দেখা হবে বন্ধু কারণে অকারণে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ডা. এম আল মামুন

ফেইসবুক।সবার কাছেই জনপ্রিয় এই শব্দটি। তাই প্রাণের বাংলায় আমরা সংযুক্ত করলাম ফেইসবুক কথা বিভাগটি।এখানে ফেইসবুকের আলোচিত এবং জনপ্রিয় লেখাগুলোই  আমরা পোস্ট করবো।আপনার ফেইসবুকে তেমনি কোন লেখা আপনার চোখে পড়লে আপনিও পাঠিয়ে দিতে পারেন আমাদের ই-মেইলে।

এক.
জায়গাটা জর্ডান বর্ডারের ধূ ধূ মরুভূমি। এই বিরান মরুভূমির ভেতরে গড়ে উঠেছে একটি ছোট্ট মরুশহর। যেটি মুলতঃ একটি স্থলবন্দর। এই স্থলবন্দরের অভ্যন্তরে একটি ‘বন্দর স্বাস্থ্য সারভাইল্যান্স কার্যালয়’-এ আমার পঁচিশ দিন মেয়াদি অস্থায়ী কর্মস্থল। এই স্থলবন্দর দিয়ে পুরো রমজান মাস জুড়ে একটার পর একটা ওমরা যাত্রীবাহী বিলাসবহুল বাস সৌদি আরবে প্রবেশ করছে। বাসগুলো আসছে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে। এখানে আমরা চার জন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চার শিফট-এ একটি পাবলিক হেলথ্ টিমকে নেতৃত্ব দিচ্ছি। এই চার জনের একজন সুদানি-আমেরিকান, দু’জন জর্ডানিয়ান, আর একজন হলাম এই আমি, বাংলাদেশি।

তো এই পাবলিক হেলথ্ টিমের কাজটা কি? আমরা মূলতঃ দেখভাল করছি ওমরা-যাত্রীদের রোগ প্রতিরোধের বিষয়গুলো। ওমরা-যাত্রীদের মেনিনজাইটিস, পলিও, ইয়োলো ফিভার, ইনফ্লুয়েঞ্জা, এই সব রোগের ভ্যাক্সিনেশন স্ট্যাটাস নিশ্চিতকরণ, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ, ফুড সেফটি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ইত্যাদি বিবিধ বিষয়। যে কোনো Mass gathering health কর্মসূচীতে রোগ প্রতিরোধের এই বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

একটা ঘটনাটা ঘটেছিলো পর পর দুই বছর। ২০০০ সালে প্রথমবার, এরপর ২০০১ সালে দ্বিতীয়বার। সৌদি আরবে আসা এক বা একাধিক হজ্বযাত্রী শ্বাসনালীতে করে মেনিনগোকক্কাস নামের এক ধরনের ঘাতক ব্যাকটেরিয়া বহন করে আনে। এরপর ছড়িয়ে পড়ে সেই ঘাতক জীবাণু এক হজ্বযাত্রী থেকে আরেক হজ্বযাত্রীর শরীরে। শুরু হয় মেনিনজাইটিস রোগের প্রাদুর্ভাব। ফেরত হাজীদের মাধ্যমে রোগটি ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, আর উত্তর আমেরিকার দেশে দেশে। এই ঘটনার পর থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইন্টারন্যাশনাল হেলথ্ রেগুলেশন অনুয়ায়ী হজ্ব এবং ওমরা যাত্রীদের যাত্রা শুরুর কমপক্ষে দশ দিন আগেই যার যার দেশ থেকে মেনিনজাইটিস রোগের টিকা নিয়ে সৌদি আরবে ঢোকা বাধ্যতামূলক করা হয়।

