দ্বিতীয় ভ্রান্তিপাশ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

-“দেয়ায় ডাকে কাকা, আইজ বাড়িত যামু তাড়াতাড়ি!” কাতর চেহারা করে বলে সুবল।

-“হ দেয়া না তর মাথা, খালি প্যাট গুড়গুড় করতাসে তর। যা যা হরির দুকান থিকা আমার নাম কইরা কিছু খাইয়া আয়!” খিঁচিয়ে তাড়া দেয় সুবলের কাকা দুলাল। মেঘ-বৃষ্টি-বাদলের তোয়াক্কা করলে চলবে নাকি তাদের? এই তো সন্ধ্যার মুখে ফটফটে নীল টিউবলাইটক’খানা জ্বলে উঠেছে ‘আদর্শ লাইব্রেরি অ্যান্ড স্টেশনারী’তে। ছেলেমেয়েদের বাপ-কাকারা এখন আসবে ইস্কুলের বাঁধাই খাতা কিনতে, কিংবা জ্যামিতি বাক্স, কিংবা ব্যবহারিক খাতা। দুলাল ‘র‍্যাপিড-রিডিং’ এর বইও বেচে, ইস্কুলের ‘বাধ্যগত’ পোলাপান ছাড়া জোহরা- আনোয়ারা- মনোয়ারা এইসব বই নইলে আর একালে কারা পড়বে? ভাবতে ভাবতে একগালের তালমিছরি আরেকগালে স্থানান্তর করে দেয় দুলাল। অবশ্য সুবল পড়ে, একটু অবসর পেলেই ঐসব বই পড়ে নিকেশ করে দেয়। দুলাল কঠিন চোখে তাকিয়ে দ্যাখে, সুবল মলাট মুড়ে পড়ছিল কি না, পৃষ্ঠার কোণ ভাঁজ করে রেখে দিল কি না, নতুন বই তো, সরস্বতী ফিটফাট থাকলে মা-লক্ষী আসবেন।

ছেলেটার ছোটবেলা থেকে এই এক দোষ, কিছু না কিছু তার করতেই হবে। চোখে চোখে না রাখলেই পেন্সিল কাটা ছুরি দিয়ে মাখনের মতো পুঁচিয়ে কাটছে কাঠপেন্সিল, রবার ঘষে বার্নিশ তুলে ফেলছে, কাঁটাকম্পাস দিয়ে চেয়ারের মাথায় খোদাই করে লিখছে নাম। সুবলকে আরেকবার তাড়া দিতে ডাক পাড়ে দুলাল— “অ সুবইল্যা!” সুবল থোড়াই শোনে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সে নতুন ইংরেজি বই খুলে বানান করে বই পড়ছে, ‘দ্য কোরাল আইল্যান্ড’। মগ্ন হয়ে পড়ছে, নাকের সামনে থেকে কেউ টুক করে এক দিস্তা কাগজ কি একটা পেন্সিলবক্স তুলে নিয়ে গেলেও সে টের পাবে না। একদিন আচ্ছামতো ধোলাই দিয়েছিল দুলাল তাকে, পরে সুবলের এই বিদ্যাদিগ্‌গজ হবার ছটফটানি কমে এসেছে। ঐ একবারই। এমনিতে বংশের বাতি এই ভাইপোকে দুলাল চক্ষে হারায়। কেউ নেই সুবইল্যার মাথার উপর, ফ্যানগাছের পাতার মতন যাদের ছায়া মেলে থাকবার কথা ছিল, বাবা-মা-পিসি-দাদু… কেউ নেই, থাকার মধ্যে এই দুলালকাকু।

ঘুমের ভিতর দাঁত-কিড়মিড় করলে কাকাই তাকে সকালে কৃমির ওষুধের বড়ি গেলাতো, আধুলির মতো বড় বড়ি। গরমকালে বিজলি চলে গেলে ঘামাচি গেলে দিয়ে গামছার ঘূর্ণিতে বাতাস করে তাকে ঘুম পাড়াতো কাকা। বাদলাদিনে কাকা তার জন্যেই ডালে-চালে খিচুড়ি বসাতো। সুবল অকৃতজ্ঞ নয়, আবার কৃতজ্ঞতাপাশ ব্যাপারটা ঠিক এক্ষেত্রে খাটে না, সুবল জানে তার চিরকুমার কাকা এমনই হবে, দুলাল জানে সুবইল্যা এমনি ‘বাধুক’ থাকবে। একরকম পারস্পরিক দাসত্ববিনিময়।

