দৃষ্টিনন্দন বাইয়্যা প্যালেস আর বাঁধাই করা সমাধি সৌধ- মারাকেশ-৪

নিজামুল হক বিপুল

নিজামুল হক বিপুল

 আফ্রিকার দেশ, সাহারা মরুভূমরি দেশ মরক্কোর মারাকেশে যাবো কি যাবো না সেই দ্বন্দ্বে ছিলাম। কারণ টাকা-পয়সার একটা বিষয় থেকেই যায়। মারাকেশের জীবন-যাপন বা লাইফস্টাইল সম্পর্কে পূর্ব কোন ধারণা নেই। যাওয়া-আসার বিমান টিকেট, থাকা-খাওয়ার জন্য কি পরিমান অর্থ ব্যয় হবে- সে সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। আবার সংবাদকর্মী হিসেবে গত চার বছর ধরে নিয়মিতভাবে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কাভার করার কারণে আগ্রহ ছিল মরক্কো সম্মেলনে যোগ দেয়ার। শেষমেষ একেবারে অন্তিম সময়ে সিদ্ধান্ত মারাকেশ যাবার। তারপর দৌড়ঝাঁপ দিয়ে বিমান ভাড়ার ব্যবস্থা করা…অতপর মারাকাশের পথে যাত্রা।
১০ নভেম্বর রাতে মরক্কোর রাজধানী কাসাবাংকা পৌঁছলাম। সেখানে গিয়ে একেবারেই মুগ্ধ। কোন রকম ঝক্কিঝামেলা ছাড়া বেল্ট থেকে লাগেজ নিয়ে যখন বের হবো তখন দেখলাম জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য মোবাইলের সিম দেয়া হচ্ছে দু’টি বুথ থেকে। আমরা সিম সংগ্রহ করলাম। কোন টাকা লাগলো না। সিমের সঙ্গে ফ্রি ইন্টারনেটও যুক্ত করে দিলেন সংশ্লিষ্টরা। সঙ্গে সঙ্গে দেশে যোগাযোগ করলাম। কথা বললাম প্রিয়তমা স্ত্রী ও সন্তানদরে সঙ্গ। কাসাবাংকা মোহাম্মদ ভি এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আমরা উঠলাম আমাদের জন্য আগে থেকেই অপেক্ষমান একটি বিলাসবহুল বাসে। মরক্কো সরকারের অতিথি হিসেবে ওই বাসেই আমরা পৌঁছবো মারাকেশে। কাসাবাংকা থেকে প্রায় তিন ঘণ্টার বাস জার্নি মারাকেশ। মরুভূমির দেশ মরক্কোর কাসাবাংকা থেকে মারাকেশ পর্যন্ত পিচ ঢালা মসৃণ পথ। দুই পাশে মাঝে মধ্যেই দেখা মিলে উঁচু-নিচু পাহাড়। আমাদের গাড়ি ছুটে চলছে পুলিশ প্রটোকল নিয়ে। সামনে পুলিশের গাড়ি, পিছনে আমাদের গাড়ি। রাত ১১টা কিংবা সাড়ে ১১টার দিকে গাড়ি যখন মারাকেশ পৌঁছলো তখন আমাদের আরেক দুশ্চিন্তা , এতো রাতে হোটেল খুঁজে বের করবো কিভাবে। তার উপর আবার কিছুটা হিমেল হাওয়া বইছে। গাড়িতে সেটা টের পাইনি। কিন্তু না, সেখানেও স্বস্তি মিললো। একজন গাইড আমাদেরকে ট্যাক্সিতে করে বাস টার্মিনাল থেকে নিয়ে গেলেন আমাদের হোটেলের ঠিকানায় মারাকেশের মেদিনা এলাকায়। সেখানে তিনি আরেকজন গাইডের কাছে আমাদেরকে তুলে দিলেন।

