দ্বিধা কি আমার একটা দুইটা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

মঞ্চে, অডিও ক্যাসেটের গানে, বিটিভিতে, বিদেশে যেখানেই গাই কিন্তু আমার আসল পরিচয় দাঁড়িয়ে গেলো প্লেব্যাক সিঙ্গার।সারাদিন এ স্টুডিও থেকে ওই স্টুডিও ঘুরে ঘুরে গাইতেই থাকি। গাইতেই থাকি। বেশীরভাগ গান গাই আমি আলী ভাইয়ের আর বুলবুল ভাইয়ের। গান গাইতে গাইতে তাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে গেলো। স্বাভাবিক, রোজদিন দেখা হয়,সুরকার হিসেবে আমি তাঁদের আবিষ্কার করি, তাঁরা আমাকে আবিষ্কার করেন এটাই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। তো এভাবেই তাঁরা জেনে যান আমি রান্নাও করতে পারি।কিন্তু আমি আসলেও তখন তেমন কিছু রান্না শিখিনি। বুলবুল ভাই একদিন বলেন ভাবী ওই যে কালো কালো ভুনা গোশত আছে সেটা আপনি রাঁধতে পারেন? আমার উত্তরের আগেই আমার জীবনসঙ্গী বলেন হ্যাঁ অবশ্যই পারে খুব ভালো পারে! আমি প্রমাদ গুনি।আল্লাহ গো! আমার রান্নার বেসিক তখনও শেখা শেষ হয়নি! আজ নুন কম তো কাল বেশী। আজ ঝোল পাতলা তো কাল পোড়া লাগে।তারপর উনি বলে ফেলেছেন কি আর করা। আমি বাসায় এসে আমার মা কে জিজ্ঞেস করি, আম্মা কালো কালো ভুনা গোশত কি করে রাঁধবো? আম্মা বলেন গোশত নুন দিয়ে অনেক দিন জ্বাল দিতে দিতে কালো একটা রং হয়।কিন্তু আমার তো অতদিন সময় নাই। ঠিক সেই মুহুর্তে আমি কোন এক পত্রিকায় পড়ি পান খাওয়ার সুপারি অর্ধেক করে গোশত দিলে গোশত সেদ্ধও হয় রং ও কালো হয়।খুব যত্ন করে রাঁধলাম। গোশত ঠিক যেমন রাঁধতে চেয়েছিলাম ঠিক তেমনই হলো। টিফিন ক্যারিয়ার ভরে আরও একটু গাজরের হালুয়া করে বুলবুল ভাইয়ের বাসায় গেলাম। আহা, কি যে খুশি হলেন বুলবুল ভাই! টিফিন ক্যারিয়ার খুলে জোরে জোরে ভাবীকে ডেকে বলছিলেন দেখো সুবর্ণা, ভাবী এইটুকু মানুষ কি সুন্দর বুড়িদের মতো পাকা রাঁধুনীদের মতো রান্না করে এনেছেন! এই গোশত তো চালের আটার রুটি দিয়ে খেতে হবে।

রেকর্ডিং স্টুডিও শ্রুতিতেও এই রান্নার সুবাস ছড়িয়ে পড়লো। আমাদের সুরসম্রাট আলাউদ্দীন আলী ভাই হলেন সেরকম ভোজন বিলাসী মানুষ। তার রেকর্ডিং মানেই রান্নার বিশাল আয়োজন। চা বিস্কুট তো রেকর্ডিং স্টুডিওতে চলতেই থাকে, কিন্তু আলী ভাইয়ের রেকর্ডিং এ ভাতের আয়োজন থাকবেই। কত রকম ভর্তা চচ্চড়ি ঝোলঝাল টক কতরকম রান্না যে হতো। শ্রুতির পুরাতন মানুষ শাহজাহান ভাই আমাদের চা দিতেন আর সাধন ভাই ভাত খাওয়াতেন।সাধন ভাই নিজ হাতে বাজার করে কুটে বেছে রান্না করতেন।আলী ভাই যখন জানলেন আমি রান্না জানি তখন মাঝেমধ্যেই বলতেন কনক তুমি একটু গোশত রাঁধো।জনা পঞ্চাশেক মানুষের গোশত রান্না করা তেমন কোন কঠিন কাজ না কিন্তু রেকর্ডিং এর আগে আমি এমনিতেই অনেক টেনশনে থাকি। বাসায় কত রকম কাজকর্ম করে বাচ্চাকাচ্চা সামলে স্টুডিওতে গিয়ে গান, গান গাইতেই গলদঘর্ম হয়ে যাই।এর মধ্যে এই রান্নার সুনাম আমাকে খুব হালকা একটা দ্বিধার মধ্যে ফেলে দিলো।কিন্তু রান্না করতে আমি খুবই ভালোবাসি,তবে যেদিন রান্না করবো সেদিন শুধু রান্না এমন একটা ভাব কি আর কি।বয়স তো তেমন হয়নি তখন। তবে স্টুডিওতে রেঁধে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপার টা ধীরে ধীরে বাড়ছিলো। সাদামাটা মানুষ আমি গান ঠিকঠাক গাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই নতুন ভাবনায় জড়িয়ে গেলাম। বোকা আমার জীবনে নতুন দ্বিধা আমার পিছু নিলো।হাহাহা।

ছবি: লেখক

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]