কাস্টোমার এসে গেল বলে অনিচ্ছার সাথে বই বন্ধ করে সুবল। দু’টো এক্সারসাইজ খাতা, এক দিস্তা ডিমাই সাইজ কাগজ। রয়্যাল কালির একখানা দোয়াত, দু’টো ফোর-বি পেন্সিল। এইসব টুকটাক বেচাকেনা। নিজেরটার ঝাঁপ বন্ধ করে কবিরাজ হরদয়ালকাকা এসে বসে আছে ওদের দোকানে, আজ অনেক রাত অব্দি কাকারা মিলে পাতার বিড়ি ফুঁকবে মেঝেয় শুয়ে শুয়ে। সারাদিন বৃষ্টি পড়েছে আজকে, ইস্কুল  ছুটির সময় বৃষ্টি পড়লে গাড়িঘোড়ার ধোঁয়ায় সব কেমন ধুসররঙা দেখায়, বিবর্ণ, মলিন। বেচাবিক্রির দিন হিসেবে সুবিধের নয়। সন্ধ্যার মুখে ক্ষান্ত দিয়েছে ঠিকই, বাতাসে হিম আছে, বাদলাদিনের এমন ঠান্ডায় দোকানে বসে ঘুমঘুম পায়। বইখাতায় হাত দিলেই সুবলের অদ্ভূত লাগে। নিউজপ্রিন্ট খাতায় নাক ডোবালেই যদি নাকে আসে খ্রীস্টপূর্ব ২০০ শতকের গেওয়াবনের ঘ্রাণ? যদি হাতে ঠেকে আখের ছোবড়া, গমের বিচালি, কানে আসে চন্দ্রঘোনা পেপারমিলের পাশে বয়ে যাওয়া নদীতে নিকাশিনালা মিশবার শব্দ… পেন্সিলে হাত ছোঁয়ালেই আসে ধুন্দলবনে বাতাসের মর্মর। আর অসহ্য রোমাঞ্চে পেট ডেকে ওঠে তার, সে ভাবে মেঘ ডাকছে আর দুলালকাকু ভাবে তার খিদে পেয়েছে। সে নমুর পো, তার ক্ষুধার আবাস পাকস্থলীতেই, তাই নিয়ম।

চালানের নতুন তকতকে এক্সারসাইজ খাতাগুলো তাকে পাঁজা করে তুলে রাখছিল সুবল। এই সন্ধ্যাবেলা মেয়েটা এমনিতে কখনো আসে না, ওরা থাকে রাস্তার ওপারে, আজ হয়তো বাড়ির কাজের লোকটি নেই, মেয়েটা এসে রচনা লিখবার সবুজ মলাটের রুলটানা ফুলস্ক্যাপ সাইজের খাতা কিনে নিয়ে গেল। ক’দিন আগেও সে হালিমা খাতুনের বই কিনতো—‘সিংহ হিংসা ভুলে মাংস আনলো’। বেশ দেখতে ছোট্ট মেয়েটি। মাথাভরা চুল চিরুনি বুলিয়ে আঁট করে বিনুনি করা, ফিতের সাটিনের ফুলটার রঙ তেলচিটে নয়, ফটফটে। মোমের মতো হাত-পা। পায়ের চপ্পলটায় এতটুকু ধুলোকাদা নেই, যেন পরীর মতো উড়ে এসেছে। মেয়েটিকে একটা সুগন্ধী বিদেশী রবার দিতে খুব ইচ্ছে করে সুবলের, যেটা শুঁকলেই কামড়াতে ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু দুলালকাকু তাকিয়ে রয়েছে।