একদম অচেনা-অজানা দেশ,শহর, মানুষ। মনে মনে কিছুটা শংকা জাগলেও মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই গাইড আমাদের নিয়ে নির্দিষ্ট হোটেলেই পৌঁছে দিলেন। শেষ হল টানা জার্নি। মহুর্তেই উবে গেলো সব দুশ্চিন্তা ।
পরদিন সকাল বেলা মারাকেশ শহরে বের হয়ে মনটা দারুণ ফুরফুরে হয়ে গেলো। মারাকেশ শহরটি হাজার বছরের পুরনো। এর ইতিহাস রয়েছে, ঐতিহ্য রয়েছে। একে মরক্কোর পর্যটন নগরী বলা হয়। আমরা যে কয়দিন এই শহরের বাসিন্ধা ছিলাম সেই কয়দিন ভীষণ ভাল লেগেছে এই শহরকে, এই শহরের মানুষকে। সত্যিই এই শহরের মানুষ অতিথিপরায়ন, বন্ধুবৎসল, আন্তরিক। কি পুরুষ, কি নারী সবাই বেশ সহযোগি।


সঙ্গত কারণেই মারাকেশ শহর ঘুরে দেখার লোভ সংবরণ করা গেলো না। একদিন দুপুরে আমরা পাঁচ জন বের হয়ে গেলাম শহর ঘুরতে। শহর ঘুরে দেখানোর জন্য বিভিন্ন ট্যুরিস্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাদেরই একটির শরনাপন্ন হয়ে আমরা গাড়িতে চড়ে বসলাম। আমাদের গাইড হলেন মোহাম্মদ আমিন। ৬৫ বছর বয়সী দীর্ঘদেহী আমিন বেশ হালকা-পাতলা গড়নের। তিনি মরক্কোর সরকারি তালিকাভূক্ত গাইড। এখানে সরকারি তালিকার বাইরে কেউ পর্যটকদের গাইড হতে পারেন না।
প্রথমে মারাকেশের প্রাণকেন্দ্র মেদিনা ময়দান থেকে হাঁটতে হাঁটতে আমিন আমাদের নিয়ে গেলেন কুতুবিয়া মিনার মসজিদে। এটি শহরের প্রাণকেন্দ্রেই অবস্থিত। চমৎকার স্পষ্ট উচ্চারণে ইংরেজিতে বর্ণনা দিলেন আমিন। জানালেন, এটি নির্মাণ কাজ শুরু হয় সুলতানি শাসন শুরুর প্রাক্কালে। আর মসজিদটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ১১৮৪ থেকে ১১৯৯ এর মধ্যে আহমদ খালিফ আল মানসুর এর সময়ে। পরবর্তিতে এই মসজিদটির বড় অংশই ধ্বংস হয়। পরবর্তিতে মারাকেশ শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় ফ্রান্স সরকার। মারাকেশে প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ করে। ওই সময় তারা মসজিদের নিচে পানির একটি বিশাল রিজার্ভার তৈরি করে।


আমিনের বর্ণনার পর মসজিদের সামনের অংশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। সামনেই একটি বিশাল পার্ক রয়েছে। যেখানে অসংখ্য ফলবতী গাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে। দেখতে অনেকটা কমলালেবুর মত এক ধরণের ফলের গাছ এই বাগানের প্রধান আকর্ষণ।

