দ্বিতীয় সুবীর নন্দী আর পাবে না বাংলাদেশ

সে সময়ের ছোট্ট-শান্ত একটি শহর।পাশ দিয়ে বয়ে চলা খোয়াই নদী।শহরের নাম হবিগঞ্জ।এ শহর হেমাঙ্গ বিশ্বাসের শহর। এ শহর সুবীর নন্দীর শহর। এ শহরে আমারও বেড়ে ওঠা।আমি যখন খুব ছোট তখন সুবীর’দা আর আমরা একই পাড়ায় থাকতাম।আমাদের বাসার সামনে ছিলো একটা বড়ো পুকুর আর পুকুরের উল্টো দিকেই দাদাদের বাসা।সুবীর’দা তখন স্কুলের ছাত্র। আর আমি তখন এতই ছোট যে সে সময়ের স্মৃতিও ধুসর। বড়ো হয়ে মা-বাবা এবং ভাইদের মুখে সে সময়ের সুবীর’দার গল্প শুনতাম।

পরিবারের সবার সঙ্গে। নিচে বসা বাঁদিক থেকে প্রথম জন সুবীর নন্দী

যখন বড়ো হই তখন দাদাকে শহরে দেখতাম।সুবীর’দার  বড়ো ভাই তপন নন্দী তখন সিলেট জেলায় গান গেয়ে খ্যাতি পেয়েছেন। সবাই বলতেন সিলেটের মান্না দে। মান্না দে’র গান তিনি গাইতেন হুবহু। চোখ বুঁজে তাঁর গান শুনলে মনে হতো মান্না বাবুই গাচ্ছেন। সিলেট বেতারের নিয়মিত শিল্পী তিনি।শহরের বিভিন্ন প্রোগ্রামে তার গান থাকতেই হবে।।এমন শিল্পী একদিন দেশজোড়া খ্যাতি পাবেন এ ছিলো সবারই ভাবনা।কিন্তু দাবার দান উল্টে গেলো।তপন নন্দী পেশাগত জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।সরে যেতে থাকেন গানের ভূবন থেকে।একসময় সব গুছিয়ে হয়ে গেলেন কানাডা প্রবাসী।তবে সুবীর’দাও চুপটি করে বসে থাকেননি।বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে তিনিও তখন গান করতেন। খুব ভালো তবলাও বাজাতেন।বড়ো ভাই গানের জগত থেকে সরে গেলেও সুবীর’দা রয়ে গেলেন গানেরই মাঝে।

সিলেট বেতারে তপন’দার গান ছোটবেলা থেকেই শুনতাম।এবার শুনতে লাগলাম সিলেট বেতার থেকে রেকর্ডকৃত সুবীর নন্দীর গান।খুব সম্ভবত ৭৬-৭৭ সালের কথা। একদিন দুপুরে বাংলাদেশ বেতারে দাদার একটা আধুনিক গান শুনে যেমন মুগ্ধ হই, তেমন আপ্লুতও হই। আমাদের শহরের সুবীর নন্দীর রেকর্ডকৃত গান বাংলাদেশ বেতারে প্রচারিত হচ্ছে…! গানটি হলো,‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলেই গন্য হলাম।’এরপর প্রায়ই এই গানটি রেডিওতে শুনতাম। পরে এ গানটি একটা সিনেমাতে ব্যবহার করা হয়। আমার মনে হয় এ গানটির পর দাদাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

একই শহরের বা পরবর্তি সময়ে আমার পেশা সাংস্কৃতি পরিমণ্ডল নিয়ে হওয়াতে দাদার সঙ্গে দেখা হতো। কথা হতো। কিন্তু তেমন সখ্য গড়ে ওঠেনি।তবে দাদার পরিবারের সঙ্গে আমার হৃদতা সেই ছোটবেলা থেকেই। দাদার বড়ো বোনের মেয়ে মালা আমার ছোটবেলার বন্ধু। বড়ো ভাই তপন’দার স্ত্রী আমার আরেক ছোটবেলার বন্ধু টুকুনের বড়ো বোন ঋতু’দি। সেইসূত্রে দাদার বাসায় আমার সব সময়ই যাওয়া হতো।দাদার ছোটবোন রাখী’দি আমাদের খুব স্নেহ করতেন।

সুবীর নন্দী, তপন নন্দী, সুবিনয় নন্দী তিন ভাই।

আমাদের স্কুলের কাছেই ছিলো দাদার বাসা।অনেক সময় স্কুলে যাবার পথ সংক্ষিপ্ত করতে আমরা দাদার বাসার ভেতরের উঠান দিয়ে পেছনের গেট পেড়িয়ে স্কুলে চলে যেতাম।মফস্বলের বাসাগুলোর গেট তখন সব সময়ই খোলা থাকতো।আমাদের এই চলাচলে তাদের বাসা থেকে কখনও কোনো বাঁধা আসেনি।তাই স্কুলের অনেকেই এ পথটা বেছে নিয়েছিলো।ঢাকা থেকে দাদা হবিগঞ্জে গেলে আসা-যাওয়ার পথে মাঝে মাঝে তাঁকে বারান্দায় বসে থাকতে দেখতাম।