তরুন শিরীষগাছটার পিছে পাশাপাশি দু’টি দোকান, তাদেরটা ‘আদর্শ’ আর সত্যব্রতকাকুর ‘বিদ্যাবিতান’। সত্যকাকুর দুই ছেলে মদনকুমার আর নির্মলকান্তি বসতো দোকানে। মদনদা মেথর যাওয়ার গলিটা দিয়ে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে বেরিয়ে যেত প্রায়ই, কাঁধে ক্যাম্বিসের ব্যাগ, কুলোকে বলতো— টাকা পাচারের সাথে জড়িত মদনকুমার। নির্মলদার কাছে সুবল ইংরেজি পড়া শুরু করেছিল, ‘রেডিয়্যান্ট ওয়ে’ র ‘সিং মাদার সিং’ থেকে শুরু করে ‘গালিভার্স ট্র্যাভেলস’। ম্যাকুলের ‘ব্রাইটার গ্রামারস’ ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, “এই হইলো গিয়া ইংরেজিভাষার চাবিকাঠি, যুদি ঠিকমতন ঘুরাইতে পারোস তইলে সিংহদরজা খুলবো!” সত্যকাকু ইন্ডিয়া চলে গেল কোনো এক বছর, এমনকি সুবলরাও জানতে পারলো না কবে কখন। বিদ্যাবিতান হয়ে গেল ইসমাইলচাচার ‘আলহামরা বইঘর’। ইসমাইলচাচা বইঘরে হরলাল রায়ের রচনা বই, মুনীর চৌধুরী-মোফাজ্জ্বল হায়দার চৌধুরীর ব্যাকরণবই ছাড়াও নোটবুক বেচে, বেচে দেওবন্দী সাহিত্য, ‘বেহেশতী জেওর’, ‘মকসুদুল মোমেনিন’, ‘স্বামীস্ত্রীর মধুর মিলন’। কিসসাতুল মেরাজ। তাজকেরাতুল আউলিয়া। কাসাসুল আম্বিয়া। ইসমাইলচাচা অদ্ভূত সব জন্তু-দৈত্যের কথা বলে, বলে ফোরাত নদী ফুঁড়ে সোনার পাহাড় জেগে উঠবার গল্প, সেদিন আকাশের রঙ হবে রক্তমাখা চর্মের মতো… ইসমাইলচাচা এখন দোকানে ব্যস্ত, পরে এসে হাজির হবে হরদয়ালকাকা আর দুলালকাকুর সাথে। বিড়বিড় করে আবার বৃষ্টি পড়ছে, আলো চলে গেলে বিপদ। সুবল হ্যারিকেন মুছে রাখেনি। ইসমাইলচাচার ছেলে সৌদি আরব থেকে একরকমের চার্জলাইট পাঠিয়েছে, খুব আলো। কারেন্ট গেলে আজ নির্ঘাত দু’চার ঘা চড়থাপ্পড় খাবে সুবল। হে ভগবান, আলো যেন না যায়, তমসো মা জ্যোতির্গময়।

মেয়েটি আবার এলো একদিন দুপুরে, মায়ের সাথে, ছোট ছোট লাল আপেল ছাপা শাদা ফ্রক তার পরনে, কাঁধে আর বুকের ওপর ফ্রিল দেয়া। চোখে আর নাকে অনুস্বারের মতো একটা টংকার দেয়া কৌতূক, একটা বিস্ময়। দুলালকাকুর কাছ থেকে মা কালো আর আইভরি এই দুই রঙের কার্ডবোর্ড কিনলো, চোষকাগজ কিনলো। মেয়েটি বেছে বেছে কিনলো ‘হিরো’ ঝর্ণাকলম। সুবল গভীর যত্নে তাকে দেখালো কেমন করে চাপ দিয়ে কালির কলমের উদ্বৃত্ত কালি ফেলে দিতে হয় দোয়াতের গভীরে, তারপর নিবখানা ডুবিয়ে হাত আলগা করে নিলেই তরতরিয়ে রয়্যাল ব্লু  কালি এসে ভরে ফেলে কলমের অন্ত্র। কালি মুছবার জন্যে ব্লটিং পেপার, ছি ছি মাথার চুলে কালি মোছে না। শিসকলমে এখন হাত দেয়া চলবে না, তাহলে হাতের লেখা ভাল হবে না এইসব জ্ঞান সুবল খুব কসরত করে দেয়…মেয়েটি মায়ের আড়ালে তাকে জিজ্ঞেস করে, “আপনার নাম কি?”