বাইয়্যা প্যালেস আকৃষ্ট করে পর্যটকদের

মসজিদ দেখা শেষ হলে অপেক্ষমান গাড়িতে উঠে আমরা ছুটলাম মোহাম্মদ আমিনের সঙ্গে। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন বাইয়্যা প্যালেসে। এটি এই শহরের অন্যতম আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট। উনিশ শতকের ১৮৯৪ সালে মারাকেশ শহরের গ্র্যান্ড ভিজেয়ার আহমাদ বেন মুসা (মরক্কোনাদের কাছে বাহমাদ নামে পরিচিত) বাইয়্যা প্যালেস তৈরি করেন। এই সুলতানের চারজন স্ত্রী(পত্নী) এবং ২৪ উপ-পত্নী ছিলেন। তাদের সন্তান সংখ্যা ছিল অসংখ্য। এসব তথ্য জানিয়ে আমিন বললেন, এই প্যালেসের নকশা তৈরি করা হয় ইসলামিক এবং মরক্কো’র নিজস্ব স্টাইলে। এটি তার সময়ের সবচেয়ে শ্রেষ্ট স্থাপত্য শৈলী। এই প্যালেসে অসংখ্যা দরজা রয়েছে। এটি নির্মাণের ক্ষেত্রে গোপনীয়তায় বিশেষ মনযোগ দেয়া হয়। বিলাস বহুল এই প্রাসাদ নির্মাণের জন্য ফেজ থেকে নির্মাণ শ্রমিক আনা হয়।

পুরো সাত বছর সময় নিয়ে এটি নির্মাণ করান গাইড আমিন এসব বর্ণনার পাশাপাশি পুরো প্রাসাদ ঘুরে ঘুরে দেখালেন। চমৎকার দৃষ্টি ননন্দন প্রাসাদ। দামি সব মার্বেল পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই বাইয়্যা প্যালেসের প্রতিটি কক্ষ। প্যালেসের আরেকটি প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে বিশাল বাগান। এই বাগান জুড়ে নানান প্রজাতির ফলজ গাছ আর ফুলের গাছ। এমন একটি প্রাসাদ দেখা উচিত দীর্ঘ সময় নিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। কিন্তু আমাদের সময় স্বল্পতার জন্য দ্রুততার সঙ্গে প্যালেস ঘুরে দেখার বিকল্প ছিল না।

বাঁধাই করা সমাধি সৌধ

বাইয়্যা প্যালেস দেখার পর আমাদের গন্তব্য মারাকেশ শহরে অবস্থিত সাদিয়ান সমাধি সৌধ। এটি ষোলশ শতকে নির্মিত। মরক্কোর শাসক এবং চিত্তবিনোদনকারীর সমাধি হিসেবে নির্মাণ করা হয়। ১৯১৭ সালে ফ্রান্স এটি পুনঃআবিস্কার করে। এই সমাধি সৌধটি অবস্থান মরক্কোর রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের অবকাশকালীন রাজপ্রসাদের ঠিক উল্টো দিকে।
দেখতে অনেকটা দূর্গের মত। টিকেট কেটে ভিতরে গিয়ে দেখা গেল, অনন্য সুন্দর এক প্রাসাদ। ভিতরের সব কাজ চোখ জুড়ানো আর মন কেড়ে নেয়ার মত সব কারু কার্য। কিন্তু প্রাসাদের মত দেখলেও এটি আসলে সমাধি সৌধ। সাদিয়ান সুলতান আহমদ আল মনসুর ও তার পরিবারের সদস্যদের সমাহিত করা হয়েছে এখানে। এটি এখন মারাকাশের প্রধান পর্যটন স্পট।

বাঁধাই করা এই ‘সমাধি সৌধ’টি একটি ছাদের নিচে। তিনটি কক্ষে আলাদা আলাদা ভাবে এখানে সমাহিত করা হয়েছে সুলতান, তার স্ত্রী এবং সন্তানদের। সমাধি সৌধ’র ভিতরেও সুনিপূণ কারুকাজ। সুলতান আহমদ আল মনসুর এর সমাধি সৌধটি নির্মাণ করা হয়েছে পুস্পসুভিত মোটিফ, ক্যালিগ্রাফি, জেলিজ এবং ক্যারারা মার্বেল পাথর দিয়ে। এই সমাধি সৌধে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ইসলামিক স্থাপত্য শৈলী। একইভাবে অন্য সমাধি সৌধগুলোতেও নানা স্থাপত্য শৈলী ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।(শেষ)

ছবি: লেখক