দৃশ্যের দর্শক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুদ্রাক্ষ রহমান

দৃশ্য জোড়া দিয়ে দিয়ে একটা জীবন। দৃশ্যের পরবর্তী প্রতিক্রিয়াই তো স্মৃতি। থেকে যায় মনের মধ্যে, দাগ টানে, কষ্ট দেয়, আনন্দে ভুলিয়ে রাখে। গল্প লেখক রূদ্রাক্ষ রহমানের খোলা গদ্য ধারাবাহিক রচনার আকারে শুরু হলো প্রাণের বাংলার পাতায়। লেখক অবশ্য একে স্মৃতিগদ্য বলতে নারাজ। তাহলে? চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া দৃশ্যের পর দৃশ্য। লেখক জোঁড়া দিতে চান সেসব,ছেটেও ফেলতে চান কিছুটা হয়তো। সব মিলেই ‘দৃশ্যের দর্শক’।

লেখার শিরোনাম কবি আবুল হাসানের একটি কবিতা থেকে ব্যবহৃত। 

পর্ব-১

দক্ষিণদুয়ারী লম্বালম্বি একটা ঘর। ঘরের পরে উঠানে একটা আম গাছ। গাছ পেরিয়ে অন্য উঠান। গাছটা প্রিয়জন হয়ে অনেক অনেকদিন ছায়া দিচ্ছে। পাখিদের ডেকে আনছে শাখায় শাখায়, পাতায় পাতায়। আর ফল দিচ্ছে প্রতি গরমকালে। গাছটাকে ঘিরেই জ্যোৎস্নার রাতে কতো কতো খেলা।
একদিন, এক দুপুরে এই গাছের শরীরে কুড়ালের কুপ। প্রথম দেখা নিষ্ঠুরতা। মানুষের রান্নার জন্যে প্রিয় মিষ্টি একটা গাছের মৃত্যু হয়। গাছ মরে যাওয়ার, মেরে ফেলার সেই শোক শূন্যতা বড় বেদনা হয়ে বাজতে থাকে বুকের তলে!

গাছের শোক বুকে নিয়ে উঠান পেরিয়ে, পড়শিদের বাগান ছাড়িয়ে একটু দূরেই স্কুলের মাঠ। লম্বা হলুদ দালানের স্কুল। পেছনে বয়ে চলে ভরা বর্ষার খাল। খালের ওপর বাঁশের চাড়। সেই পুল বা সাঁকো পেরুলেই অন্যগ্রাম। সেই গ্রামে শোভা থাকে। শোভাদের গ্রাম সেটা। শোভা; চন্দনের গন্ধছড়ানো একটা ফুলমুখ মেয়ে। হারমোনিয়ামে টেনে টেনে সুর তোলে।গান গায় সকাল সন্ধ্যায়-‘যদি বারণ কর তবে গাহিব না’। শোভাদের বাড়ি ছুঁয়ে বর্ষার ঘোলা জল ছুটে যায় দূরে জালালপুর, আড়িয়াল বিলে, ধলেশ্বরী, ইছামতী নদীতে।

স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে সূর্যমুখি হলে দিগন্তজুড়ে কেবল সবুজ আর সবুজ। আর বর্ষায় কেবল পানি আর পানি। বিক্রমপুরে বর্ষা-বাইষ্যাকাল মানে অন্য এক ঐশ্বর্য। চারিদিকে কেবল পানি আর পানি। পানিতে ছন্দতোলে বাতাস বয়ে যায় দক্ষিণ থেকে উত্তরে। পানিতে ভেসে থাকা, দূরে দূরে থোকা থোকা বৃক্ষ, থোকা থোকা বাড়ি। তখন মানুষের সঙ্গী নৌকা। কতরকম নৌকা! ছইঅলা, খোলা, কোষা আরো কতো!

নৌকা যায়। উত্তর থেকে দক্ষিণে। ঝনকি গ্রাম থেকে শিমুলিয়ার দিকে। ছইঅলা নৌকায় বাজে কলের গান। ‘না হয় আমি তোমার কাছে ছিলাম অতি নগন্য’। বাজে, বাজতে থাকে ‘যা যারে উড়ে পাখি..’ নৌকা দূর থেকে দূরে যেতে থাকে। গানটাও হারিয়ে যেতে থাকে। একটু পর পর বাতাসে ভর দিয়ে আবার ভেসে আসে একটুখানি কথা, আধখানা সুর। পুরোটা কেনো আসে না। প্রাণ আকুলি বিকুলি করতে থাকে। কান পাতা থাকে সেই জলের পথে যে পথে হারিয়ে গিয়েও হারায়নি দমঘোরানো কলের গান!

ছবি: প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]