দ্বিতীয় পথের পাঁচালী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পথের পাঁচালী সিনেমার সুর তৈরির কাজ করছিলেন তখন পণ্ডিত রবি শঙ্কর। কিন্তু এক জায়গায় এসে ঝামেলা বাঁধলো। ছবিতে মিঠাইওয়ালার মিঠাই ফেরি করে বেড়ানোর দৃশ্যে সুর বসাতে পারলেন না রবি শঙ্কর। সময়ের অভাব তাঁর। তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন। শেষে সেই সংকট থেকে উদ্ধার করলেন পথের পাঁচালী সিনেমার ক্যামেরার পেছনের মানুষ সুব্রত মিত্র। সেই সিনেমাটোগ্রাফার খুব ভালো সেতার বাজাতে পারতেন। তিনিই সুর তৈরি করেছিলেন সেই দৃশ্যটির জন্য। কিন্তু ঘটনাটা নিয়ে পরে বিড়ম্বনায় পড়েন রবি শঙ্কর। সিনেমা মুক্তি পাবার পর কোনো এক অনুষ্ঠানে শ্রোতারা তাঁকে ওই সুরটি বাজাতে বললে তিনি মুশকিলে পড়েন। কারণ তখনও তাঁর সিনেমাটি দেখা হয়ে ওঠেনি।সুব্রত মিত্র কোন সুর বাজিয়েছেন তা তিনি জানেনই না। 

পথের পাঁচালী সিনেমাটি তৈরি নিয়ে এমন অনেক গল্পই ঘুরপাক খায় ইতিহাসের বারান্দায়।আশ্চর্য এক সিনেমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অদ্ভুত সব অন্তরালের গল্প। পথের পাঁচালী মুক্তি পাবার পর পার হয়েছে ৬৫ বছর।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেসব গল্প নিয়ে ‘দ্বিতীয় পথের পাঁচালী’। 

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে রবি শঙ্করের পরিচয় করিয়ে দেন স্বয়ং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। পথের পাঁচালী উপন্যাস নিয়ে সত্যজিৎ রায় ছবি করছেন। বিভূতিভূষণ চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, তার খুব ইচ্ছা এই ছবিতে গ্রামের সুর, বাংলার সুর দেবেন পণ্ডিত রবি শঙ্কর। তাঁর এই ইচ্ছার কথা জেনে সত্যজিৎ রায় চলে যান রবি শঙ্করের এক বন্ধুর বাড়িতে। সেখানেই উঠেছিলেন প্রখ্যাত সুরস্রষ্টা। ততদিনে কয়েকটি সিনেমায় কাজ করে ফেলেছেন রবি শঙ্কর। কিন্তু সেদিন বাড়িতে গিয়ে অবাক হয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। রবি শঙ্কর তাকে জানান, পথের পাঁচালীর জন্য একটি সঙ্গীত রূপ তিনি ভেবে ফেলেছেন। বলেই সত্যজিৎ রায়কে একটি সুর বাজিয়ে শোনাতে আরম্ভ করেন। সুর শুনে মুগ্ধ সত্যজিৎ। সেখানে বসেই পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেললেন। পুরো ছবিতে কোথায় কোথায় সুর বসবে সেজন্য রবি শঙ্করকে ছবিটা দেখাতে হবে। তারপর মহড়া, রেকর্ডিং। কিন্তু ঝামেলা বাঁধলো এখানে এসে। হাতে সময় নেই রবি শঙ্করের। তিনি মাত্র একদিন সময় দিতে পারবেন ব্যস্ততার ফাঁক গলে।

চিন্তায় পড়লেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু দমে গেলেন না। সিদ্ধান্ত নিলেন ওই একদিনেই কাজটা শেষ করবেন তিনি। তাঁরা দুজন বসলেন ছবির রাশ দেখতে। এবার মুগ্ধ হবার পালা রবি শঙ্করের। সমস্ত যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীদের বলে দেয়া হলো স্টুডিওতে চলে আসার জন্য। কাজ শুরু করবেন রবিশংকর। সেদিন বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে ছিলো, সেতার, বাঁশি, তারসানাই, চমং আর কাচারি।

