দেশকে আর কতবার বিবস্ত্র করা হবে?

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শান্তা মারিয়া

এই দেশের প্রতিটি নারীর উচিত অবিলম্বে দেশ ত্যাগ করা। অথবা জন্মানোমাত্র এদেশের প্রতি মেয়ে শিশুকে মেরে ফেলা হোক। দেশটি মেয়েদের জন্য নয়। এদেশটি নারীর জন্য নয়, আবারও বলছি একটি নারীর জন্যও নিরাপদ নয়।

নোয়াখালির এখলাসপুরের যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে সেটি কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না এদেশের বাস্তব চিত্র? এই দেশের কোন নারীটি আজ নিরাপদ? বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে কোথায় ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হচ্ছে না নারী? একটা কোন বীভৎস ঘটনা ঘটলে তখন আমাদের কয়েকদিন খুব হইচই করতে ইচ্ছা করে। তারপর সব চুপচাপ। আবার নতুন একটি ঘটনার জন্য অপেক্ষা। একলাসপুরের ভিডিওটি দেখে যাদের খারাপ লাগছে তাদের বলি, আপনারা কিভাবে জাহাঙ্গীর নগরে সেঞ্চুরি মানিকের ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপনকে গ্রহণ করেছিলেন? তখন কি তার প্রকাশ্য মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিলেন? তার কি মৃত্যুদণ্ড হয়েছিলো? একশত ধর্ষণ নিয়ে নিজের মুখে আস্ফালন করা ধর্ষক যদি বেঁচে থাকতে পারে এই দেশে এবং কোন গুরুতর শাস্তিও না পায় তাহলে এই ভিডিও দেখে এত হা’হুতাশ কেন করছেন? চট্টগ্রামে থানার ভিতরে যখন সীমা চৌধুরি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো তখন কি আপনারা হা’হুতাশ করেছেন? করেননি।

তাহলে এখন কেন?

এই কিছুদিন আগে যখন নীলা রায় নামের মেয়েটিকে ভাইয়ের সামনে থেকে টেনে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলা হলো তখন কেমন লেগেছে? যখন পাহাড়ের সেটেলাররা পাহাড়ি তরুণীকে গণধর্ষণ করে তখন আপনারা হা’হুতাশ কেন করেন না? এই হবিগঞ্জে মা মেয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হলো সেই ঘটনায় বা চুপ কেন?

কেন ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন না?

ইয়াসমিন হত্যার পর প্রতিবাদ হয়েছিলো। ঠিক। কিন্তু তারপরেও গণধর্ষণের শিকার পূর্ণিমার পাশে কতজন দাঁড়িয়েছিলেন? কতজন দাঁড়িয়েছিলেন সুবর্ণচরের সেই গৃহবধূর পাশে?

ধর্ষণকে রাজনীতি হিসেবে না দেখে যদি এ দেশে প্রতিটি ধর্ষণের বিচার না হয় তাহলে নতুন ধর্ষণ হতেই থাকবে। সোনার ছেলেরাই ধর্ষণ করুক আর মাইট্টা পুরুষরাই ধর্ষণ করুক সেটা কিন্তু একই অপরাধ। দেশে ৬৩২ টি ধর্ষণ এ বছরই হয়েছে। সেটা সোনার না তামার না মাইট্টা পুরুষরা করেছে সেটার চেয়ে বড় কথা হওয়া উচিত ধর্ষকের শাস্তি।

দেশে পুলিশ প্রশাসন আছে কি করতে? তাদের কাজ কি শুধু মাদক ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ আর সন্ত্রাসীদের ‘ছত্রছায়া’ দেয়া?

এদেশে ৭২ বছরের বৃদ্ধা ওজু করার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে ধর্ষণের শিকার হয়। এদেশের পুরুষদের উচিত কচুগাছের সঙ্গে গলায় দড়ি দিয়ে মরে যাওয়া। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি পিশাচ বাহিনীর ধর্ষণ থেকে মা বোনদের বাঁচাতে মানুষ অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। সেই বীর বাঙালি এখন বিলাই হয়ে যায় কিভাবে? এখলাসপুরের পুরুষরা কি সবাই ধর্ষক? নাকি তারা কোথাকার কোন দেলোয়ার বাহিনীকে পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর চেয়েও ভয়ংকর বলে মনে করে? নারীরাই বা দা বটি হাতে বের হয় না কেন?

