দেশের মায়া

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

(নিউইয়র্ক থেকে): দেশ’ একটা শব্দ মাত্র। সীমারেখা বেস্টিত একটি ভূখণ্ড। সেই ভূমির উপর গড়ে উঠা জনপদ। একটি সমাজ। সেই সমাজে আমাদের জন্ম বলে আমরা একে বলি মাতৃ অথবা পিতৃভূমি।

পৃথিবীটা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি যুক্ত। বিমানে চড়ে বসলে ১২/১৩ ঘন্টার মধ্যে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে যাওয়া যায়। একটা সময় দেশের বাইরে গেলে মানুষ নিজেকে পরবাসী ভাবতো, সেদিন এখন আর নেই।

বিদেশে গেলেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন না ভাবার পেছনে আরো কিছু কারণ আছে। একটি বড় কারণ হলো- সম্পদের প্রবাহ। এক সময় ধনী ও দরিদ্র দেশের বৈষম্য ছিলো প্রকট! এখন আর সে দিনটি নেই। দরিদ্র নিজেই সম্পদ সৃষ্টি করছে এবং মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।

প্রবাসীরা নিজ মাতৃভূমিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। জমি কিনেন, পাকা বাড়ি তৈরি করেন। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল তৈরি করেন। এতিমখানায় টাকা দেন। এতে করে দেশের প্রতি তাদের মায়া বাড়ে ছাড়া কমে না।

দেশের প্রতি মায়া বাড়ার আরো কিছু কারণ আছে। যেমন- নিরাপত্তা বোধ। প্রবাসীরা দেশে গেলে বিপদগ্রস্ত হবেন না, কেউ ঠকাবে না, আত্মীয়-স্বজন কেবল সঙ্কট নিয়েই সামনে উপস্থিত হবেন না। সবাই নিজ শ্রম ও মেধায় নিজের সমস্যা মোকাবিলা করবে, প্রবাসীরা এমনটাই আশা করেন।

কিন্তু দেশের প্রতি মায়ায় টান পড়ে, যখন প্রবাসীরা দেখেন- সবাই স্বার্থপরতায় মগ্ন। ‘ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ নেই’ এমন সব ব্যাপারে যখন দেশের মানুষের উন্নাসিকতা। অবশ্য এমন ভাব তাঁরাই দেখান, যাদের প্রতি প্রবাসীরা কোনো সাহায্যের প্রত্যাশা করেন। তবে প্রবাসীদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো- কারো প্রতি সাহায্যের প্রত্যাশা না করাই উত্তম।

এবার মাত্র ৯ দিনের জন্য ঢাকা গিয়ে প্রতিদিন সকালে স্কুটারে চড়তাম। আমি কাজ শুরু করতে চাইতাম সক্কাল বেলা। কিন্তু ঢাকার মানুষ সকালে জাগে না। কাজকর্ম শুরু হয় ৯/১০টার পর।

পত্রিকার লোক বাদ দিলে এমন কি হকাররাও রাস্তায় নামে ৮টার পর। ভোর বেলায় নাকি দৌরাত্ম থাকে ছিনতাইকারীর। অল্প বয়েসী এসব ছিনতাইকারীর মনে নাকি মায়া দয়ার লেশ নেই! ফলে প্রাতঃ ভ্রমণকারীরাও সকাল আটটার আগে রাস্তা পার্কে নামেন না!

বলছিলাম স্কুটারে চলার কথা। এই বাহনটি নিরাপদ কিংবা আরামদায়ক কোনোটাই নয়। কিন্তু গলি ঘুপচি পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে সক্ষম। সদর রাস্তায় মাঝপথে সময়ের বিড়ম্বনায় আপনাকে নাকানি চুবানি খাওয়াবে না।

তবে দিনের তিন-চার ঘন্টা স্কুটারে বসে থাকলে ধোঁয়া এবং ধূলায় আপনার নির্ঘাত শ্বাসকষ্ট হবে। তখন আপনি ‘মায়েরে বাপ’ বলে ঢাকার পিণ্ডি চটকাবেন! তাই পারত পক্ষে দুই-তিন জায়গার বেশি যাতায়াত আপনার কর্মতালিকায় রাখবেন না!

আমি প্রতিদিন স্কুটারে উঠলে চালকদের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিতাম। এদের জীবনের গল্প মর্মস্তুদ। এসব গল্প শুনলে মনে হবে একটা নির্দয় সমাজের বাসিন্দা আমরা। খুব ক্ষুদ্র একটি সুবিধাভোগী অংশ ছাড়া ঢাকার মানুষের জীবনে স্বস্থি নেই। নেই নিরাপত্তা ও আনন্দ। এমন কি ‘ছুটির দিন’ কী জিনিষ তারা জানে না!