ওইদিন সারারাত জেগে কাজ চলেছিলো। ওখানে বসেই তৈরি হচ্ছে স্বরলিপি, চলে যাচ্ছে শিল্পীদের হাতে, রবি শঙ্করের সেতারে ঝংকার উঠছে, চলছে রেকর্ডিংয়ের কাজ-সে এক আশ্চর্য রাত্রির গল্প। ক্লান্তিহীন সৃষ্টির প্রহর। সেদিনই এই সিনেমাটির একটি দৃশ্যে পরিবর্তন এনেছিলেন সত্যজিৎ। দূর্গা মারা গেছে। হরিহর তখন বাইরে থেকে ফিরেছে;সর্বজয়ার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে শাড়ি। এই শাড়ি কেনা হয়েছে দূর্গার নামে। সত্যজিৎ রায় সিনেমায় এখানে সর্বজয়ার কান্না রেখেছিলেন প্রথমে। কিন্তু পরে ভাবলেন, কী প্রয়োজন এখানে কান্নার শব্দের। কান্নার তো সবসময় শব্দ হয় না। বিষাদের তো আলাদা সুর থাকে। এখানে থাকবে সুর। বিষয়টা নিয়ে রবিশংকরের সঙ্গে আলোচনা করে পাল্টে ফেললেন দৃশ্যের গঠন। রবি শঙ্কর তৈরি করলেন বিষাদের সুর।

এই দুই স্রষ্টার ভেতরে অদ্ভুত এক রসায়ন কাজ করেছিলো। তৈরি হয়েছিলো শিল্পের বোঝাপড়া। হয়তো তাই দুজনের সুরের যাত্রা এগিয়ে গিয়েছিলো ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’ আর পরশপাথর’ সিনেমার হাত ধরে। রবি শঙ্করকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় পরে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন। চিত্রনাট্যটা লিখে রেখেছিলেন একটা খাতায়। শুধু লেখা নয়, ছবি এঁকে দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরে সে তথ্যচিত্র আর নির্মিত হয়নি।অনেক পরে সেই পুরো চিত্রনাট্যটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে।

পথের পাঁচালী ছবিতে সত্যজিৎ রায় ইন্দি ঠাকুরুনের গাওয়া সেই বিখ্যাত গান-‘হরি দিন তো গেলো, সন্ধ্যা হলো/পার করো আমারে’ ব্যবহার করেছিলেন। গানটি এই সিনেমার হাত ধরে আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। কিন্তু প্রথমে সেই চুনিবালা দেবী স্বকন্ঠে অন্য একটি গান গেয়েছিলেন সিনেমার জন্য। চুবিালা গান গাইতে হবে শুনে সত্যজিৎ রায়কে প্রশ্ন করেছিলেন-‘‘ধর্মমূলক হলে চলবে কি?” সত্যজিৎ বলেছিলেন চলবে। তিনি তখন গাইলেন-‘মন আমার হরি হরি বল’। গানটি রেকর্ড করা হয়েছিলো। কিন্তু সত্যজিৎ রায় সেটি সিনেমায় ব্যবহার করেননি।

গানটি কেনো পাল্টে গিয়েছিলো সে নিয়েও একটি কাহিনি আছে। শুটিং চলছিলো রাতে। আকাশে চাঁদ। ওই সময়ে ‘হরি হরি বল’ গানটির শট নেয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে চুনিবালা বলেন, তাঁর আরেকটি গান মনে পড়ছে। সত্যজিৎ রায় গানটি গাইতে বললে তিনি ‘হরি দিন যে গেলো’ গানটি গেয়েছিলেন। ব্যাস, সত্যজিৎ রায়ের গান পছন্দ হয়ে গেলো। তারপর বাকীটা ইতিহাসে বিস্তারিত।

শোনা যায়, পথের পাঁচালীর শুটিং যখন অর্থের অভাবে আটকে যায় তখন নারায়ণ সাধু খাঁ নামে  এক প্রযোজক এসেছিলেন টাকা নিয়ে। তার দাবি ছিলো সিনেমায় দূর্গার লিপে গান থাকতে হবে। এই প্রস্তাবে সত্যজিৎ রায় রেগে গিয়েছিলেন। সাধু খাঁকে বলেছিলেন, ‘‘পাগল নাকি আপনি! বিভূতিভূষণ পড়েননি?’’অথচ সেই সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালীতে চুনিবালাকে দিয়ে গানও গাইয়েছিলেন।

পথের পাঁচালী সিনেমাটি দেখে বিশ্বখ্যাত পরিচালক আকিরো কুরসাওয়া মন্ত্যব্য করেছিলেন, ‘ছবিটি দেখার পর আমার মধ্যে যে উত্তেজনা কাজ করেছিল সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। এটা এমন একটা ছবি, যেটা একটা বিশাল নদীর মতো উদার এবং বহমান।’

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ফিচার
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]