দেয়ালে উঠছে,দেয়াল ভাঙছে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কেন মাথা তোলে দেয়াল? কারা দেয়াল বানায় পৃথিবীর বুকে, কারাই বা ভাঙে এই বাঁধা?দেয়াল তো আসলে মানুষের-ই গল্প, লোহা, ইঁট আর পাথর দিয়ে লেখা। দেয়ালের ইতিহাসে সেঁটে থাকে আবেগ, রাজনীতি, আর বাঁধা। আঠা ফুরিয়ে পোস্টারের মতো দেয়ালে ঝুলে থাকে ভয়ের,প্রতিরোধের, আত্মরক্ষার, অহমিকাঅথবা অবিশ্বাসের গল্প।       

দেয়ালের সঙ্গেই আমাদের বসবাস। ঘরের চার দেয়াল থেকে উঠানের প্রাচীর। প্রাচীর থেকে দেশভাগ করে ফেলা আরও কোনো বৃহৎ দেয়ালের আগ্রাসন; দেয়াল টপকে অথবা দেয়ালের ফাঁক গলে মানুষ লেখে তার জীবনের নানা কাহিনি। দেয়াল গড়তে দেখি, দেয়াল ভাঙতে দেখি।মানুষ প্রথম নিজেকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে দেয়াল বানিয়েছিলো? নাকি দেয়াল তৈরি হয়েছিলো পরস্পরের মাঝে অবিশ্বাস আর শত্রুতার প্রতীক হিসেবে সে মনস্তাত্বিক ধারণার কথা ইতিহাসের বইতে ভালো করে লেখা নেই। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায় উরাক নামে এক শহরকে ঘেরাও করে দেয়াল তোলার কথা ইতিহাসে জানা যায়।তারও আগে এখনকার প্যালেস্টাইনের পশ্চিম তীরে জেরিকো শহরেও দেয়াল থাকার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু দেয়াল তৈরির গল্প যেমন ইতিহাস বিখ্যাত তেমনি বিখ্যাত তো দেয়াল ভাঙার গল্পও। এই তো ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর বার্লিন প্রাচীরের ভাঙা পাথর, ইঁট আর সিমেন্ট থেকে ঝরে পড়া ইতিহাসের ভূত তিরিশ বছর অতিক্রম করলো।মজার তথ্য হচ্ছে ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে পৃথিবীতে এমন দেয়ালের সংখ্যা ছিলো ১৫টি। আর ২০১৮ সাল পরযন্ত পৃথিবীতে এমন দেয়ালের সংখ্যা ৭৭টির বেশি। 

এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো দেয়াল নিয়ে কিছু কথা-‘দেয়াল উঠছে, দেয়াল ভাঙছে’। 

দেয়াল কি মানুষের নিজেকেই নিজে বন্দী করার এক অদ্ভুত বাসনা? তা যদি নাই হবে তাহলে বার্লিন প্রাচীর ভাঙার সময় মানুষ এত উৎসবে আচ্ছন্ন হয়েছিলো কেন? ১১১ দশমিক ৯ কিলোমিটার লম্বা একটা প্রাচীর ভাঙতে এত গান, এত কবিতার জন্ম হয়েছিলো কেন? আসলে দেয়াল ভাঙার ব্যাপারটা মানুষের আবেগের মাঝেও গভীর ভাবে প্রথিত। যে মানুষ দেয়াল দেয় সে-ই আবার সে দেয়াল উপড়ে ফেলতে চায়। নিষেধের ব্যারিকেড টপকাতে চায় মানুষ, এটাই ঐতিহাসিক সত্য। মুক্তি আর মিলনের আকাঙ্ক্ষায় দেয়াল ভেঙে পড়ে।

দেয়াল কয়েকরকমের হয় বলে স্থাপত্যবিদরা বলেন। প্রতিরক্ষা দেয়াল মূলত তৈরি হয় একটি শহর বা এলাকাকে নিরাপত্তা দেয়ার নামে।কখনো শহরকে আড়াল করা হয় দেয়াল দিয়ে। কিন্তু এসবের বাইরেও দেয়াল আছে যেমন, চীনের প্রাচীর বা গ্রেপ ওয়াল। এটিও এক ধরণের প্রতিরক্ষা দেয়াল। গ্রিক অথবা রোমান সাম্রাজ্যের বিজয় কেতন উড়ানোর যুগে বিভিন্ন শহরগুলোকে তারা মজবুত দেয়াল দিয়ে ঘিরে ফেলেছিলো। এ ধরণের দেয়াল মধ্যযুগ অথবা তার পরেও পৃথিবীতে দেখা যায়। কিন্তু পৃথিবীতে বারুদের আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে দেয়ালের দৃঢ়তার যেন মৃত্যু ঘটলো।