বাংলাদেশে আসলে জনগণের কাছে ধর্ষণ কোন ‘ঘটনা’ বা ‘ক্রাইম’ বলেই মনে হচ্ছে না। চাইলেই নারীর বিরুদ্ধে যে কোন সহিংসতা যেকোন স্থানে করা যায়। নারীর প্রতি এই রকম প্রকাশ্য সহিংসতা হলে কোন দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর নীরব থাকার কথা নয়। নীরব থাকার কথা নয় পুলিশ প্রশাসনের উর্ধতনদের। কিন্তু না, এদেশে মুখে কুঁলুপ এঁটে বসে থাকলেই হয়। পারে শুধু ৫৭ ধারায় মামলা করে প্রতিবাদকারীকে জেলে ঢুকাতে।

যখন ধর্ষণের প্রতিবাদে প্রেসক্লাবের সামনে আমরা কয়েকজন নারী ব্যানার হাতে দাঁড়িয়েছি তখন কি দেখেছি কি শুনেছি জানেন?

তখন পথচলতি ও বাসযাত্রী পুরুষরা আমাদের উদ্দেশ্যে নোংরা গালি ছুঁড়ে দিয়েছে। রিকশাচালকও বিশ্রী মন্তব্য করতে করতে গেছে। তথাকথিত সচেতন পুরুষরাও আমাদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়নি। এমনকি ক্লাবের ভিতরে বসে ডালপুরি আর চা খেতে খেতে গল্পকরা পুরুষ সাংবাদিকরাও আমাদের ব্যানারের পাশে দাঁড়ায়নি। এদেশের পুরুষদের পুরুষত্বের পরিচয় এখন শুধু ধর্ষণে। ভিক্টোরিয়ান যুগের ‘শিভালরি’ এখন ‘গনকেস’। নারীকে রক্ষা করার ‘বীরত্বের’ মুখে ছাই। এরা এখন হয় ধর্ষক নয়তো নংপুরুষ। এদেশের পুরুষদের দ্বারা এখন আর ধর্ষণ ছাড়া আর কিছু হবে বলে মনে হয় না। না হলে কেন ধর্ষণবিরোধী সম্মিলিত মঞ্চ গড়ে উঠছে না? কেন দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ হয় আর ধৃতরাষ্ট্রের মতো অন্ধ হয়ে থাকে সরকার, রাষ্ট্র, প্রশাসন, জনগণ?

নারীদের করণীয় কিছু রয়েছে। আমার মনে হয়, এখলাসপুরের এই বীভৎসতা যারা করেছে সেই কালাম এবং অন্য জানোয়ারদের পরিবারেও তো মা আছে, বোন আছে, তাদের উচিত এদের বিষ দিয়ে বা কুপিয়ে মেরা ফেলা। প্রতিটি ধর্ষকের মায়ের উচিত তার জানোয়ার সন্তানকে নিজে হাতে হত্যা করা। ঠিক একইভাবে দলীয় প্রধানের কর্তব্য নিজ দলের জানোয়ারদের কঠোর শাস্তি দেয়া। তবে যদি এদেশ ধর্ষকমুক্ত হয়।

এসব খবর যখন বিদেশে বসে বিদেশি বন্ধুদের সামনে শুনতে হয়। যখন বাংলাদেশে একের পর এক রেপের ঘটনা, নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে বিদেশিরা প্রকাশ্যে সমবেদনা জানায়, দুঃখপ্রকাশ করে তখন নিজের দেশকে একটা পারভার্টের দেশ বলে মনে হয়। মনে হয় পুরো দেশটাই যেন বিবস্ত্র হয়ে পড়ছে।

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box