-“সুব…শুভ।” বানিয়ে বলে সুবল, না-হিন্দু না-মুসলমান একটা নাম।

“তোমার নাম কী খুকি?” দুলালকাকু ছোঁ মেরে জিজ্ঞেস করে, সুবলের যে এতটুকু আড়াল নেই, শকুনের মতো চোখ পাকিয়ে মগডাল থেকে তাকিয়ে আছে কাকু। পাখির শিসের মতো করে মেয়েটি জবাব করে তার নাম মুনিয়া। ছটফটে, রঙিন, চঞ্চল। দুলালকাকু মেয়েটির মাকে বলে, “আহা ভগবান খুকিরে আপনহাতে বানাইছেন!” মা হয়তো খুশি হয়েই এক বাক্স মোমরঙও কেনে। দোকান বন্ধ করার পর সেদিন হরদয়ালকাকার সাথে হৃদয়হীন দুলালকাকু ঠা-ঠা করে হাসে আর বলে, মেয়ে-ইস্কুলের ছাত্রীদেরকে আজকাল সুবইল্যা নিজের নাম বলে ‘শুভ’।

মেয়েরা খুব আসতো এই দোকানদুটোতে, বরাবরই। মায়েরাও। যেসব মায়েরা নিজেরাই বাড়িতে ভাতের ফ্যান গালতো, লাভার পাহাড়ের মতো মরিচবাটার স্তূপ করতো শিলপাটায় আর তারপর সুপারির খোলে পাটার গায়ে মেখে থাকা মরিচবাটা কাচিয়ে নিত, তারা ইস্কুল ছুটির আগ দিয়ে তড়িঘড়ি স্নান সেরে ভেজা চুলে গেরো দিয়ে মেয়েদের স্কুলফেরতা কোচিংক্লাসে নিয়ে যেত। মায়েরা বেশিরভাগই শ্যামবর্ণা, নিকিয়ে তোলা উঠোনের মতো সজল। কেউ কেউ ফর্সা, আঁশ-তুলে ছাই-ঘষে উজ্জ্বল করে তোলা মাছের পেটের মতো, ঘোলাটে। গায়ে তাদের মলমলের মতো পাতলা জ্যালজেলে নীল শাড়ি, বাদলা দিনে নাইলন সহজে শুকায়। নাকে ঢিবির মতো নাকফুল। চোখদুটো নিষ্প্রভ, কানগুলো সজাগ, জগত প্রেমের নাম করে কত ভেলকি দেখাতে পারে তার সবটাই বোঝাতে বোঝাতে তারা মেয়েদের নড়া ধরে বাড়ির পিঞ্জরে ফিরিয়ে নিয়ে যেত। যায়। তবুও তো ভ্রান্তিপাশ ঘটে।

ঘটলো। শুরু হলো এক দুপুরে। জ্যামিতি বক্সে কম্পাস আছে, কাঁটাকম্পাস আছে, চাঁদা নেই, চাঁদা কিনতে এসেছিল মেয়েটি। দুলালকাকু সেদিন দোকানে নেই। সুবল মেয়েটিকে একটা রঙিন ছবির চীনা বই দেখায়, নাম ‘আ গোল্ডেন মিলেট ড্রিম’, জিজ্ঞেস করে, “মুনিয়া তোমার জন্য একটা বই রেখেছি, তুমি কিনবে?” কবে কিনে রেখেছিল দুলালকাকু নাকি এটা সত্যকাকুর দোকানের বই কে জানে, ঝকঝকে ছাপা, পাতায় পাতায় চীনাদের জলরঙে আঁকা বড় বড় ছবি। মুনিয়া খাঁচায় ধরা পড়লো। কিন্তু অত টাকা তো তার নেই… তবে হ্যাঁ, মুনিয়া অনেকদিন কিছু কিছু করে পয়সা দিয়ে সুবলের কাছ থেকে বইটা কিনে নিতে পারে। স্কুলপড়ুয়া মেয়ের হাতে কি আর অত পয়সা জমে? জমলে আমড়া-ওয়ালার কি হবে? আচারওয়ালার? তবু ধীরে ধীরে মুনিয়া তার জমানো আধুলি-সিকি ইত্যাদি দিতে থাকে। কবে যেন কথাও বলতে থাকে সুবল দাস আর দিলশাদ আফরোজ মুনিয়া। দুলালকাকুর দুর্বুদ্ধিতে সামান্য হাসাহাসি করে। চোখে চোখেও কথা বলে তারা। সে যে কী সুখের সময় সুবলের।