এখন কেউ যদি কোনো কারণে এই টিকা না নিয়ে চলে আসেন?তাই এখানেই কাজটা আমাদের, এই রোগ প্রতিরোধ দলের। যারা এই টিকা নিয়ে আসেননি, কিংবা যাদের কাছে ভ্যাক্সিনেশন সার্টিফেকেট নেই, বিমানবন্দর কিংবা সড়কবন্দর দিয়ে সৌদি আরবে প্রবেশের সময় তাঁদেরকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে একটা করে ৫০০ মি. গ্রাম সিপ্রোফ্লক্সাসিন ট্যাবলেট খাইয়ে দেয়া হয়। সিঙ্গেল ডোজের এই অ্যান্টিবায়োটিক সেই সব হজ্বযাত্রীদের নাসারন্ধ্র বা শ্বাসনালীতে থাকা মেনিনগোকক্কাস জীবাণুগুলোকে ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে ফেলে। এই রমজানে এ পর্যন্ত আমাদের রোগ প্রতিরোধ দল অন্ততঃ পনেরো হাজার ওমরা বাসযাত্রীদের এই অ্যান্টিবায়োটিক-সেবা প্রদান করেছে।

দুই
সময়টা মধ্যরাত। তারিখটা রমজানের আঠারো। আমার সান্ধ্যরাতের শিফটিং ডিউটি শেষ হয়েছে। ডরমিটরিতে ফিরে যেতে হবে। অফিসের মাইক্রোবাসের জন্য অপেক্ষা করছি। জর্ডানপ্রান্ত থেকে ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে আমাকে এলেবেলে করে দিচ্ছে। মরুভূমির মেঘশূন্য আকাশে ঝুলছে চার দিনের ক্ষয়ে যাওয়া পূর্ণিমার চাঁদ। আনমনা হয়ে ওই ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি। প্রতিরাতেই একটু একটু করে ক্ষয়ে যাচ্ছে চাঁদটি। ঠিক যেমন করে সময়ের পরিক্রমায় ক্ষয়ে যায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কগুলো। ক্ষয়ে যেতে যেতে একদিন এই চাঁদও আমাবশ্যার আঁধারে হারিয়ে যাবে। মানুষেষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কগুলোও হয়তো এমনই। একবার হারিয়ে যায়, আবার এক ফালি বাঁকা চাঁদের মতই নতুন করে জেগে ওঠে।

তিন.

ঈদের পর জুন মাসের ১০ তারিখে মধ্যপ্রাচ্যের এক আরব্য মরুশহর থেকে আমি উড়ে যাবো নিউইয়র্কে। মোট বারো দিনের একটা আমেরিকা-ভ্রমণ পরিকল্পনা। ১৪ ও ১৫ জুন ফুল-টাইম অবস্থান করবো নিউইয়র্ক লা-গার্ডোয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিওট হোটেলে। এই হোটেলেই বসতে যাচ্ছে দু’দিন মেয়াদি এক টুকরো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস। সেই ক্যাম্পাসে জমে উঠবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ-এর প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের এক জমজমাট পুণর্মিলনী আসর।

আমরা সবাই হয়ে যাবো আগের মতই আড্ডাপ্রিয় একঝাঁক তরুণ-তরুণী। ওখানেও হয়তো আমরা পেয়ে যাবো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের সেই চিরচেনা, প্রিয় আইল্যাণ্ড। সেই কাল্পনিক আইল্যাণ্ডের গাছতলায় বসে মেতে উঠবো আমরা আড্ডা, হৈ চৈ, স্মৃতিচারণ, খুনসুঁটি, রসিকতা, আর দুষ্টুমিতে। ওখানে সিনিয়র-জুনিয়র-ক্লাসমেট এই দূরত্ব-রেখা মুছে আমরা সবাই হয়ে উঠবো শুধুই এমএমসিয়ান, শুধুই বন্ধু।

নিউইয়র্ক লা-গার্ডোয়া এয়ারপোর্ট ম্যারিওট হোটেলের ওই এক টুকরো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে-

দেখা হবে বন্ধুরা, কারণে আর অকারণে…।

ছবি: লেখক

(লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, সৌদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তাবুক, সৌদি আরব থেকে)

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]