বার্লিন প্রাচীরের সব বাধা নিষেধকে ফাঁকি দিয়ে তখন ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ তৎকালীন পূর্ব জার্মানী থেকে পশ্চিম জার্মানীতে পালিয়ে গিয়েছিলো।

ভেঙে পড়ার পরে কিন্তুসেই বিখ্যাত দেয়ালের ইঁট, সিমেন্ট আর পাথর নিলামেও উঠেছিলো। নিলামে কেনা সেই সব ইট পাথরের কিছু নিদর্শন এখন ঠাঁই পেয়েছে আমেরিকার লাস ভেগাসের মেইন স্ট্রিট স্টেশন ক্যাসিনোর প্রক্ষালন কক্ষে।এই সময়ে অবশ্য দেয়াল ভাঙা অথবা গড়ার গল্প অনেকটাই অন্যরকম। মোবাইল ফোনেই মানুষ এখন দেয়াল তুলছে, দেয়াল ভাঙছে। এই ভার্চুয়াল জগতে তার নাম ব্লক। অলৌকিক রাজ্যে মন খারাপের বৃষ্টি ঝরলেই কেউ তুলছেন নিষেধের প্রাচীর। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে লেনাদেনা। বিচ্ছিন্নতা দিয়ে মানুষ নিজেকেই নিজে আড়াল করে নিচ্ছে অদৃশ্য এক দেয়ালের ভিতরে। এমন দেয়ালের গল্প লক্ষ লক্ষ। বার্লিনের দেয়ালও বোধ হয় এতদিন টিকে থাকলে সেসব দেয়ালের কাহিনির সামনে পরাস্ত হতো।

গল্পের সেই আনারকলি আর শাহজাদা সেলিমের প্রেমকাহিনি। সেখানেও আছে দেয়াল। শোনা যায় সম্রাট আকবর তার পুত্র সেলিমের বাঈজি আনারকলির প্রেম মেনে নিতে পারেননি। আনারকলিকে তিনি দেয়াল তুলে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন।এই কাহিনির কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ইতিহাসের গবেষকরা কোথাও আনারকলির সেই কবরের সন্ধান পাননি।আকবর নামা অথবা তুজক-ই-জাহাঙ্গীরীর কোথাও এই কাহিনির উল্লেখ নেই। তাই ধরেই নেয়া হয় এমন প্রেমের গল্পটি মিথ্যা। কিন্তু সাহিত্যে এবং সিনেমায় আনারকলির প্রেম আর দেয়ালের কাহিনি অমরত্ব পেয়েছে। আনারকলিকে নিয়ে প্রথম গল্প লেখেন ভারতীয় লেখক আবদুল হালিম শারার। দতনি তার বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় স্পষ্ট করে একে কথাসাহিত্য হিসেবেই উল্লেখ করেছেন।

তৈরি হচ্ছে আমেরিকা আর মেক্সিকোর মাঝখানে বিশাল দেয়াল।প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন,সেই দেয়াল কেউ টপকাতে পারবে না। কিন্তু পৃথিবীতে এমন দেয়াল কেউ তৈরি করতে পারেনি যা টপকাতে পারেনি কেউ।ষাটের দশকের অন্তিমে ভিয়েতনামের মাই লাইতে যখন নামাপ বোমায় জ্বলে উঠেছিলো শ্মষাণ চুল্লী তখন ভিয়েতনামের গেরিলা যোদ্ধারা প্রতিরোধের দেয়াল তুলে দিয়েছিলো মার্কিন আগুনে বোমার বিরুদ্ধে। যুদ্ধকে তারা আরও তীব্র করে তুলেছিলো।

বহুকাল আগে চোর আসতো দেয়াল টপকে। তাদের নৈঃশব্দ আর মৃসন হাওয়া কেটে চলার গল্প জমা থাকতো দেয়ালের কাছে। জমা থাকতো দেয়াল ঘেঁষে নিঃসঙ্গ শিউলি গাছের অনেক কথা। কোনো কোনো ক্রিকেট খেলার বল ঘন ঘন দেয়াল পার হয়ে ভাঙতো জানালার কাচ।শৈশব পলাতক হতো কোনো দুপুরে দেয়াল টপকে।দেয়ালের গায়ে লাল সুরকির টুকরো দিয়ে লেখা হতো কারো নাম। কোনো কোনো ভোরবেলা ভীরু প্রেম কয়েকটা সামান্য ফুল হাতে চলে যেতো দেয়ালের কাছে। তখন সেই দেয়াল নিষেধের দূর্গ। কিন্তু ওই দেয়ালের ঘেরাটোপে আছে তার জুলিয়েট। সে দেয়াল টপকে জুলিয়েটের বাড়ির উঠানের দরজায় রোমিওর রেখে যাওয়া সেইসামান্য কয়েকটিফুল সারাদিন নিষেধের কানে ফিসফিস করে বলে যায়, দেয়াল টপকানো সম্ভব।

