করেছিলেন, ’তুমি কেনো যেতে চাও আমেরিকা?’ আমি তাকেও বলেছিলাম –দেখতে!
তো, আমি আমেরিকায় গিয়ে পথে পথে, বিমানবন্দরে, বারে, ট্রেনে, বাসে, শপিং মলে কেবল মানুষের মুখ দেখছি। দেখেছি রাত ২টায় নিউ ইয়র্কের পথে পথে একজন, একলা নারী কীভাবে ভয়হীন, শঙ্কাহীন চেহারায়  চলতে পারেন। ফুটপাতে চলতি আমাকে থামিয়ে দিয়ে এক নারী একটা সিগারেট চাইলেন। বললেন, রাতে তার খাবারের টাকা নেই। এতো নাই’র মধ্যেও তার চেহারায় কোনো শঙ্কা বা উদ্বেগের চিহ্ন দেখলাম না। কী প্রশান্ত অবয়ব। একটা শহর, কিছু নিয়ম, কিছু আইন নারীকে এমন স্বাধীনতা দিয়েছে। কলেজে পড়েন যে ভারতীয় মেয়েটি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন যে নিকারাগুয়ান মেয়েটি। তারা আবার পারটাইম কাজ করেন সুপার শপে। পড়াশোনা কাজ। তারপরও কোনো চিন্তার ছাপ নেই চেহারায়।
১১ বছর আগে মেক্সিকো থেকে অনেকটা পালিয়েই পকেপসি সিটিতে এসেছেন মারগারিতো। বউ ছেলে মেয়ে দেশে। কাগজ হয়নি বলে নিজেও দেশে যেতে পারছেন না। দিনভর কঠোর শ্রম করেন মারগারিতো। সন্ধ্যার পর বিয়ার নিয়ে বসেন। এই পরিশ্রম, স্বজন থেকে এতো এতো দূরে, তারপরও চেহারায় বিষণ্নতা নেই। কাজ করছেন, খাচ্ছেন। সপ্তাহে একদিন গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে জমাটি প্রেম করছেন। মারগারিতোর কাছে স্প্যানিশ ভাষা শিখতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন সেই ভাষার কতগুলো গালাগালি; যার মধ্যে অন্যতম হলো ‘পুতামাদ্রে’। আরেক  স্প্যানিশভাষী গুয়েতেমালার ভিক্টর আমাকে পরে বলেছিলেন মারগারিতো কেবল গালি শিখিয়েছেন। পরে ভিক্টর শিখিয়েছেন অনেক কথাবার্তা।  এই ভিক্টর দেশ ছেড়েছেন ২০ বছর। এখন আমেরিকার নাগরিক। নিজে হাড়ক্ষয় হওয়া কাজ করেন। একসময় হোটেলে রান্নার কাজ করতেন। আগুনের তেজ সয় না বলে সরে এসেছেন । এখন যা পান তা-ই করেন। অনেক গুনের এই মানুষটি মুহূর্তেই বন্ধু করে নিতে পারেন যে কাউকে। তার এক ছেলে, তিনি হোটেলের শেফ। আর এককন্যা পড়ছেন মেডিক্যাল কলেজে। ভিক্টরের ডলারের ব্যাগে সব সময়ই টানাটানি। তারপরও মুখের হাসি সরে না। ম্লান হয় না। ভিক্টর জানেন, কোনো সমস্যাই চিরস্থায়ী না। সুসময় আসবেই। আসতে বাধ্য। ভিক্টর আমার ঘরে, আমার সঙ্গে হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বলেছিলেন, ’নাথিং ইজ ইম্পসিবল ইন আমেরিকা’।
আমেরিকার পথে পথে মানুষের মুখ দেখতে দেখতে আমার তাই মনে হয়েছে!

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]