একদিন রাতে সে স্বপ্ন দেখলো কত কী। দেখলো গাঁয়ে শ্রাবণমাসের শেষাশেষি কখনো কখনো এমন নির্মেঘ আকাশ দেখা দিত, তেমন ভরা-নদীর ওপর উপুড় হয়ে থাকা অগাধ নীল আকাশ, তাতে বহুদূরে প্রদীপের দানোর মতো গুড়গুড়িয়ে উঠছে শাদা মেঘ, লোহার হাতলের মতো রঙ সেই মেঘের তলাটুকু। পরে কখনো আকাশ দখল করে নেবে। সেই আকাশ আর পরিষ্কার জল একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সেই আকাশভরা পূর্নতার ভিতর তাদেরকে নিয়ে একটা স্টিমার চলছে। মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে তারাও হাসাহাসি করছে পান খেয়ে জিভ লাল হয়েছে বলে। মুনিয়া একটা সিল্কের শাড়ি পরেছে, বাতাসে পালের মতো ফুলে উঠেছে সেই শাড়ির আঁচল— তাতে শিমুলফুলের মতো বড় বড় লাল ফুল। ঘুমের ভেতরই সুবল ঠিক করে নিল, পাশ ফিরবে না, পাশ ফিরলেই যদি দ্যাখে পাশের বালিশে দুলালকাকু হাঁ করে ঘুমোচ্ছে তাহলে তো স্বপ্নটা ভেঙে যাবে।

মুনিয়া ভাঁজ করে ওড়না পরতে শুরু করেছে ইস্কুলে, বাংলা বইয়ে পড়ছে ‘পুলিনে তুলিছে আমারি গান…’, সেসময় একদিন ইসমাইলচাচার সৌদি ছেলে মারা যাবার খবর এলো। শোকে দুঃখে পাগল হয়ে যাবার দশা চাচার। আলহামরা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল ইসমাইলচাচা, ‘স্টারলাইট’ ভিডিও দোকান হলো সেখানে। যেন সুবলকে প্রবোধ দিতেই সারাবেলা ক্যাসেটপ্লেয়ারে ঝাঁ ঝাঁ করে গান বাজে— ‘গোরোঁ কি না কালোঁ কি, দুনিয়া হ্যায় দিলওয়ালোকি’। ইহপৃথিবী কালোর নয়, শাদার নয়, শুধু কলজে বড় যার— তার। প্রেমিকের চেয়ে আর কার পরান বড়? প্রেমে আর বম্বেতে কী না সম্ভব, বাস-কন্ডাক্টর থেকে হয়ে যাওয়া রজনীকান্ত। ইস্কুলছুটির সময় স্টারলাইটের সামনে কল্লোল বেড়ে যায় উঠতিবয়সী রুবেল-সুমন-রানা-শাহিন-রাসেলের, লাল-কমলা চিনির বরফের লাঠি ‘ড্রিংকা’ চোষে তারা মেয়েদের দেখিয়ে দেখিয়ে, কেউ কেউ মেয়েদের পিছু পিছু কিছুদূর যায়। স্টারলাইটের আলোয় সব্বাই মূর্তিমান নায়ক, সমাজকে তোয়াক্কা না করে ‘মিথ্যে আভিজাত্য’র অহংকার ভুলে তাদের পাটাতনের মতো বুকে ছুটে আসবে বড়লোকের একমাত্র মেয়েরা। অনভ্যস্ত হাতে আনাজ কুটতে বসে বঁটিতে হাত কাটবে, আর ছেলেরা তাদের তর্জনীর রক্ত চুষে দেবে। বাসা পাল্টেছে মুনিয়ারা, আজকাল আর মুনিয়ার মা আসেনা তাকে নিতে। মুনিয়াবেলা কেটেছে তার, আজকাল সে ‘রেডলিফ’ শিসকলমে লিখছে, ‘খেজুর-বেনি’ কিংবা ‘ফ্রেঞ্চবেনি’ করছে মাথায়, ইউনিফর্মের কোমরবন্দখানা আঁটো হয়ে বসেছে এমন যেন ওটা বোলতার কোমর।  ‘প্রাকৃতিক ভূগোল’এর বইখানা নেড়েচেড়ে দ্যাখে সুবল। পৃথিবীতে নদী আছে জোড়ায় জোড়ায়। শিরদরিয়া-আমুদরিয়া। দজলা-ফোরাত। টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস। মেয়ে-স্কুলের মেয়েরা বাধ্যতামূলকভাবে দুই বিনুনি করে, দিলশাদ আফরোজও করে, জোড়া নদী। কখনো জোড়া পাহাড়- প্রণালী- বদ্বীপ… উপত্যকাকে মালভূমি করে তোলা ব্রেসিয়ার চোখে পড়ে যায়, সভয়ে চোখ সরিয়ে নেয় সে। শরীরের ভিতরে ভয়ের একটা হিমবাহ সুধীরে এক ইঞ্চি বেড়ে ওঠে, অ্যাভালাঞ্চ আসবে রাতে, টাংস্টেনের বাতির হলদে আলোয় বিভোর কামরায়। বরফজলের ঝাপটায় পেট ডেকে ওঠে তার, আবার। বাজারে আর চৌকো পাঁচপয়সা পাওয়া যায় না, অথচ সেই পয়সার চারদিক সুতোয় শক্ত করে মুড়িয়ে কাপড় রঙে চুবিয়ে খুব ভাল টাইডাই ওড়না বানানো যায়। ইস্কুলের মেয়েরা বানায়। সুবল মুনিয়ার হুকুমে পাঁচ পয়সা জমায়।