দাদার যখন বিয়ে করেন তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি।মালার প্রিয় বাচ্চু (সুবীর’দার ডাক নাম) মামা বিয়ে করে বউ নিয়ে বাড়িতে এলে আমরা বন্ধুরা ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে দৌড়ে বউ দেখতে চলে গিয়েছি।এভাবেই দূর থেকে আমার দাদাকে জানা।

একসময় দাদার গানের গুরু ওস্তাদ বাবর আলী খান পরিচালিত গানের স্কুল ‘সুর বিতানে’ আমি আর আমার বোন কান্তা গান শিখতে শুরু করি।তখন দাদাকে আরও কাছে থেকে দেখি।‘সুর বিতান’ এর প্রতিটি প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে দাদা হবিগঞ্জে যেতেন।বড়ো করে অনুষ্ঠান হতো। সেই সুবাদে দাদার সঙ্গে একবার একই মঞ্চে কোরাস গাওয়ারও সুযোগ হয়েছিলো।দেশত্মবোধক সেই গানটা ছিলো ‘দু’নয়ন ভরে যতো দেখি তারে।’ খুব যত্ন করে দাদা আমাদের নিয়ে রিহার্সেল করেছিলেন। একদিন রিহার্সেলের সময় আমার বোন দাদাকে তার নিজের গাওয়া গান শোনার জন্য একের পর এক অনুরোধ করেই যাচ্ছিলো। দাদাও গেয়ে যাচ্ছিলেন ।এক সময় বললেন,‘ আর পারছিনা গো।এবার বাসায় গিয়ে রেডিও খুলে শুনে নিও।’ এমনই ছিলেন আমাদের দাদা সুবীর নন্দী।অহংকার তো ছিলোই না।ফেলতেও পারতেন না কারো কোনো অনুরোধ।নিজের শহর থেকে কোনো ডাক পেলে দাদা ভীষন খুশি হতেন।এমনকি নিজের গ্রাম বানিয়াচং থেকেও কোন ডাক এলে দাদা মিস করতেন না। বরং তাঁর অগোচরে কোনো প্রোগ্রাম হলে দাদার অভিমান হতো।

চার ভাই একসঙ্গে

দাদার গান যেমন মানুষকে মোহমুগ্ধ করে রাখতো তেমনি দাদা কথাও বলতেন অনেক সুন্দর করে।তাঁর মধ্যে প্রচন্ড রসবোধ ছিলো।ইদানিং হবিগঞ্জে গেলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই দাদাকে দেখে বুঝতে পারতো না ইনিই সুবীর নন্দী কিনা।দাদা বলতেন, ‘আমাকে দেখে ছেলে-মেয়েরা বলে,  দেখ, দেখ, বেটাটা একবারে সুবীর নন্দীর মতো।’ দাদা বেশ মজা পেতেন।তাই গল্প করে কথাটা বলতেন।

দাদার সঙ্গে আমার শেষ দেখা দু’বছর আগে।বাচসাসের নবনির্বাচিতদের অভিষেক-এ দাদা গান গাইতে এসেছিলেন প্রেসক্লাবে। সেদিনও তাঁর সঙ্গে আমার হবিগঞ্জ নিয়ে কথা হয়। দাদা বলছিলেন, ‘শহরটা এখন আমাকে খুব টানে।’

দাদার অসুস্থতার সংবাদে শঙ্কিত হই।কিন্তু ভাবিনি দাদা আর আমদের মাঝে ফিরে আসবেন না।প্রতিদিন দাদার অসুস্থতা নিয়ে কথা হতো দাদার ভাইয়ের (তপন নন্দী) ছেলে শিপলুর সঙ্গে।কানাডায় বসে শিপলুও যেন তার ফুলকাকুর জন্য অস্থির হয়ে ছিলো।তবুও দাদা চলে যাবেন এমনটা আমাদের মনে আসেনি একবারও।একটা মিরাক্যালের জন্যই যেন আমরা অপেক্ষা করছিলাম।পুরো দেশের মানুষও তাই চাইছিলো। কিন্তু না, পৃথিবীর হাতটি ছেড়ে দিয়ে দাদা চলে গেলেন…।আমাদেরকে বড়ো অসহায় করে দিয়ে চলে গেলেন। আমরা জানি বাংলাদেশে আর কখনোই দ্বিতীয় সুবীর নন্দীর জন্ম হবেনা।

এখন আকাশের শত তারার ভেতর খুব উজ্জ্বল তারাটিই আমাদের সুবীর নন্দী।দূর থেকে ছায়া দিয়ে যাবেন আমাদের নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের।

আবিদা নাসরীন কলি

ছবিঃ তপন নন্দীর ফেইসবুক থেকে।