১৯৬৮ সালে প্যারিসের রাস্তায় প্রতিরোধের দেয়াল তুলেছিলো তরুণরা। সে প্রতিরোধের দেয়াল কিন্তু ভাঙতে পারেনি তখনকার শাসকদের রক্তচক্ষু। প্রতিবাদের দেয়াল ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছিলো ইউরোপে। ইতিহাসের পাতায় ওই সময়টাকে বলা হয় ‘লংগেস্ট ৬৮’। বাতাসে বারুদের ঘ্রাণ দীর্ঘায়ু হচ্ছিলো ক্রমশ।পথে পথে তরুণরা গান গেয়ে ফিরছিলো,‘পথের প্রাচীর বন্ধ করে দিচ্ছে পথ, খুলে দিচ্ছে নয়া পথের নিশানা’।১৭৮৯ সালেও প্যারিসের রাস্তায় তৈরি হয়েছিলো এমনই প্রতিরোধের দেয়াল। ফরাসী বিপ্লবের আগুন কাঁপিয়ে দিয়েছিলো শাসকদের অন্তরাত্মা। চিত্রকর ডেলাক্রেয়া এঁকেছিলেন বিদ্রোহী মানুষের প্রতিরোধ প্রাচীরের ছবি।বিদ্রোহ তো আসলে নিজেই একটা দেয়াল যা রুখে দেয় স্বৈরাচারী জান্তাকে। বাংলাদেশেও ওই সময়ে পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে যুব শক্তি রাজপথে তৈরি করেছিলো প্রতিরোধের দেয়াল।

বধ্যভূমির দেয়াল রক্তাক্ত, ঠাণ্ডা, বিষন্ন চিরকাল। কেন বহুযুগ ধরে মানুষকে ফায়ারিং স্কোয়াডে একটা দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে খুন করা হয়েছে তার কোন সঠিক উত্তর নেই। হয়তো গুলি করবার সুবিধার জন্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নাজি বাহিনীর লোকেরা তাদের কনসেন্ট্রশন ক্যাম্পগুলোতে এরকম রক্তাত্ত, বিষন্ন আর নিরেট ছাণ্ডা দেয়ালের সামনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করেছে হাজার হাজার মানুষকে। ইউরোপের পথে পথে যে কোনো জায়গায় দেয়ালের সামনে তখন পড়ে থাকতো গেরিলাদের মৃতদেহ।এ দেশে ধরা পড়ে যাওয়া বহু মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ দিয়েছেন ফায়ারিং স্কোয়াডে। সব জায়গাতেই একটি চরিত্র সাধারণ-একটি দেয়াল। বধ্যভূমির দেয়াল নিয়ে নবারুণ ভট্টাচারযের কবিতার একটি লাইন এরকম,

‘‘একগুচ্ছ বুলেটপ্রুফ কবিতা

দাঁড়িয়ে আছে ফায়ারিং স্কোয়াডের দেয়ালের সামনে’’।

মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে গ্রীক যোদ্ধারা জয় করেছিলো ট্রয় নগরী। ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো হেলেনকে। কারণ ট্রয়ের দেয়াল তারা ভেদ করতে পারছিলো না।হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যে এমন কাহিনিই লেখা আছে। এমন অভেদ্য দেয়াল শুধু প্রকাশ্যেই ওঠে না। মানুষ মনের মধ্যেও দেয়াল তুলে দেয়। সে দেয়াল বিচ্ছিন্নতার। বিচ্ছিন্নতা বা সংযোগহীনতার এই পটভূমি কখনো ঠেলে দেয় তাকে মানসিক হাসপাতালে। মনের মধ্যেও থাকে এমনি অসংখ্য দেয়ালের গল্প। ঘরের চার দেয়ালের থেকেও সে দেয়াল অনেক বেশি কঠোর। আবার সে দেয়াল যখন ভেঙে পড়ে? দেয়ালের উল্টোপাশের গল্প আমাদের সবার জানা হয় কখনো?

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্র ও ছবিঃ সিএনএন, গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]