সুবলের মনে মনে একটা বসার ঘর আছে কিন্তু। তার নিজের বসবার ঘর। সেখানে জুতো খুলে ঢুকতে হয়। জানালায় ফুল-ফুল প্রিন্টের পর্দা, সুবলের কল্পনার বউ নিজে কালো সেলাইকলে বসিয়ে পর্দাটা সেলাই করে নিয়েছে। বারান্দায় কাঁচের শিশিতে মানিপ্ল্যান্ট। সন্ধ্যার ধুনোর ধোঁয়ায় সে’ঘরের মেরুন সোফাসেট কালচে দেখায়। কয়েকমাস পর ওরা যেন কার্পেট কিনবে, আর টিপয়ে বসাবার জন্য একটা চিনামাটির ফুলদানি। সুবল দ্যাখে, কোমরে আঁচল জড়িয়ে দেয়ালে ঠুকঠুক করে পেরেক ঠুকছে মুনিয়া, ‘আ গোল্ডেন মিলেট ড্রিম’ থেকে কেটে নিয়ে চীনা জলরঙ ছবি ফ্রেমে ঝোলাবে।

এমনি দিনে দুলালকাকুর সাথে ভাতের হোটেলের অন্তিমে কালিঝুলি অন্ধকারে বসে মাংসের ঝোল দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে সুবল কাঁচা পেঁয়াজ চিবায়। কতক্ষণ থেকে ডাকছে কাকু—“সুবইল্যারে, দুইখান কাঁচামরিচ লইয়্যা দে আমারে!” মুখের সোয়াদ চলে গেছে দুলালকাকুর, একবসায় এক মোষ খাওয়ার গল্প কাকু আর করে না। বাতাসে কত গল্প উড়ে আসে, উড়ো কুটোর মতো খইয়ের মতো। মুনিয়ার মা কার হাত ধরে যেন চলে গেছে। মুনিয়ার বাপের পুরুষকারে লেগেছে বলে সেও বিয়ে করে এনেছে আরেকটি মহিলাকে, প্রমাণমাপের মা। মুনিয়া আর নাচের ইস্কুলে যায় না। পেঁয়াজ-মরিচ চিবোতে চিবোতে চোখে-নাকে ঝাঁজ লাগে সুবলের, সে দ্যাখে মুনিয়া সৎমায়ের অত্যাচারে আকুল হয়ে কাঁদছে, কান্না থামাতে সে মুনিয়াকে বিয়ে করে ট্রেনে চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোনো দূরের শহরে। পরে কোনো ছুটিতে জোড়ে বাড়ি ফিরেছে তারা, বাড়ির পিছনে চিক্কনদুপুরে সবুজ পানাপুকুর আর পেয়ারাবাগ…খড়ির বেড়া দেয়া রান্নাঘর… চুলোয় শ্যাওড়াকাঠের আগুনে মাংস রান্নার ঘ্রাণ বাতাসে, পূববাড়ির লক্ষণের মা ছেলেকোলে বউ দেখতে এসে দুপুরের চিলের স্বরে বলছে, “আ গো নতুনবউ, অখন তো সিন্দুর দেওন লাগবো!”

এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে সে তো সেই সটান দাঁড়িয়েই থাকে ‘আদর্শ লাইব্রেরি অ্যান্ড স্টেশনারী’তে। টেট্রনের ছাপা শার্টের সেলাই করা ফাটা কলার, শার্টের গলার কাছে খোলা জায়গাটুকুতে ছুলির আভাস…এইসব সত্ত্বেও সপ্রতিভ মুখ, চেহারাতে বুদ্ধির অলঙ্ঘ্য ছাপ, ঝকঝকে চোখদু’টিতে বয়সোচিত কৌতূহল। সে শাদাকালো ইরেজার বেচে, তার শাদা দিক পেন্সিলের দাগ মোছে, কালো দিক কলমের কালির দাগ ওঠায়। তাদের দোকানে মার্কারি ভেপার ল্যাম্প জ্বলে। ‘চয়নিকা’ আজকাল আর কেউ কেনে না। দিস্তাকাগজ কিনে ভোমরকাঁটায় সেলাই করে খাতা বানায় না। ক্যালেন্ডারের পুরনো পাতা দিয়ে মলাট দেয় না বর্ষশুরুর এক্সারসাইজ বুকের। সিনেমার নায়কনায়িকাদের ছবি অর্থাৎ ভিউকার্ড কেনাও কমে আসছে। শারদীয় উৎসবের ছুটির শুরুতে তবু নীল নীল আকাশে শাদা মেঘের ভেলা দেখা যায় টুক করে ‘আদর্শ লাইব্রেরি অ্যান্ড স্টেশনারী’ থেকে উঁকি দিলে। নারকেল-কলা আর সন্দেশ-বাতাসা দিয়ে সাবু-মাখার স্বাদের সমান সেই মেঘের স্বাদ, তাতে ক্বচিৎ লাল লাল আলোর মতন ডালিমের দানা, মহালয়ার স্বাদ।

শেষ একবার ব্যবহারিক খাতা কিনতে এসেছিল মুনিয়া, প্রতিটি পৃষ্ঠার সাথে মোমমাখা কাগজের মতো স্বচ্ছ ট্রেসিং পেপার, ব্যাঙ কিংবা ইচামাছ আঁকবে হয়তো। তাহলে মুনিয়া সায়েন্স নিল? সে কি নাচের ইস্কুলে যায় আর? কী সুন্দর দেখতে হয়েছে মুনিয়াকে, মাথায় সুপ্রচুর চুল বিলেতি মেমদের মতো করে বনরুটির আদলে খোঁপা করা, নাকটার ডগা একটু ফুলো, মেয়েস্কুলের পাশে যে পর্তুগীজ গীর্জাটা ছিল— সেই গীর্জার দেয়ালে আঁকা মাতা মরিয়মের চোখের মতো ভাসা-ভাসা তার চোখগুলি, মিহি গোলাপি ঠোঁট কী বাঙ্ময়, দীর্ঘ গ্রীবায় সরু ছমছমে সোনার চেন। ব্যবহারিক খাতার ভেতর সুবল লুকিয়ে পাচার করে দিল একটুকরো চিরকুট, তাতে সে তার শ্রেষ্ঠ হস্তাক্ষরে ইংরেজিতে লিখেছে ‘ফরগেট মি নট’, পাশে এঁকেছে ফুলফোটা একটা লতা— মনোরম উৎকোচ। কী করে যেন বুদ্ধি আর সপ্রতিভতা জেনে গেছে মনে— পাখি এই শাখায় বসতে ভুলে যেতে পারে। এমন আকুতিভরা আহ্বানের পরেও মুনিয়া কিন্তু তাকে ভুলে চলেই গেল। আর এলো না।