আমি যে ‘নিরাপত্তার’ কথা বললাম- এটা কেবল চোর, ছ্যাচ্চর কিংবা ছিনতাইয়ের খপ্পরে পড়া নয়! এই নিরাপত্তা হলো ‘বোধ’-এর ব্যাপার। বেপরোয়া যানবাহনের দৌরাত্ম, আইন না মানা, নাগরিক দায়িত্ব সচেতনতার অভাব, রাস্তায় উন্মুক্ত খাদ, বিপদে রাষ্ট্রীয় সেবা পাওয়ার দূর্লভ্যতা, ক্ষমতাবানের অনিয়মতান্ত্রিক দাপট ইত্যাদি। এসব যে সমাধানের অযোগ্য, তা নয়। শুধু প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

গত চার মাসের ব্যবধানে দু’বার ঢাকা গিয়ে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বেশ কিছু পরিবর্তন দেখেছি। যেমন রাস্তা দখল করে মিছিল-মিটিং নেই। হরতাল-অবরোধ নেই, পুলিশকে মারমুখী করে তোলার তৎপরতা নেই। এসব ভীষণ ভালো লাগার দিক। আমি এসব ঘটনাকে বলি- ‘দুষ্ট লোকের অগণতান্ত্রিক কালচার’!

রাস্তায় তথাকথিত প্রতিবাদ কিংবা সমালোচনা নেই! কিন্তু সরকারি কাজের দোষত্রুটি নিয়ে যেখানে আলোচনা হওয়ার কথা, সেখানে আইনপ্রণেতারা নীরব। আসলে দেশে সংবিধান কিংবা নাগরিক অধিকার নিয়ে কেউ আলোচনা করতে চায় বলে মনে হয় না। চর্চার অভাবে দিনে দিনে বিদগ্ধ লোকের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে! আপনি হয়ত টক’শোর কথা বলবেন। কিন্তু টক’শোর গভীরতা কতটুকু?

এমন কি তরুণরাও নিস্পৃহ! ক্রিকেট ছাড়া আর কোনো ব্যাপারে তাদের আগ্রহ আছে কি-না সন্দেহ। বাংলা চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি, নাটক ইত্যাদিতে তরুণদের কোনো আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। থাকলে এসবের বিজ্ঞাপণ চোখে পড়তো।

বাসাবাড়িতে কিছু আগ্রহ দেখেছি ভারতীয় সিরিয়েলের। কাজের বুয়া থেকে বাড়ির কর্তা সবাই খুব মনোযোগে সে সব দেখে। কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্বতা সৃষ্টির চেষ্টা যারা নেবে, সেই তরুণ সমাজ হতাশায় নিমজ্জিত।

দেশে কর্মসংস্থানের অনেক সুযোগ। লক্ষ-লক্ষ তরুণ যুবককে সেবাখাতে চাকরি দেয়া যায়। এবং এসব কাজের সূত্রে একদিকে যেমন দেশটি উন্নত হয়ে উঠত, ঠিক তেমনি সরকারেরও বিপুল রাজস্ব আয় বাড়তো। কেবল ব্যক্তিখাতে চাকরি বাড়ানোর অপেক্ষা করা বোকামী। এতে করে এক সময় শিক্ষিত তরুণরা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে।

ঢাকা শহরে ঘুরতে গিয়ে সর্বত্র এমন সব ময়লা আবর্জনা আর পুঁতি গন্ধের সাক্ষাত লাভ করেছি, মনে হয়েছে- এই শহরটি বিদেশি বান্ধব নয়। এমন কি দেশের মায়ায় ছুটে এসে প্রবাসীরাও ছি ছি, দূর দূর বলে এই শহর থেকে পালিয়ে যাবে!

কেবল একটি উদাহরণ দেই- আপনারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার স্থানটি ঘুরে আসুন। এটি ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র। অথচ ওই মাঠটি থেকে অন্তত দশ ট্রাক আবর্জনা উদ্ধার করা যাবে। মেলা শেষ হওয়ার তিন মাসেও স্থানটি পরিস্কার হলো না! হাতির ঝিল, রমনা, সোহরাওয়ার্দি এসব পাবলিক পার্কের কথা না হয় বাদই দিলাম!

তারপরও দেশ- ইনহাস্ত ওয়াতানাম, এই তো আমার জন্মভূমি! রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারি, লুটেরা এরাই তো দেশের মুখোশ নয়! দেশের মুখোশ যে মানুষ, সেই সাধারণের কাছ থেকে আপনি কিন্তু কখনো বিমুখ হবেন না। একটু আব্দার করলে পঞ্চাশ টাকার ডাবটি আপনাকে চল্লিশ টাকায়ও দেবে। চরম দুঃখ-দারিদ্র মাথায় নিয়েও সে হাসবে, এবং ফটো তোলার সময় আপনাকেও হাসতে বলবে!

ছবি: লেখক ও গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box