দ্বিধার দোলাচালে আমি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

এবার নিউইয়র্কের ডাক এলো, পুজোর আমন্ত্রণ। কিন্তু হাতে আর না হয় দশ বারোটা ছবির গানের কাজ। সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলী ভাই, বুলবুল ভাই, তাহের ভাই, আলম ভাই উনাদের অনুমতি নিলাম। কিন্তু সেই অনুমতি শুধুমাত্র এক সপ্তাহের জন্য। আবারও সেই সংসার সামলানোর ব্যাপার সামনে এলো। এ যে কি এক ভয়ংকর ব্যাপার তা আমি লিখে বোঝাতে পারবো না।বাচ্চাগুলো বিশেষ করে মাশুক খুবই চাপা স্বভাবের। সে তার দুঃখ কষ্ট কিছুই বলবে না।তাকে রেখে কোথাও গেলে সে কিছুতেই কিছু প্রকাশ করিবেনা।এমন ভাব দেখাবে যেন পৃথিবীর বাচ্চাদের কোনদিন কোন দুঃখ ছিলোও না, নাই ও। অথচ কোন এক দুর্বল সময়ে সে মায়ের কলিজার পাশে শুয়ে শুয়ে আস্তে আস্তে বলবে আম্মু তুমি কখনো মরে যেওনা তাইলে আমিও তোমার সাথে মাটিতে চলে যাবো! এইসব বিদেশ ভ্রমণ আমাকে ভয়াবহ রকমের বিপদে ও দুঃখে ফেলে দিচ্ছিলো।

 নিউইয়র্কে গিয়ে আমি আসল আমেরিকা অবলোকন করলাম।ম্যানহাটান গিয়ে আলোর ঝলকানিতে চমকে ওঠার বদলে ম্লান হয়ে যাচ্ছিলাম। উজ্জ্বল আলোতে নিজেকে তুচ্ছতম লাগছিলো। পুজোর অনুষ্ঠান খুবই ভালো হলো। সেখানে ভজনগীত কীর্তন দেশের গান নজরুল সংগীত গাইলাম।খুব ভালো দর্শক ছিলো। খুবই পরিতৃপ্ত মনোভাব নিয়ে ফিরলাম কিন্তু স্টুডিও পাড়ায় গিয়ে অনেক বকা শুনলাম। আলী ভাই বললেন এগুলোই করো।তোমার আর সিনেমার গান গাওয়া লাগবে না।বুলবুল ভাইও অনেক ভারি ভারি উপদেশ দিলেন। তাদের বক্তব্য বিদেশ অনেক যাওয়া যাবে কিন্তু ছবির গান যে আমার ভিত শক্ত করে দেবে তেমনটা আর কোন মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব নয়।

 আমি এই হিসাব বুঝি কিন্তু আমাদের ও কিছু হিসাব থাকে। একটা অনুষ্ঠান করে যে পারিশ্রমিক পেলাম সে পারিশ্রমিক দিয়ে আমার ছয়মাস সংসার চলবে।আর বিদেশ ভ্রমণ তো অন্যরকম এক আনন্দদায়ক অনুভব। এখন এই পারিশ্রমিক এর হিসাব লিখেই আমার মনে হচ্ছে হিসাবটা ঠিক হলো না।কিন্তু সে সময়ে অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এ আমার ইনকাম এর হিসাবটাও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিলো না। বাস্তব জীবনের বাস্তবতা খুবই অন্যরকম। ছবির গান একজন শিল্পীর পথ সুদীর্ঘ এবং শক্তপোক্ত মসৃণ করে দেয়।কিন্তু ততদিন বেঁচেবর্তে থাকার জন্যও কিছু টাকাকড়ি লাগে।যে টাকার জন্য আমি ডন কোম্পানিতে চাকরির মত করে টানা ছ’বছর হারানো দিনের গান গেয়েছি। অনেক শ্রোতা আমাকে এনিয়ে অনেক কটুকথা বলেছেন। অনেকের তোপের মুখে পড়েছি। কিন্তু আমি জানি ডন কোম্পানির সেই গানগুলো আমাকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে। ওই হারানো দিনের গান গুলো ধারাবাহিক ভাবে না গাইলে আমাকে হয়তো কোন স্বাস্থ্যসেবার এনজিওতে চাকরি নিয়ে মাঠকর্মীর কাজ করতাম! তো সেই হিসেবে আমি এবং আমরা ধরেই নিলাম আমাকে মাঝেমধ্যেই প্রবাসীদের আমন্ত্রণে বিদেশ যেতে হবে এবং বুলবুল ভাই আলী ভাইয়ের বকা খেতে হবে। এটাই জীবন। আরেকটা কথা হলো দর্শক তারা দেশেই হোক বিদেশেই হোক তাদের ভালোবাসারও দাম আছে। তারপর ও আমি দ্বিধার দোলাচলে দুলতে থাকলাম এবং সঙ্গে থাকলো আমার গান, আমার শিক্ষা, আমার পরিবার, আমার শ্রোতা এবং আমার নতুন চলমান জীবন।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]