দুলালকাকুর রক্তে চিনি ধরা পড়েছে।  ভিডিও দোকানটা আর নেই, ক’দিন সেখানে নানানরকম ইলেকট্রিক সামগ্রী সারাইয়ের একটা দোকান হলো। তারপর হলো স্টুডিও ‘আলোছায়া’। কাকুর শরীর খারাপ হবার পর থেকে সত্যকাকুর চিঠি এসেছে কয়েকবার, উত্তর চব্বিশ পরগণা থেকে। যেদিন মারবে দুলাল তোমারে, সেদিন ধনে-মানে-প্রাণে মারবে, সুবলকে নিয়ে চলে এসো। আমার এই দেশেতে জন্ম যেন ঐদেশেতে মরি, এইই এখন গাইতে হবে, বুঝলে? দুলালকাকু কী বোঝে কে জানে। সংসারে সুবলের আর কেউ রইবে না, এই গোঙানি চলে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, “হরির দোকান থিকা একখান  আমিত্তি লইয়া আয় রে সুবইল্যাআআআ। পরজনমে বান্ধা থাকবি নৈলে!” সুবলের একবার মনে হয় দুলালকাকুকে বুঝিয়ে বলে হরিকাকার মিষ্টির দোকানটা আর নেই, পরে কী ভেবে চুপ করে থাকে। গলির দিকের জানালাটা খুললেই পাশের বাড়ির অন্দর উপুড় হয়ে পড়ে ওদের ঘরে, তবু লোডশেডিং এর সময় জানালাটা খুলে দিলে একঝলক বাতাস আসে। কালো বৌটা উবু হয়ে খুলে দিচ্ছে স্বামীর পায়ের জুতো, সুবল এমন করবে না, পাশে বসিয়ে রাখবে মুনিয়াকে, বাড়ি ফিরে দু’জনে চা খাবে তারা। কে যেন তারস্বরে কাজী ইমদাদুল হকের ‘আব্দুল্লাহ’ পড়ছে। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা য্যান কবে রে সুবইল্যা? কাকুই কি জিজ্ঞেস করে, নাকি সুবলের ভ্রম হয় কে জানে। অন্ধকারে তার মনে হয় ডোরাকাটা মশারির খোপ থেকে বেরিয়ে এসে দাঁতে ফিতে ধরে খোঁপা আঁটো করে বাঁধছে মুনিয়া, পিঠে সমদ্বিবাহু ত্রিভূজ, হারিয়ে যাওয়া চাঁদা ধরে বৃত্তচাপে আঁকা তার ব্লাউজ, উঃ এত গরম এই ঘরে। দুলালকাকু গোঙায়— যাবিনি রে? যাবি নিকি?

স্টুডিও ‘আলোছায়া’র দরজায় প্রথমদিন মুনিয়ার পোস্টার দেখে চমকে গেল সুবল। অবশ্য মুনিয়াকে পোস্টারটায় চেনা মুশকিল, মুনিয়া ফুড়ুৎ করে উড়াল দিত…এ যে ডাকছে রীতিমতো পাখনা তুলে। দুলালকাকু টেলিভিশনে মুনিয়াকে শীতের শুষ্কতায় প্রশান্তি এনে দেয়া অলিভ অয়েল মাখতে দেখে চিনতে পারলো না, চোখ খারাপ হয়েছে কাকুর। অবশ্য দুলালকাকু সাপ্তাহিক নাটকে মুনিয়াকে দেখেও চিনতে পারলো না, মুনিয়া নামটাই তো আর নেই, টিভিতে লেখে ‘দিল’, দিলশাদ। নাটকে আফজাল হোসেনের সাথে মুনিয়ার সংসার, একেবারে শত্রুসম্পত্তি আইনে যেন আফজাল হোসেন কেড়ে নিয়েছে সুবলের ঘরদোর… ঐ যে রাতের ট্রেন, ঐ যে খিড়কিপুকুরে পেলিক্যান কালির মতো রঙ কাদাজল আর ফলে ভরা পেয়ারাবাগ, ঐ যে ডোরাকাটা মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বিস্রস্তবাস স্ত্রী। মিছেই উদ্বিগ্ন থাকতো সুবল, ঐসব ঘরকন্নায় ভাল থাকবে তো মুনিয়া! ভাল আছে তো!

নতুন বছরের শুরুতে মেয়েস্কুলের মেয়েরা এসেছে খাতাপত্র কিনতে। অল্পবয়েসে ভিডিও দোকানের রাসেল ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছিল মেয়েস্কুলের ডোনাকে, ডোনা-রাসেলের বাচ্চা হয়েছে, সেই বাচ্চা খানিকটা বড়ও হয়েছে, অ-আ-ক-খ’র প্লাস্টিকবাঁধাই বইয়ের খোঁজ করতে এসেছে, দুরন্ত বাচ্চা নৈলে বই ছিঁড়ে ফেলে। নাইম-শাবনাজ-মৌসুমী-সালমান-শমী-বিপাশার ভিউকার্ড এসেছে। আর দিলশাদেরও ভিউকার্ড এসেছে। পাঁচপয়সার মতো ছাপ ছাপ টাইডাই রঙিন শালওয়ারকামিজ পরে, লাল লিপস্টিক দিয়ে চোখ সরু করে তাকিয়ে আছে। মেয়েরা কীসব ফিসফিস করছে। সুবল হঠাৎ একবুক পুরানো বইগন্ধী বাতাস নিয়ে বলে ফেললো, “এই নায়িকা দিলশাদের সাথে আমার প্রেম ছিল, তার প্রথম প্রেম।”

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]